Loading...

কবিতা গানে প্রতিরোধ - সুর ও কলম যখন প্রতিবাদের ভাষা

| Updated: February 20, 2022 18:36:03


ফাইল ছবি ফাইল ছবি

তোমাদের লোককথা, তোমাদের গীতমালা, বুলি ভাষা, পাতা, পাথর, চামড়া, প্যাপিরাস, তামা ও লোহায় লিখে রেখো।

এই শব্দ গুলো এসেছিল কবি নওশাদ নুরীর কলম থেকে। যে খাতায় কবিতাটি লেখা হয় তা ছিল তৎকালীন পাকিস্তান, প্রেক্ষাপট বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন আর কলমের কালি উৎসর্গ করা হয় শহীদদের। 

শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে যুগ যুগ ধরে অনেক কবিতা এবং গান রচিত হয়েছে। গণমানুষের দাবি, নিপীড়নের বিরুদ্ধে সুর ও কলমের যুগলবন্দী প্রতিবাদ করেছে বারবার। 

ওরা আমার মুখের কথা কাইড়া নিতে চায়

আব্দুল লতিফ

১৯৫২ সাল। ঢাকার রাজপথ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ গুলোতে শিক্ষার্থীদের ভীড়। সবাই জড়ো হয়েছে পাকিস্তানের চাপিয়ে দেয়া রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার প্রতিবাদে। 

ওই সময়ে যারাই সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলতো তাঁদেরকেই সরকারের রোষানলে পড়তে হতো। তা সত্ত্বেও আব্দুল লতিফ সৃষ্টি করেন তার অমর গান "ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়।" 

তৎকালীন পাকিস্তানের চাপিয়ে দেয়া ভাষার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন কলম ও হারমোনিয়াম দিয়ে। রচনা করেন এই গান যার প্রতিটি শব্দে প্রকাশ পায় নিজ ভাষায় কথা বলার স্বাধীনতা, তুলে ধরেন গান, কবিতা পুঁথি সাহিত্যের ঐতিহ্য এবং ব্যক্ত করেন বংশ ক্রমে চলে আসা নিজ ভাষার ব্যবহার। 

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি

আব্দুল গাফফার চৌধুরী

আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয় শহীদ রফিক। তার মরদেহ তখন ঢাকা মেডিকেলের বারান্দায়। আব্দুল গাফফার চৌধুরী তখন ঢাকা কলেজের ছাত্র। তিনি অধ্যাপক রফিকের সঙ্গে ঢাকা মেডিকেলে জান। 

সেখানেই গুলিবিদ্ধ শহীদ রফিকের মরদেহ দেখতে পান তিনি। অধ্যাপক রফিকের হাতে একটি ক্যামেরা ছিল সেই ক্যামেরা দিয়ে আবদুল গাফফার চৌধুরী শহীদ রফিকের ছবি তুলে নেন।

সেই দিনের সেই ঘটনা তাকে ভীষণ ভাবে নাড়া দেয়। এই বছরই তিনি লিখে ফেলেন কবিতা 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী।' 

এই অমর গানের সুরকারও হলেন আব্দুল লতিফ। পরবর্তীতে এতে  সুর দেন আলতাফ মাহমুদ। প্রতিবাদী এই গানটি আমাদের নিকট ভাষা আন্দোলনের সাথে এক হয়ে মিশেছে যেমন মিশেছে কৃষ্ণচূড়া ফুল, একুশের সাথে। 

মোহেনজো দারো

নওশাদ নুরী

৫২'র একুশে ফেব্রুয়ারীতে রাজপথে যা ঘটেছিল তা শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রদের আওয়াজ উঠেছিল দেশের পশ্চিম অংশেও।

সেই আওয়াজের সাথে মিল রেখে কবি নওশাদ নুরী লিখেন তার মোহেনজো দারো কবিতাটি। মহেঞ্জোদারো মূলত পাঁচ হাজার বছর আগের সভ্যতা যার অস্তিত্ব পৃথিবীর বুকে আর নেই। কবির মতে পশ্চিম পাকিস্তানের বাংলা ভাষার প্রতি যে নীতি গ্রহণ করেছে তাতে এই বাংলার হাল মোহেনজো দারোর মতোই হবে। ইতিহাসে নাম থাকবে তবে অস্তিত্ব নয়।

