করোনাজয়ীদের বয়ানে সেইসব দিনলিপি


মোঃ ইমরান খান | Published: August 30, 2021 12:11:59 | Updated: August 31, 2021 19:50:33


করোনাজয়ীদের বয়ানে সেইসব দিনলিপি

সদা প্রাণবন্ত, পরিবারের মধ্যমণি হয়ে থাকা ছেলেটি প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে নীরবে-নিভৃতে একটি কক্ষে একা।‌

অত্যন্ত কর্মঠ, মিশুক, দুরন্ত, আনন্দপ্রেমী মানুষ, যিনি সুযোগ পেলেই পাহাড় আর নদীতে ঘেরা দুর্গম অঞ্চলে ছুটি কাটাতে পছন্দ করেন, তিনি দীর্ঘ ত্রিশদিন কাটিয়েছেন চার দেয়ালে বন্দী থেকে।

ভবিষ্যত ডাক্তার, একজন সচেতন ও বাস্তববাদী ব্যক্তি, যার জীবনে পরিবার ও কর্মজীবন মুখ্য- তিনিও একা হয়েছিলেন গোটা তিনেক সপ্তাহের জন্য।

উপরের গল্পগুলো তিনজন ভিন্ন পেশার মানুষের। প্রথম ব্যক্তি একজন ভবিষ্যত সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, দ্বিতীয়জন পেশাদার সাংবাদিক এবং তৃতীয়জন ভবিষ্যত ডাক্তার। তাদের জীবনে সাধারণ যে বিষয়টি তা হলো, তারা তিনজনেই কোভিড-১৯ পজিটিভ হয়েছিলেন।

করোনা পজিটিভ হওয়া থেকে শুরু করে করোনা নেগেটিভ হওয়া পর্যন্ত তাদের মানসিক, শারীরিক অবস্থা ও সামগ্রিকভাবে করোনা আক্রান্ত অবস্থায় তাদের জীবন নিয়েই আজকের লেখা।

পূর্ব-প্রস্তুতি

"আমার বাবা ২৬ জুলাইয়ে করোনা পজিটিভ হয়েছিলেন। তখন থেকে আমিও শারীরিক অসুস্থতা অনুভব করতে থাকি। কোভিড পজেটিভ হবার উপসর্গগুলো সম্পর্কে আমার আগে থেকেই ধারণা ছিল। তাই ২৯ জুলাই আমি কোভিডের জন্য পরীক্ষা করাই। ২ আগস্টের পরীক্ষার ফলে আমি নিশ্চিত হই যে আমিও একজন কোভিড পজিটিভ"।

কথাগুলো বলেছেন এস.এম শাদমান ইসলাম, যিনি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বাদশ সেমিস্টারের ছাত্র।

কোভিড সম্পর্কে পূর্বধারণা থাকায় কোভিড পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবেলা করতে হয় এ নিয়ে শাদমানের তেমন বেগ পেতে হয়নি। এ সম্পর্কে তিনি বলেছেন "আমার বাবা আগে করোনা পজিটিভ হয়েছিলেন। তাই একজন করোনা পজিটিভ ব্যক্তির জন্য কী কী করা উচিত, কীভাবে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, তার সম্পর্কে আমার পূর্বধারণা ও অভিজ্ঞতা দুই-ই ছিল। তাই আমি সেভাবেই প্রস্তুতি নিই।

প্রায় একইরকম অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন মেহেরুন নাহার মেঘলা। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রতিবেদক হিসেবে আছেন। মেঘলা কোভিড পজিটিভ হয়েছিলেন এ বছরের ২৯ জুলাইয়ে।

তিনিও পরীক্ষার ফলাফল আসার আগে থেকেই কোভিড পজিটিভ হওয়ার লক্ষণসমূহ অনুভব করছিলেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা আগে যখন কোভিড আক্রান্ত হয়েছিলেন, তখন তিনিই তাদের দেখাশোনা করেছেন। তাই কোভিড সম্পর্কে পূর্বপ্রস্তুতি তারও ছিল।

ফলে, কোভিড আক্রান্ত হয়েছেন নিশ্চিত হওয়ার আগে থেকেই তিনি আইসোলেশনে চলে গিয়েছিলেন।

কোভিড মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ, যেমন: ইনহেলার, পাল্স অক্সিমিটারসহ কোভিড সংক্রান্ত যাবতীয় উপকরণ, তিনি আগে থেকেই ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। লক্ষণ প্রকাশ পাবার শুরু থেকেই পরিচিত ব্যক্তি, অভিজ্ঞ ডাক্তারদের সাথে যোগাযোগ রেখেছিলেন।

