করোনাকালে অনলাইন ব্যবসা


মোঃ ইমরান খান | Published: September 30, 2021 11:55:45 | Updated: September 30, 2021 16:47:56


করোনাকালে অনলাইন ব্যবসা

করোনা মহামারির জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যে পরিবর্তন আসে। এর প্রভাব ই-কমার্স বাণিজ্যেও দেখা যায়। যেখানে কোভিড-১৯ এর জন্য নতুন কিছু ই-কমার্সের সৃষ্টি হয়েছে, একই কারণে পণ্যস্বল্পতা কাটিয়ে কিছু ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ঘুরে দাঁড়িয়েছে নতুন উদ্যমে।

'খুশ-khush' ও 'জুটেক (zootech)' এরকমই দুটি ই-কমার্স ব্যবসা। খুশের যাত্রা যেখানে করোনা সময়েই শুরু, অন্যদিকে জুটেক দাঁড়িয়ে আছে করোনাকে রুখে দিয়েই।

করোনায় ব্যবসা

"করোনাকালীন স্বাস্থ্য সচেতনতার অংশ হিসেবে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনানুযায়ী নিজেদের জন্য নন মেডিক্যাল মাস্ক বানাতেন আমার মা। পরিচিতরা এই মাস্কে আগ্রহ দেখাতে শুরু করে, তাই ভাবলাম সবার জন্য আরামদায়ক সুরক্ষা সামগ্রী দিয়েই উদ্যোগ শুরু করা যাক।" খুশের সূচনা সম্পর্কে বলেছিলেন খুশের প্রতিষ্ঠাতা শেহেরীন আমিন সুপ্তি। তিনি বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ এবং সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।

করোনার আগে জুটেকের পণ্য বিক্রয় হার প্রত্যাশা অনুযায়ী স্বাভাবিক ছিল বলে জানান সুদয়। করোনার প্রথম ধাক্কায় এই বিক্রির হার প্রথম কয়েকমাসে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। সুদয় বলেন, "করোনার আগে বিক্রির পরিমাণ যেমন ছিল, করোনার প্রথম লকডাউনের সময় এই বিক্রির পরিমাণ কিছুটা বেড়ে যায়, তবে কিছু খাতে ক্ষতির সম্মুখীন হই। ওই সময়ে আমার স্টকে বিভিন্ন ধরনের পণ্য মজুদ ছিল। তাই এর ইতিবাচক প্রভাব ব্যবসাতে পড়ে এবং ক্ষতির পরিমাণ কম হয়।"

তবে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে জুটেকের ব্যবসার সূচক নিম্নমুখী হয়। "করোনার আগে ও পরে ব্যবসায় লাভ-লোকসানের মাঝে মূল যে দুটি পার্থক্য তৈরি হয়। প্রথমত, দ্বিতীয় তরঙ্গের সময় আমার কাছে পর্যাপ্ত পণ্য মজুদ ছিল না। দ্বিতীয়ত, চীন থেকে পণ্যের শিপমেন্ট হওয়া অনেকদিন যাবত স্থগিত ছিল। যার ফলে প্রথম তরঙ্গে ক্ষয়-ক্ষতি কম হলেও করোনার দ্বিতীয় তরঙ্গের আক্রমণের ফলে আমার ব্যবসা প্রায় বন্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল।"

অপরদিকে করোনাকালে খুশের মাস্কের ব্যবসা বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। রং-বেরঙের বিভিন্ন নকশা সম্বলিত মাস্ক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশানুযায়ী তৈরি করেন সুপ্তি ও তার মা। বেশ কম সময়ের মধ্যেই লাভের মুখ দেখেন তাঁরা।

প্রতিবন্ধকতা

করোনার সময় মাস্কের চাহিদা স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যবসায় ইতিবাচক সাড়া পান, তবে খুশের যাত্রা মোটেই সহজ ছিল না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেঁধে দেওয়া নিয়ম অনুযায়ী মাস্ক তৈরি করার জন্য অনেক বেগ পেতে হয়। এই প্লাটফর্মে অভিজ্ঞতা ছাড়া প্রথম ব্যবসা করাও ছিল প্রতিযোগিতাপূর্ণ।

এ প্রসঙ্গে সুপ্তি বলেন, "জেলা শহরে প্রয়োজনীয় কাঁচামালের অভাব ও সারাদেশে গ্রাহকদের কাছে মাস্ক সরবরাহ ব্যবস্থার সংকটের জন্য সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। তাছাড়া এই মাধ্যমে অভিজ্ঞতা না থাকাও ছিল অন্যতম কারণ।"

