কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব


তাহসীন নাওয়ার প্রাচী | Published: May 06, 2021 11:57:40 | Updated: May 06, 2021 19:50:43


ছবিঃ ইন্টারনেট

প্রত্যেকটি মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বলা যেতে পারে তার কর্মজীবনকে, যেখানে কাটে তার সময়ের সিংহভাগ। জীবিকার তাগিদে পেশা বেছে নেওয়ায় আছে বৈচিত্র্য, অনন্যতা। প্রতিটি ক্ষেত্রে থাকে বিশেষ কিছু দক্ষতার চাহিদা, যা কর্মক্ষেত্রে আরেক ধাপ এগিয়ে নিতে কাজে আসে। কায়িক শ্রমের চেয়ে কর্পোরেট ক্ষেত্রে এসব সূক্ষ্ম গুণাবলি বেশি কাজে আসে। শুধুমাত্র অভিজ্ঞতার দরুন বা আভ্যন্তরীণ রাজনীতিবলে কর্পোরেট ক্ষেত্র সাফল্য লাভ করা বা পদোন্নতির স্বপ্ন দেখা অরণ্যে রোদন বৈ কিছুই নয়।

বর্তমানে কর্পোরেট কোম্পানিগুলো চায়, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় মেধার সাথে সাথে সাংগঠনিক দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতাও। তাই তরূণদের মাঝে এসব দক্ষতা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন সফট স্কিল চর্চা বেড়েছে, তবে কিছু কিছু সফট স্কিলের ব্যবহার উল্টোভাবে অনুধাবন করার কারণে সেটা বেশ কিছু সমস্যারও সৃষ্টি করতে পারে, যাতে ফলাফল হতে পারে হিতে বিপরীত।

কর্পোরেট জগতে দ্রুত পদোন্নতির জন্য প্রয়োজন, কর্মক্ষেত্রে সবসময় যেকোনো সুযোগের সদ্ব্যাবহার করা, যেকোনো সুযোগকে ভালোভাবে কাজে লাগিয়ে তাতে নিজেকে অন্যদের চেয়ে ভালো প্রমাণ করে দেখানো। নিজের যোগ্যতা, দক্ষতা, অর্জন ইত্যাদিকে শাণিত করার মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে তা আরো নৈপুণ্যের সাথে প্রয়োগ করার মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রের এই প্রতিযোগিতা বা দ্বন্দ্বমুখরতার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হয় কর্পোরেটদের। এর মূল উদ্দেশ্যই থাকে, নিজের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সামনে নিজেকে একজন সক্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরা, সহকর্মীদের মাঝে এই ব্যক্তিত্বের ভালো প্রভাব ফেলা। আসলেই এমন বহির্মুখী আত্মপ্রকাশ সাফল্য অর্জনে ও কর্মক্ষেত্রে সুপরিচিতি অর্জনের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা বর্তমান তরুণ প্রজন্মের কাছে আরো বেশি পরিচিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্পোরেট জগতে যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সামনের ধাপে পা দিতে হবেই, যদি লক্ষ্য থাকে বসের বা উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সহকর্মীদের মাঝে নিজেকে পরিচিত করে তোলা। এ বিষয়ে মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই তারা কর্পোরেট জগতে পা দেন। তবে এই প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবের মুদ্রার মতোই এপিঠ-ওপিঠ আছে।

চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি সবসময়ই একেকটি সুযোগ হিসেবে কাজ করে, নিজের দক্ষতা ও সমস্যা সমাধানের কৌশলগুলো ঝালিয়ে দেখার জন্য। কোনো অফিসে বা কর্মক্ষেত্রে এমন সময় এলে নিজেকে প্রমাণ করার জন্য সেই দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের মাঝে একরকম অলিখিত প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়; কীভাবে সবচেয়ে ভালো ও আকর্ষণীয়ভাবে কাজটি করা যায়, যাতে উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রভাবিত হন। এমন পরিস্থিতিতে নিজেকে প্রমাণ করার তৃষ্ণা থেকে কর্পোরেটদের মাঝে যে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়, তা যদি কারো জন্য ক্ষতির কারণ না হয়ে থাকে, তাহলে এমন প্রতিযোগিতা তাদের কাজ করার স্পৃহাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। কাজের আগ্রহ সৃষ্টি করতে, কর্মক্ষেত্রে উদ্দীপক পরিবেশ তৈরি করে, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এ প্রতিযোগিতা ইতিবাচক ফলাফল ভূমিকা রাখে।

একটি প্রতিযোগিতামূলক কর্মক্ষেত্রের আরো বেশ কিছু সুফল পাওয়া যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। বেশিরভাগ কর্পোরেট স্বভাবতই প্রতিযোগী মনোভাবের হয়ে থাকেন। তাদের এ স্বভাবে প্রভাবক হিসেবে যদি প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া সম্ভব হয়, সেক্ষেত্রে তাদের অজান্তেই তাদের আশাতীত অর্জনের পথ সৃষ্টি করা সম্ভব হতে পারে, যা ভবিষ্যতে সেই প্রতিষ্ঠানেরই অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখবে।