কোভিডের দিনগুলো

পূর্ব প্রস্তুতি ও অভিজ্ঞতা দিয়ে করোনার শারীরিক প্রভাব মোকাবেলা করা গেলেও মানসিকভাবে সুস্থ থাকা বেশ কষ্টসাধ্য। তাই মানসিক সুস্থতা বজায় রাখার জন্য একেকজন একেক পন্থা অবলম্বন করে। নিজেকে ব্যস্ত রাখাটাই এখানে মুখ্য। যেমনটা রেখেছেন স্বাক্ষর ভট্টাচার্য। তিনি এম এইচ সমরিতা মেডিকেল কলেজের ফাইনাল প্রফেশনালের পরীক্ষার্থী।

স্বাক্ষর বলেন, "করোনা ঠিক যে সময় হয়েছিল, তারপর সামনেই আমার পরীক্ষা ছিল। তাই ঐ অবস্থাতে আমার পড়তে হতো, কিছু করার ছিল না। পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েই সারাদিন কেটে যেত।

দীর্ঘদিন যাবত পৃথক থাকার ফলে অনেকেই মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ে। এ প্রসঙ্গে মেঘলা বলেছেন, "করোনা আক্রান্ত হবার পর প্রথম পাঁচদিন আমার জ্বর ছিল। সে সময় বাসায় একা আইসোলেশনে ছিলাম। তখন বেশ খারাপ লাগতো। তবে ধীরে ধীরে, পাঁচ-ছয়দিন পর, থেকে শারীরিকভাবে কিছুটা সুস্থ বোধ করতে থাকি।

তিনি আরো বলেন, "নেগেটিভ হয়েছি কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমি পরীক্ষা করাই। এই পরীক্ষার ফল আসে এক সপ্তাহ পর। অর্থাৎ, প্রায় ২৫ দিনের মতো আমি পৃথক ছিলাম। তখন মানসিকভাবে খুব খারাপ ছিলাম।

সময় কাটানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "শুরুর দিকে কিছুই করার ছিল না, তবে নিজে কিছু কাজ করতাম। সিনেমা দেখতাম, গান শুনতাম, মানুষের সাথে ফোনে কথা বলতাম। আমি অফিসের কাজও করেছিলাম। এভাবেই সময় কেটে যেত।

পড়ালেখা, অনলাইন ক্লাসে সময় কেটেছে শাদমানের। তিনি বলেন, "আমি প্রথম কয়েকদিন বেশ অসুস্থ ছিলাম। তখন মানসিক অবস্থা এতটা ভালো ছিল না। নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করেছি। আমি এই সময় আলাদা কক্ষে ছিলাম। তখন অনলাইন ক্লাস, ইউটিউবে গান আর মোবাইলে গেইম খেলে সময় কেটে যেত।

কোভিড পরবর্তী প্রতিক্রিয়া

কোভিড পরবর্তী প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। অনেকের খাবার রুচিতে পরিবর্তন আসে। মেঘলা জানান, যখন তিনি নিয়মিত ঔষধ সেবন করছিলেন, তখন খাবারের রুচি স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু, নেগেটিভ হওয়ার পর ঔষধ বন্ধ করার ফলে খাবারের প্রতি অরুচি চলে এসেছিল। তাছাড়া শারীরিক দুর্বলতাও ছিল।

স্বাক্ষর ভট্টাচার্য পোস্ট কোভিড সাইকোসিসের কথা বলেছেন। এটি হলো কোভিডে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মানসিক অবস্থায় আচরণগত পরিবর্তন। তার নিজের এরকম কোনো সমস্যাই হয়নি‌। তবে তিনি মনে করেন, এমনটা কারো হলে মনোচিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করা উচিত।

করণীয়

করোনা পজিটিভ হয়েছেন, এমন রিপোর্ট পাওয়া মাত্রই আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রুমে অর্থাৎ আইসোলেশনে যেতে হবে‌, যেখানে প্রচুর পরিমাণে আলো বাতাসের ব্যবস্থা রয়েছে, বলেছেন শাদমান।

এ প্রসঙ্গে নিয়মিত ডাক্তারের সঙ্গে নিয়মিতি যোগাযোগ রাখতে পরামর্শ দিয়েছেন স্বাক্ষর। তিনি এ-ও বলেন, "হেলথকেয়ার ও আশেপাশের হাসপাতালের যোগাযোগ নম্বর, করোনা মোকাবেলার জন্য সরঞ্জামাদি, সব কিছু ব্যবস্থা করে রেখেছিলাম আমি। কোভিডের লক্ষণসমূহ বোঝার সাথে সাথেই ডাক্তারের সাথে আলাপ করতে হবে। পরিচিত কেউ হোক, বা অনলাইন ব্যবস্থায়- যেভাবেই হোক ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ঔষধ সেবন করতে হবে।

কোভিড প্রভাবে শারীরিক ও মানসিক দিকটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। মেঘলা মনে করেন, "মানসিকভাবে দৃঢ় থাকার চেষ্টা করতে হবে, কেননা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার সাথে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে যায়, আর আতঙ্কিত হলে শরীরও দুর্বল হয়ে যায়।

মোঃ ইমরান খান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।

mohd.imranasifkhan@gmail.com

Share if you like