লড়াই

সুপ্তি আরো বলেন, "কাজ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমেই আমরা এসব সমস্যার সমাধান করতে পেরেছি। আমরা পুরো পরিবার মিলে কাজ করেছি খুশের জন্য। সব সমস্যা সবাই মিলেই মোকাবেলা করেছি। কাছের বন্ধুরা বেশ সহযোগিতা করেছিল এক্ষেত্রে।"

তবে সুদয় সাহার মতে, ধৈর্য ধরে রাখা করোনা যুদ্ধ মোকাবেলায় তার প্রধান অস্ত্র।‌ তিনি বলেন, "দ্বিতীয় তরঙ্গের আগমনের ফলে বাজারে পণ্যের চাহিদা ছিল, তবে এক্ষেত্রে সব ধরনের পণ্য স্টকে ছিল না। ফেইসবুকে বিজ্ঞাপন দিয়ে বুস্ট করার মাধ্যমে যে বিক্রি চলমান রাখব, সেই অবস্থাও ছিল না। কেননা পণ্যস্বল্পতার পাশাপাশি মানুষের আর্থিক অবস্থাও খারাপ ছিল। তাই ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।"

চলমান ব্যবসার পিছনে দ্বিতীয় তরঙ্গ সম্পর্কে কোনোরূপ পূর্ব প্রস্তুতি না থাকাকেই তিনি মনে করেন এ ধাক্কার অন্যতম একটি কারণ, "করোনার প্রথম লকডাউন শেষে বাজার খুলে দেয়া হয়। ফলে আমার ধারণা ছিল, সবকিছু আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাবে। তাই পণ্য মজুদ করার কথা মাথায় ছিল না। দ্বিতীয় তরঙ্গ নিয়ে কোনো প্রস্তুতিও নেয়া হয় নি। অতঃপর পুনরায় লকডাউন দিলে আমার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।"

প্রচারণা

করোনার আগে ফেসবুকে পণ্য সংক্রান্ত বুস্টসহ ও বুস্ট ছাড়া দুই উপায়েই পণ্য বিক্রি করেছে জুটেক। তবে করোনার সময় বুস্ট বন্ধ ছিল। অন্যদিকে খুশ ফেইসবুকে পেইজে বুস্ট ছাড়াই তাদের মাস্ক সারা দেশে সরবরাহ করে যাচ্ছে। সুপ্তি জানান, "আমাদের প্রচারণার জন্য বিজ্ঞাপনের ব্যবস্থা বা পেইজ বুস্ট করার প্রয়োজন হয়নি এখনও পর্যন্ত। খুশের গ্রাহক শুভাকাঙ্ক্ষীরাই প্রচারণার প্রধান মাধ্যম হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় ভিত্তিক ও অঞ্চল ভিত্তিক কিছু ই-কমার্স গ্রুপ পেইজের প্রচারণায় সহযোগী হয়েছে অনেক। এখন পর্যন্ত দেশের ৪৫টিরও অধিক জেলায় পৌঁছে গেছে খুশের মাস্ক।"

স্বপ্ন

মানসম্মত মাস্ক তৈরি করতে পেরে সুপ্তি এখন স্বপ্ন দেখেন আরো বড় হওয়ার। ইতোমধ্যেই তিনি সারাদেশ ব্যাপী মাস্ক সরবরাহ করে এই মাধ্যমে আস্থা ও খ্যাতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি।

"২০ টাকার ইলাস্টিক কিনে শুরু হয়েছিল খুশের যাত্রা। এক বছরেরও কম সময়ে খুশের মাস্ক বিক্রির আয় হয়েছে ২ লাখ টাকারও বেশি। ভবিষ্যতে খুশকে প্রসিদ্ধ ফ্যাশন ব্র‍্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাই।দেশের বিখ্যাত সব ব্র‍্যান্ডের সাথে একযোগে যেন খুশ Khushনামটিও উচ্চারিত হয়, সে স্বপ্ন দেখি।"

সুদয় মনে করেন, বাংলাদেশের মানুষ অনলাইনে কেনাকাটার সকল প্রতিবন্ধকতা সমূহকে কাটিয়ে ওঠবে, অনলাইনের উপর আস্থা রাখবে- "আমি নিজেকে এক্ষেত্রে সফল মনে করি। করোনা ঝঞ্ঝাটের মধ্যে টিকে থেকে ইতোমধ্যে জুটেক পাঁচ বছর পূর্ণ করল। গ্যাজেটের মতো প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে পাঁচ বছর সফলতার সাথে কাজ চালিয়ে যাওয়া মানুষের আস্থার প্রমাণ দেয়। আমার মতো উদ্যোক্তাদের জন্য একটাই কথা, ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাস হারাবেন না। ভালো দিন আসবেই।"

মোঃ ইমরান খান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ এবং সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।

Share if you like