করোনা ভাইরাসের প্রকোপে কেবল মৃত্যুযজ্ঞ নয় বরং দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে নাড়া দিয়ে গেছে। । ওদিকে ডাক্তার পাড়ায় খোঁজ মিললো রোগীরা, উঁহু এখানে বিশেষভাবে বলতে হয় ‘নারী রোগী’রা দলে দলে ভীড় করছে। ইটিং ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত এই সকল নারীরা। ইটিং ডিজঅর্ডার নতুন কোনো রোগের নাম নয়। তবে হ্যাঁ, করোনার কারণে এই ব্যধি নারীদের মধ্যে বিশেষভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং অংকের হিসেবে বললে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে তা প্রায় দ্বিগুণ।
কেন নারীরা এই রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে? আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য করোনার প্রভাবকেই কেন দায়ী করা হচ্ছে? আর কোন কোন খাবারের প্রতিই বা আসক্তি বেড়েছে? এ বিষয়গুলো প্রাসঙ্গিকভাবেই যেন জানার আগ্রহের তালিকায় চলে আসে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স ফর ইটিং ডিজঅর্ডারের এডুকেশন অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজার, অ্যালি ওয়েজারের মতে, ইটিং ডিজঅর্ডারের লক্ষণের মধ্যে রয়েছে খাবার লুকিয়ে রাখা, লুকিয়ে লুকিয়ে খাওয়া, নতুন ডায়েট প্ল্যান শুরু করা, কায়িক পরিশ্রম বা ব্যায়াম নিয়ে বাড়তি ভাবনা।
ইউএস সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের একটি গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, করোনা মহামারীর মধ্যে ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী নারীদের (বা কিশোরীও বলা যেতে) মধ্যে ইটিং ডিজঅর্ডার প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে গেছে।
সাধারণত একজন পুরুষের তুলনায় একজন নারীর ইটিং ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ১০ গুণ অধিক এবং এই সমস্যাটি মানসিক স্বাস্থ্যের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।
দ্য আমেরিকান জার্নাল অফ ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনের তথ্যমতে, জাপানে এই রোগের সর্বাধিক ব্যাপ্তি রয়েছে। এছাড়াও হংকং, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান, সাউথ কোরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রে ইটিং ডিজঅর্ডারে আক্রান্তের সংখ্যা নেহায়েত মন্দ নয়।
এর কারণ অনুসন্ধানে সেখানে সম্ভাব্য বেশকিছু বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে যার প্রতিটিই করোনা মহামারীর প্রভাবের সাথে জড়িত।
প্রথম এবং প্রধাণ কারণ ধরা হচ্ছে, এই মহামারীর কারণে সতর্কতা হিসেবে বাড়িতে দীর্ঘসময় থাকার কারণে প্রতিদিনের জীবনযাত্রার ধরনে একটি বিশাল পরিবর্তন এসেছে। খাওয়া-দাওয়া, শারীরিক খাটুনি, মানসিক স্বাস্থ্যের পরিবর্তনের পাশাপাশি জীবনে যোগ হয়েছে করোনাকালীন পরিস্থিতির কারণে এক ধরনের মানসিক চাপ।
বাবা-মা, পরিবার - পরিজন, বন্ধুবান্ধব বা অল্পপরিচিত মানুষগুলো করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে; সুস্থভাবে বেঁচে থাকা কাছের মানুষগুলোর আয়-উপার্জনের পথ পরিবর্তিত বা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে সেই মানুষগুলোর দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা –এইসব প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করার ফলে এক ধরনের ভীতি, উদ্বেগ কাজ করছে মনের মধ্যে। আর এই মানসিক অনুভূতিগুলোর সাথে খাদ্যাভাসের একটি সুচারু সম্পর্ক রয়েছে।
যে বয়সে হেসে-খেলে স্কুলে বা খেলার মাঠে সবার সাথে আনন্দে দিন কাটানোর কথা, সেখানে ঘরবন্দি পরিস্থিতি একটা গুমোটভাব তৈরি করেছে দৈনন্দিন জীবনে। বিষন্নতা রোজকার খাবারের অভ্যাসকে অনিয়মিত করেছে।
স্কুল বন্ধ থাকার কারণে ঘরে বসে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে সময় ব্যয় করছে সবাই, বিশেষত কিশোরীদের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে।সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন ডায়েট প্ল্যানের পোস্টগুলো দেখে তারা নিজেরা সেসব অনুসরণ করছে যার ফলে ইটিং ডিজঅর্ডারে ভুগছে।
ইটিং ডিজঅর্ডারের ব্যাপারেবোস্টন চিলড্রেনস হসপিটালের ইটিং ডিজঅর্ডার প্রোগ্রামের পরিচালক এবং চিকিৎসক, ট্রেসি রিচমন্ড বলেন, “লিঙ্গ, বয়স, গোত্র, বর্ণ নির্বিশেষে যেকেউই এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে, তবে করোনা মহামারীর সময়ে আমরা এই রোগে আক্রান্ত যে পরিমাণ রোগী পেয়েছি তা অতীতের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।”
ইটিং ডিজঅর্ডারের পরিণতি খুবই ভয়াবহ। নানারকম মানসিক সমস্যা তৈরির পাশাপাশি শারীরিক জটিলতারও সৃষ্টি হয়, যেমন-উচ্চ কোলেস্টেরল, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগের সমস্যা, ডায়াবেটিস। সঠিক সময়ে বা একদম শুরুর দিকে এই রোগ চিহ্নিত হলেও তা সেরে উঠতে অনেক সময় লেগে যায়, বলতে গেলে প্রায় বেশ কয়েক বছর। আর এই রোগের চিকিৎসাও অনেক ব্যয়বহুল যার ফলে বেশিরভাগ রোগীর পক্ষেই তা সাধ্যের বাইরে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইটিং ডিজঅর্ডার অ্যাসোসিয়েশনের মতে, চিকিৎসার অভাবে প্রতি বছর মোট আক্রান্তের ২০ শতাংশ মারা যায় এবং চিকিৎসা গ্রহণের পর মৃত্যুর হার প্রায় ২– ৩ শতাংশ।
ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ সায়েন্টিফিক রিপোর্টে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্র অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ইটিং ডিজঅর্ডারের ঝুঁকি দিনে দিনে বাড়ছে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের উপর একটি জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশের ৩৭.৬ শতাংশ শিক্ষার্থী এই রোগের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে এই জরিপে নারী-পুরুষ বা বিশেষভাবে বয়সের কোনো মাপকাঠি উল্লেখ করা হয় নি।
শবনম জাবীন জেবা ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক থেকে ফার্মেসি বিভাগে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন।
zabin860@gmail.com