তাই তিনি বাংলার পক্ষে কলম ধরার দুঃসাহস করলেন। লিখেন এই মোহেনজো দারো কবিতাটি। তখনকার মাসিক পত্রিকা আফকার কবিতাটি ছাপায়।

মোহেনজো দারো

হতে পারে কোনো ঝড়

হতে পারে কোনো সমুদ্র 

হতে পারে কোনো বিজয়ী

হতে পারে কোনো লুটেরা 

পুরো শহর ধুলোর তলে 

ধুলোর তলে ভাষা

আজ ঐতিহাসিকরা বলবে

লোকে বলবে মৃত্যুর ঢিপি

মোহেনজো দারো

লোকে বলবে মৃত্যুর স্তুপ

কোনো মহামারী হয়েছিল

কোনো দুর্যোগ এসেছিল

আমার শহরের বাসিন্দা,

তোমরা নিজেদের পুঁথি, 

নিজেদের গীতা, 

নিজেদের লোক কথা, 

গীতমালা, 

নিজেদের বর্ণমালা, 

নিজেদের মুখের ভাষা 

পাতা, পাথর, চামড়া কিংবা প্যাপিরাস, 

তামা লোহাতে লিখে রেখো 

ওই রোগ আবার দেখা দিয়েছে

ওই দুর্যোগ আবার এসেছে।

রক্ত তবে রক্তই ঝরে গেলে জমে যাবে 

৫০ দশকে বিশ্বজুড়ে শাসক ও শোষিতের লড়াই চলছে। একদিকে শাসক শ্রেণীর অত্যাচার-নিপীড়ন অপরদিকে ঐক্যবদ্ধ শোষিত মানুষের চিৎকার। 

কঙ্গো ও বাংলায় তখন একই চিত্র ছিল। রাষ্ট্র বনাম সাধারণ মানুষ। কবি

সাহির লুধিয়ানভি

তখন এই শোষিত মানুষের নেন। তিনি প্রগতিশীল লেখক সংঘের সদস্য ছিলেন। তার এই কবিতা ওই ‌সময় ভাষা আন্দোলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশে দেয়ালে-দেয়ালে লিখা হয়। 

‘রক্ত তবে রক্তই

ঝরে গেলে জমে যাবে

মরুভূমির বুকে 

কিংবা হন্তারকের জামায় 

বিচারের ত্রুটিপূর্ণ পাল্লায় 

কিংবা শেকলের সংযোগে 

শাসকের তরবারিতে

কিংবা শিরশ্ছেদিত লাশে 

রক্ত তবে রক্তই 

ঝরে গেলে জমে যবে

যে যেখানে ইচ্ছে লুকাতে পারে 

রক্তই বলবে হন্তারকের ঠিকানা 

আঁধার যতোই আসুক সকল ষড়যন্ত্রের পর

প্রতিটি রক্ত ফোটাই হয়ে ওঠবে তখন একেকটি আলোকবর্তিকা’ 

সাহিরের কবিতায় ভাষা শহীদদের প্রতি তার শ্রদ্ধা প্রকাশ পায়। তিনি বলেছেন তাদের আত্মত্যাগের কথা যা বৃথা যায় নি। 

ইতিহাসে কবিতা ও গান রাজ মহলের তাঁবেদারি করতে দেখা যায়। শোভা হয় দরবারের। তবে কিছু হয়ে ওঠে ব্যতিক্রম যা দরবারের লাল গালিচায় ঠাঁই পায় না। ঠাঁই হয় শাসকের তরবারির ধারে এবং মানুষের হৃদয়ে। সেই কবিতা গুলো হয়ে ওঠে অমর। সেগুলোর জায়গা হয় কখনো সাহির-নওশাদের কলমে কখনো লতিফ-গাফফারের সুরে। 

(খুন ফির খুন হে কবিতাটি উর্দু থেকে সরাসরি বাংলায় অনুবাদ করা এবং মোহেনজো দারো কবিতাটি রকশন্দা জলিলের ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলা অনুবাদ করা। কবিতাগুলোর অনুবাদ এই লেখক নিজে করেছেন।)

মোঃ ইমরান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন। 

imran.tweets@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic