অজানা অথবা অনিশ্চিত যেকোনো কিছুই নিজের সাথে বয়ে আনে ভীতি, দুশ্চিন্তা আর মানসিক চাপ। তাই করোনা অতিমারী যে সামগ্রিকভাবে বিশ্বব্যাপী মানুষের শরীরের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যেও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে, তা কিছুটা অনুমেয়ই ছিল। শুধু অনুমেয় ছিল না এর ব্যাপকতা।
করোনাভাইরাসের প্রথম দেখা মেলে চীনের উহানে, ২০১৯ সালের একদম শেষভাগে। পরবর্তীতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভাইরাসজনিত এই রোগকে মহামারী ঘোষণা করে ২০২০ সালের ১১ ই মার্চ। কোভিডের কারণে এপর্যন্ত বিশ্বব্যাপী মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৩১ লাখ মানুষের। দুঃখের ব্যাপার হলো, এখন পর্যন্ত এই সংখ্যা দিনকে দিন শুধু বৃদ্ধিই পাচ্ছে। এহেন অবস্থায়, করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে বিশ্বের প্রায় সব দেশের সরকারপ্রধানরাই লকডাউন ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ওপর দিয়েছেন সর্বোচ্চ গুরুত্ব। ফলে, বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিগত দেড় বছর ধরে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রয়েছে।
লকডাউনের বাধ্যবাধকতায় শিশুরা এখন পুরোপুরি গৃহবন্দী। একদিকে মহামারীকালীন ভীতি ও অনিশ্চয়তার জীবন, অন্যদিকে সমবয়সী সঙ্গী -সাথীদের সাথে ন্যূনতম যোগাযোগ ও খেলার সুযোগের অভাব; এমন অবস্থা শিশুমনে ফেলছে মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া। ২০২০ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স আর লো কমেডের একটি যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লকডাউনের কারণে সৃষ্ট একাকিত্ব ও প্রযুক্তিনির্ভরতা শিশুদেরকে ঠেলে দিচ্ছে অনিদ্রা, দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ আর দীর্ঘস্থায়ী অবসাদের দিকে।
করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সরকার দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে বিগত সালের মার্চ মাসের ১৭ তারিখ থেকে। এর ফলে দেশের ৩৭ লাখ শিক্ষার্থী এবং ৮ লাখের বেশি শিক্ষকের জীবন এখন চার দেয়ালে আবদ্ধ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, করোনাভাইরাস সংকটের জন্য বাংলাদেশে প্রতি চারজন যুবকের মধ্যে একজন এখন কর্মহীন বা বেকার অবস্থায় রয়েছেন (২৭.৩৯ শতাংশ)। তাই লকডাউনের সাথে এই অনাকাঙ্ক্ষিত বেকারত্ব সাধারণ জনগণকে ক্রমবর্ধমান অবসাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু করে হঠাৎ করে আরোপিত এক নতুন জীবনধারার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে না পেরে তরুণরা হয়ে পড়ছেন দুশ্চিন্তা ও অবসাদগ্রস্ত; কেউবা আবার বেছে নিচ্ছেন আত্মহত্যার পথ। এর প্রমাণ পাওয়া যায় বিগত এক বছরে দেশের নানা প্রান্তে সংঘটিত আত্মহননের পরিসংখ্যান দেখে। বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা, হাসপাতাল ও থানা থেকে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা যায় যে, ২০২০ সালে দেশে আত্মহত্যার ঘটনা ছিল ১৪ হাজার ৪৩৬টি। অথচ ২০১৯ সালে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ১০ হাজারের কাছাকাছি। অর্থাৎ করোনাকালীন পরিস্থতির দরুন দেশে আত্মহত্যার ঘটনা বেড়েছে বিগত বছরের তুলনায় প্রায় ৩৬ শতাংশ, যা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। এছাড়া, বাংলাদেশে ২০১৮ সালে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক জাতীয় জরিপে দেখা যায়, দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মানসিক রোগের হার ১৮.৭ শতাংশ। এর মধ্যে ৬.৭ শতাংশ বিষণ্নতা আর ৪.৭ শতাংশ ছিল অ্যাংজাইটি বা উদ্বেগজনিত সমস্যা। অথচ করোনাকালে বাংলাদেশে পরিচালিত কিছু গবেষণায় অংশগ্রহণকারীর মধ্যে প্রায় ৩৩ শতাংশের মধ্যে উদ্বেগজনিত সমস্যা এবং ৪৬ শতাংশের মাঝে বিষণ্নতার লক্ষণ পাওয়া গেছে। বিগত বছরের তুলনায় দুটোই বহুগুণ বেশি। এইসব পরিসংখ্যানই বলে দেয়, লকডাউন বহির্বিশ্বের মতো বাংলাদেশের সাধারন জনগণের মানসিক স্বাস্থ্যেও ফেলেছে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব।
করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের অবস্থা বর্তমানে খুব নাজুক। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ঝুঁকির বাইরে, এমন কিছু তাই আর বলা যাচ্ছে না। করোনা মোকাবিলায় দেশে এখন দ্বিতীয় দফার লকডাউন চলছে, শীঘ্রই জনজীবন তার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাবে, এ আশা করা এখন দুষ্কর। তবে আশার কথা হলো, এমন অবস্হাতেও মানুষ ধীরে ধীরে লকডাউন তথা গৃহবন্দী জীবনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে শিখছে। অনেক অফিস আদালত এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যকলাপ এখন অনলাইনে পরিচালনা করছে। তাই, মানুষের গৃহবন্দী জীবনেও এখন হয়েছে গতির সঞ্চার। টিকা আসার পর করোনা নিয়ে অনিশ্চয়তাও অনেকাংশে দূর হয়েছে।
বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে করোনার নেতিবাচক প্রভাবকে মাথায় রেখে সহায়তার জন্য এগিয়ে এসেছে। এক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যারা করোনা মহামারূর সূচনালগ্ন থেকে বিনামূল্যে অনলাইন অথবা মোবাইল ফোনে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছেন। এছাড়া, বাংলাদেশ সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টার এবং রিজিওনাল ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টারের চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীরা, বাংলাদেশ ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশনের মনোবিজ্ঞানীরা করোনাকালে বিনামূল্যে টেলিকাউন্সেলিং সেবা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মনের বন্ধু ও ইউএনডিপি, সেরেনিটি এবং কান পেতে রই ইত্যাদি সহ আরো কিছু স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান অনলাইনে অথবা টেলিফোনে বিনামূল্যে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা টেলিকাউন্সেলিং সেবা প্রদান করছে।
তাই আশা করা যায়, সময়ের সাথে ধীরে ধীরে সচেতনতার বৃদ্ধি আর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এরূপ জনহিতকর উদ্যোগ লকডাউনে দেশের সাধারণ জনগণ, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে।
তৌসিফা ফারহাত বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এম এ শিক্ষার্থী।