ঈদ, কোরবানি, জীবন ও জীবিকার কথা বিবেচনায় এনে ১৫ জুলাই হতে ২২ জুলাই পর্যন্ত লকডাউন শিথিল করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যবিধি মানার শর্তসাপেক্ষে দেশব্যাপী গণপরিবহন, ট্রেন, লঞ্চ, শপিংমল খুলে দেওয়া হয়েছে। আর এতে সারা দেশেই মানুষের চলাচল বেড়েছে বহুগুণ। বিশেষ করে ঈদকে সামনে রেখে শহর থেকে কোটি মানুষ গ্রামে যাচ্ছে। যেন নাড়ির টানে ঘরে ফিরছে সবাই।
কিন্তু, এই সময়ে মানুষের অবাধ চলাচল ও গাদাগাদির ইদযাত্রা দেশের করোনা পরিস্থিতির আরো অবনতি ডেকে আনবে বলে মনে করছেন বাংলাদেশের একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী। তাঁর মতে, জাতীয় পরামর্শক কমিটির পরামর্শের বাইরে গিয়ে সরকার লকডাউন শিথিলের যে সিদ্ধান্ত দিয়েছে, তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। তবে এর মাঝেও মানুষ যদি কয়েকটি বিষয়ে নজর দেয়, তাহলে কিছুটা রেহাই পাওয়া যেতে পারে।
তিনি বলেন, “বর্তমানে যে শিথিল বিধিনিষেধ চলছে, তার আগে আমরা দু'সপ্তাহের কঠোর লকডাউনের মাঝে ছিলাম। তারও আগে তিনদিনের সীমিত পরিসরের বিধিনিষেধ ও বিভিন্ন জেলায় লকডাউন চলছিল। তবে কোনোকিছুতেই করোনা সংক্রমণের ধারা ব্যাহত করা যায়নি। আশা ছিল, দুই সপ্তাহের লকডাউনের পর সংক্রমণ কমে আসবে। কিন্তু সংক্রমণ কমেনি। বিজ্ঞানসম্মতভাবে করোনা প্রতিহত করার পদ্ধতি সে অনুযায়ী আরো ১৪ দিন লকডাউন দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। সেই অনুযায়ী আমাদের জাতীয় পরামর্শক কমিটি লকডাউনের পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু সরকার তার নিজস্ব ভাবনা থেকে লকডাউন তুলে দেয়।”
লকডাউন তুলে দেওয়ার ফলে ৭ থেকে ১০ দিনের মাঝে করোনা সংক্রমণ বাড়বে এবং দেশে করোনা চিকিৎসায় বিপর্যয় নেমে আসবে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, লকডাউন তুলে দেওয়ায় এখন অপ্রতিহতভাবে করোনার সংক্রমণ বাড়তে থাকবে। বিশাল জনসংখ্যার অবাধ চলাচল ও পশুর হাটকে কেন্দ্র করে করোনার বিস্তৃতি বাড়বে। এবং আমরা কয়েকদিনের মাঝে এর প্রতিফলন দেখতে পারব।
ডা. লেলিন চৌধুরী আরো বলেন, “আশঙ্কা করা যাচ্ছে যদি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা না যায়, তাহলে ঈদের ১ম ও ২য় সপ্তাহে সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে। এতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়বে। হাসপাতালে ইতোমধ্যে সিটের সংকট দেখা দিয়েছে, যা আরো তীব্র হবে। অক্সিজেন, আইসিইউ শয্যার সংকট দেখা দেবে। এতে করে বিনা চিকিৎসায়ও অনেক মানুষ মারা যেতে পারে। যদি আমরা বর্তমানে অবস্থা প্রতিরোধে সঠিক কার্যক্রম গ্রহণে দেরি করি বা ব্যর্থ হই, তাহলে তাহলে এর মূল্য আমাদের প্রচুর মৃত্যু, ভোগান্তি, অর্থনৈতিক ক্ষতি, স্বাস্থ্যহানির মাধ্যমে দিতে হবে।”
তবে জনসাধারণ যদি কয়েকটি বিষয়ে সচেতন থাকে, তাহলে কিছুটা রেহাই পাওয়া যেতে পারে বলে তাঁর ধারণা। এ বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে মাস্ক পরা। এটি প্রত্যেককে অতি আবশ্যকীয় কাজ হিসেবে মানতেই হবে। ঈদে যাত্রাপথে সবাইকে অবশ্যই মাস্ক পরে চলাচল করতে হবে। এছাড়া যথাসম্ভব ভিড় এড়িয়ে চলা, নিয়মিত হাত ধোয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।
এছাড়া পঞ্চাশের অধিক ও ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যক্তিদের জরুরি প্রয়োজন ছাড়া একদম বাড়ির বাইরে না যাওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, “এই সময়ে পঞ্চাশের ঊর্ধ্বে বয়স্ক ব্যক্তিরা যেন একদম জরুরি প্রয়োজন ব্যতিরেকে বাড়ির বাইরে ও কোরবানির পশুর হাটে না যায়। একইসাথে ১৮ বছরের কম বয়সীরাও যেন বাইরে না যায়। পরামর্শ থাকবে, যাদের ভ্যাকসিন নেওয়া আছে, তারা যেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে কোরবানির হাটে যায়। তাহলে এই সাবধানতা সংক্রমণের হার কিছুটা কমাতে পারবে।”
এছাড়াও করোনা টিকা গ্রহণে সবাইকে আগ্রহী হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন ডা. লেলিন চৌধুরী। তিনি বলেন, “দেশে চলমান যে টিকাদান কর্মসূচী চলছে তাতে যাদের রেজিস্ট্রেশন করার সুযোগ আছে, তারা যেন যত দ্রুত সম্ভব রেজিস্ট্রেশন করে টিকা নিয়ে নেয়। তাহলে করোনা মহামারির তীব্রতা থেকে আমরা অনেকটাই রেহাই পেতে পারব।”
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেয়া সাম্প্রতিক তথ্যমতে, বিশ্বে করোনা মহামারির তৃতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। হয়তো সামনে আরো ভয়াবহ অবস্থা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। ঠিক এ সময়ে বাংলাদেশে ঈদ উপলক্ষ্যে বহু মানুষ নাড়ির টানে গ্রাম থেকে শহরে, শহর থেকে গ্রামে ছুটে যাচ্ছে। এ যাত্রায় সবাইকে অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। অন্যথায় দেশ ও জনগণ কঠিন বিপদের সম্মুখীন হতে পারে।
ফরহাদুর রহমান কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী। farhadrahman702@gmail.com
