পুরনো খবরের কাগজ, ভাঙাচোরা লোহার জিনিসপাতি এমনকি পুরনো কাপড় ফেলে না দিয়ে বেশ যত্ন করেই রাখা হতো একসময়, অনেকের এখনো থাকে। অলস দুপুরে হাঁক ছেড়ে যাওয়া ভাঙারিওয়ালার ডাকের জন্য কেউ কেউ কান পেতে রাখে।
এসব অব্যবহারযোগ্য বস্তুকে তার হাতে তুলে দিয়ে একটা বিকেল পার করার মতো কয়েক মুঠি কটকটি পেতে ভোলে না তারা। অনেকেরই শৈশবের সেইসব জমা করা অকাজের কাজ, স্মৃতির ছাপে জড়িয়ে আছে এই শক্ত ধাঁচের মিষ্ট খাদ্যদ্রব্যটি।
তবে এই ডিজিটাল যুগে ভাঙারির ভাঁড় থেকে কটকটিও বেরিয়ে পড়েছে ডেলিভারিম্যানের কাঁধে করে। কটকটিকে বাংলাদেশের মানুষের কাছে নতুন রূপে ফিরিয়ে আনার কাজটি করেছেন যারা, তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অনলাইন শপ– কটকটি ভাই।
আগ্রহী দম্পতি আসিফ চৌধুরী ও সাকিনা আফরোজ নিভার উদ্যোগেই করোনাকালে এই পেজটির যাত্রা শুরু হয়।
আসিফের রান্নাবান্নার প্রতি ভীষণ ঝোঁক থাকায় সেই সময়টায় তিনি নিত্যনতুন রেসিপি শিখছিলেন। এমনই একদিন কটকটি বানিয়ে চমকে দেন নিভাকে। এরপর পরিচিতমহলে এ নিয়ে ভালো সাড়া পাওয়ায় চিন্তা আসে কটকটির বাজারজাতকরণের। মজাদার নাম দিতে চাওয়ার ইচ্ছা থেকেই মূলত ‘কটকটি ভাই’ নাম, তবে দুজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় উদ্যোগটি সফলভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।
কেন কটকটিকেই বেছে নিলেন নিজেদের ব্যবসার পণ্য হিসেবে, এ জিজ্ঞাসার বিপরীতে আসিফ জানান, “কটকটি আমরা যখন তৈরি করি, তখন নিজেরাই যেন শৈশবে ফিরে গিয়েছিলাম। ছোটবেলার স্মৃতি আমাদেরকেই তাড়া করতে শুরু করে। এখান থেকেই ভাবনাটা তৈরি হয় যে, যদি আমিই এত নস্টালজিক হতে পারি, একজন ক্রেতাও এই পণ্যের সাথে এভাবেই যুক্ত হবে।”
“কটকটি একটি সামান্য মিষ্টি, কিন্তু এর সাথে জড়িয়ে থাকা আবেগ কিন্তু সামান্য নয়। বলা চলে, মানুষকে তার পুরোনো আবেগ ফিরিয়ে দেয়াটাই উদ্দেশ্য ছিল আমাদের।”
কটকটিময় অভিজ্ঞতা পুরো ছেলেবেলা জুড়েই আছে আসিফের। তিনি বলেন, “আমরা যারা নব্বই দশকে জন্মেছি, কত কত ভাঙাচোরা, পুরোনো বইখাতা জমিয়ে কটকটি কিনেছি, তার হিসেব নেই। শুধুমাত্র কটকটি খাবার জন্য ভাঙারি জোগাড় করেছি, এমন স্মৃতিও আছে। সোনালি দিনের গল্প সেসব।”

কটকটি ভাই - এর উদ্যোক্তা আসিফ চৌধুরী ও সাকিনা আফরোজ নিভা দম্পতি
চলার পথে কিছু বাধা এসেছে, সেসব নিয়ে নিভা জানান, ‘আমরা যখন এই পণ্যটি বাজারে এনেছি, হয়তো গুটিকয়েক ব্যক্তি এই পণ্যটি নিয়ে কাজ করেছেন। কিন্তু এটিকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে উপস্থাপন করাটা অনেক চ্যালেন্জিং ছিল। সমালোচনা বেশি হতো। তবে অবশ্যই সকল সমালোচনার ঊর্ধ্বে গিয়ে এটিকে একমাত্র আমরাই উপস্থাপন করেছি।”
“অনেক সাড়া পেয়েছি, সমালোচনা হয়েছে অনেক বেশি, প্রথমদিকে মানুষের ব্যাঙ্গাত্মক কমেন্টে ভরে যেত আমাদের পোস্ট। কিন্তু আমাদের ক্রেতাসংখ্যা এতটাই বেশি ছিল যে আমারা সেসব সমালোচনা নিমেষেই ভুলে যেতাম।”
শুধুই স্মৃতিময় আবেগ, নাকি খাদ্য হিসেবেই কটকটির প্রতি মানুষে এই ভালোবাসা এবং এত বেশি সাড়া – এ প্রশ্নের উত্তরে আসিফ নিজের মতামত তুলে ধরেন, “কালের বিবর্তনে এটি অনেকটা হারিয়ে গিয়েছে। কারণ কটকটি আগে যারা বিক্রি করত, অনেক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি করত। তাই আমাদের বাবা-মা বা মুরুব্বিরা খেতে দিতে চাইতেন না।। আমরা যখন নিজে বাসায় তৈরি করলাম, তখন সকল উপাদান থেকে শুরু করে কটকটি তৈরি করার পরিবেশটাও যথেষ্ট স্বাস্থ্যসম্মত।”
আসিফ আরেকটি ব্যাপারে আলোকপাত করেন সেটি এই যে মানুষ ঘরে তৈরি কটকটিকে অধিকতর স্বাস্থ্যকর মনে করছে। আর এ কারণে অর্ডারের সাথে রি-অর্ডারের সংখ্যাও বেড়ে যায় অনেক।

এই উদ্যোক্তাদের বিশ্বাস, তারা কটকটিকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনার মাধ্যমে এবং একটি ফিউশন সৃষ্টি করার মধ্য দিয়ে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করতে পেরেছেন। ভবিষ্যতে তারা নতুন আউটলেট এবং কারখানা শুরুর কথা ভাবেন। ফিউশনের মাধ্যমে যোগ হবে আরো বহু নতুন পদও। একসময় কটকটি বলতে মানুষ ‘কটকটি ভাই’কেই চিনবে, এটিই তাদের আশা।
অনিন্দিতা চৌধুরী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
anindetamonti3@gmail.com