যদি কর্মচারীদের মাঝে ইতিবাচক প্রতিযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি করা যায়, যেখানে প্রত্যেকেই নিজেদের দক্ষতাকে বাকিদের সামনে প্রকাশ করে তুলতে চায়, তাহলে তাদের মাঝে আলস্য ও কাজের প্রতি উদাসীনতা দূর হয়ে গিয়ে প্রতিনিয়ত কর্মস্পৃহা বাড়তে থাকে। কর্মচারীরা দায়িত্ব নিতে তখন নিজেরাই মুখিয়ে থাকবেন, কারণ প্রতিটি কাজই তখন তারা নিজেকে প্রমাণ করার একেকটি সুযোগ হিসেবে দেখবেন।

যেকোনো কাজে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকতে প্রয়োজন নিজের ব্যক্তিগত দক্ষতা বাড়ানো, নিজের দক্ষতাগুলো আরো শাণিত করে নেওয়া। এতে কর্মচারীদের মাঝে দক্ষতা বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। একই কাজের বিভিন্ন সৃষ্টিশীল পন্থা উদ্ভাবন করা যায়, নতুন নতুন আবিষ্কারও দেখা যায়। মোদ্দা কথা, সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায় এবং দলগত কাজেও এর প্রতিফলন পাওয়া যায়।

কিন্তু এ প্রতিযোগিতার মনোভাব যদি নৈতিকতার লক্ষণরেখা পার হয়ে ক্ষমতালিপ্সায় পরিণত হয়, তখনই ঘটে বিপত্তি। সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথটা যদি এমন হয়, যাতে আশেপাশের মানুষের, সহকর্মীদের ক্ষতি হচ্ছে, তারা পিছিয়ে পড়ছে, তবে এমন মনোভাবের অসারতাই তখন মুখ্য হয়ে দাঁড়াবে। অনেকসময় দেখা যায়, অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের পথে অনেকে অন্যকে ঠেলে সরিয়ে দেয়, হীন ও নীতি বিবর্জিত কাজ করতেও পিছপা হয় না। সাফল্য অর্জনের পথে এমন স্বার্থপর মনোভাব মোটেই কোনো ভালো ফলাফল আনতে পারে না।

একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের মাঝে যদি এ ধরনের নেতিবাচক প্রতিযোগিতা চলতেই থাকে, তবে তা কর্মচারীদের মনে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে, তাদের মনোবল ভেঙে দিতে পারে। সাফল্য অর্জনের লক্ষ্যে কাজের জায়গায় যদি এই বিষাক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে যায়, তাহলে কর্মচারীদের কাজ করার আগ্রহ একেবারেই মরে যেতে পারে। কারণ তখন কাজের চেয়েও নিজের ব্যক্তিগত অভিলাষ জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। এতে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া কর্মচারীদের মাঝে হতাশা ও নেতিবাচকতা জন্ম নেয়, যার ফলস্বরূপ অনেকেই কাজ করার আগ্রহ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে। তাদের আত্মবিশ্বাস কমে যায়, তাদের মাঝে আবারো একই ধরনের ব্যর্থতার ভয় কাজ করতে থাকে এবং উৎকণ্ঠা বাড়তে পারে, যার ফলে মানসিক চাপ বেড়ে যেতে পারে।

কর্পোরেটদের মাঝে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার পেছনেও এই প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবের দায় সবচেয়ে বেশি। কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের মাঝের সুস্থ সীমানা ভুলে সহকর্মীদের তিক্ততা কাজের বাইরের জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে। এ ঈর্ষার প্রভাব হিসেবে তারা সহকর্মীদের সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টাও করতে পারে। দিনশেষে ব্যক্তিজীবনেও কাজের চাপ ও হতাশা, দুশ্চিন্তা ও মানসিক অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য নেতিবাচকতা হলো, ভুল উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা। কাজের যে বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে কাজের ফলাফল ভালো করার কথা, সেখানে নিজের ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য চেষ্টা করে ফলাফল আরো খারাপ হতে পারে, তাই কাজের গতিপ্রকৃতিও পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে।

মার্কিন মনোরোগবিশেষজ্ঞ মার্লা গটশক (পিএইচডি), লিংকড ইন-এ কর্মক্ষেত্রে এমন প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ন্ত্রণে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন, প্রতিযোগিতা থাকলে এর উপস্থিতি স্বীকার করে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং এর সাথে খাপ খাইয়ে সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করা উচিত।

কর্মক্ষেত্রে আরেকজন সহকর্মীর পদোন্নতিকে স্বীয় পরাজয় হিসেবে দেখার প্রবণতা ত্যাগ করা বাঞ্ছনীয়। কারণ অপরের সাফল্য মানেই নিজের ব্যর্থতা নয়। বন্ধুভাবাপন্ন সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে যেমন সহযোগিতা লাভের সম্ভাবনা থাকে বেশি, তেমনি সাফল্যের সম্ভাবনাও থাকে বেশি।

প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত নিজের সাথে, তাই নিজের অবস্থার উন্নতির জন্য বিভিন্ন সফট স্কিল চর্চা করতে হবে। নিজের সাফল্যের বাটখারা নিজের মাঝেই রাখা প্রয়োজন। অন্যের ক্ষতি হয়, এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে সে অবস্থানে নিজেকে চিন্তা করে নেওয়া প্রয়োজন।

যেকোনো কর্মক্ষেত্রে সুস্থ পরিবেশ কর্মীদের কাজের জন্য সবচেয়ে কার্যকর। তাই যদি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরির প্রয়োজন হয়েও পড়ে, তা হোক সুস্থ ও প্রেরণাদায়ী।

তাহসীন নাওয়ার প্রাচী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।

amipurbo@gmail.com

Share if you like