দিন-রাত পড়াশোনা, নয়টা-পাঁচটা অফিস কিংবা ব্যবসায় ব্যস্ততায় চলছে জীবন। বিরতিতে হয়তো সিনেমা, গেমস, ফেইসবুক বা রেস্টুরেন্টে আড্ডা। আধুনিকতার ভার নিয়ে ঘুরে চলে দৈনন্দিন ঘড়ির কাঁটা। তবে এতসবে হাঁপিয়ে ওঠা মানুষ হয়তো কাছে পেতে চায় নিজের শেকড়ের। নিজের পরিচয়ের খোঁজে মনে হতে থাকে “এসেছি বাঙালি জোড়বাংলার মন্দির বেদি থেকে, এসেছি বাঙালি বরেন্দ্রভূমে সোনা মসজিদ থেকে”। নিজের পরিচয়ে মিশে যাওয়ার, নিজের ঐতিহ্য খুঁজে পাওয়ার অন্যতম মাধ্যম হেরিটেজ ওয়াকিং।
দেশের অনাবিষ্কৃত ও অবহেলিত ঐতিহ্যপূর্ণ জায়গাগুলোতে দলবেঁধে বা একা ঘুরে বেড়িয়ে, এর ঐতিহ্যপ্রাচুর্যতা অনুসন্ধান করার, জানার মাধ্যম হচ্ছে হেরিটেজ ওয়াকিং। এটি হতে পারে আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য রক্ষার ক্ষেত্রে অন্যতম পদক্ষেপ। একাকী বা দল বেঁধে হেরিটেজ ওয়াকের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলো সম্পর্কে জানা যায় তো বটেই; এ সম্পর্কে মানুষকে আগ্রহী করে সেগুলোকে রূপান্তর করা যেতে পারে একেকটি পর্যটন এলাকায়। বাংলার হাজার বছরের ইতিহাস অবহেলায় অগোচরে ফেলে না রেখে সঠিক পদক্ষেপে নিলে তা থেকে দাঁড়াতে পারে দারুণ পর্যটন শিল্প। আর যার ফলে এলাকা জুড়ে বাড়বে কর্মসংস্থানও।
সরকারি বেসরকারি কিছু পদক্ষেপে এখনও সগর্বে টিকে আছে বেশকিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা। পানাম সিটি, সোনারগাঁও, আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা, ষাটগম্বুজ মসজিদসহ বিখ্যাত সব ঐতিহাসিক স্থাপনার প্রতি বেড়ে চলছে মানুষের আকর্ষণ। তবে এর বাইরেও নানা জায়গায় পড়ে আছে আমাদের অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা। দেশের আনাচে-কানাচে বিভিন্ন স্থানে বলতে গেলে অবহেলায়ই পড়ে আছে ঐতিহাসিক ভবন, মসজিদ, মন্দির, স্থাপনাগুলো। এসব জায়গা খুঁজে বের করে সচেতনভাবে সংরক্ষণ করার অন্যতম উপায় হেরিটেজ ওয়াকিং। এক নজরে দেখে নেয়া যাক বাংলাদেশের কিছু ঐতিহ্যবাহী স্থান, যাতে হেরিটেজ ওয়াক করা গেলে ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য হবে দারুণ উপভোগ্য।
লাউড় রাজ্যের রাজপ্রাসাদ, সুনামগঞ্জ
পৌরাণিক কালের সাক্ষী এক রাজপ্রাসাদ পড়ে আছে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর নামক উপজেলায়। রাজা বিজয় সিংহের রাজ প্রাসাদের প্রধান দরজা সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে এখনও। লাউড় রাজ্যের রাজধানী হলহলিয়া গ্রামে প্রায় ৩০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত রাজা বিজয় সিংহের রাজবাড়িটিতে ছিল বন্দিশালা, সিংহদ্বার, নাচঘর, দরবার হল, পুকুর ও সীমানাপ্রাচীর। কিন্তু বর্তমানে একমাত্র সিংহদ্বারই টিকে আছে। সম্প্রতি এর কিছু অংশ খনন করা হয়েছে। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে এর চারদিক পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। প্রত্নতত্ত্ব পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা স্থাপনাটিতে রয়েছে পর্যটনশিল্প বিকাশের অভাব।
রাজা সীতারাম রায় রাজবাড়ি, মাগুরা
১৬৯৭-৯৮ সালের দিকে জমিদারির পত্তন করা রাজা সীতারাম রায় ছিলেন বেশ প্রতাপশালী জমিদার। বিভিন্ন দীঘি, দুর্গ, মন্দির গড়ে তোলা মাগুরার মুহাম্মদপুর এলাকার এ জমিদারকে মানুষ তাই রাজা, আর বাড়িটিকে রাজবাড়ি বলেই ডাকত।
খুলনার মাগুরা জেলায় পড়ে আছে প্রাচীন বাংলার আরেক নিদর্শন রাজা সীতারাম রায় রাজবাড়ি। যৌবনের জাঁকজমকপূর্ণ বাড়িটি এখন হাড়িয়েছে জৌলুশ। সামনের বিশাল খোলা মাঠের ওপর রয়েছে এক পুরোনো মন্দির। আর রাজবাড়ির প্রধান ফটকে আছে দুই হাতির শুঁড় খচিত নকশা। ভেতরের কক্ষগুলোয় বিভিন্ন নকশা, আর বাইরে 'দুধসাগর' নামের এক বিশাল দিঘি।
ভূঁইয়া মসজিদ, কুমিল্লা
মোগল আমলে বানানো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন মসজিদটি পড়ে আছে অগোচরে। কুমিল্লার আগানগরের এ মসজিদটি তিন গম্বুজ বিশিষ্ট। পাশেই রয়েছে দীঘি, পুরোনো বাঁধানো ঘাট। জানা যায়, এ মসজিদের নির্মাতা ভূঁইয়া জমিদাররা ৪২টি গ্রাম পর্যন্ত খাজনা আদায় করতেন। তবে ব্রিটিশ শাসনের পর তাদের জমিদারি হয়ে যায় বিলুপ্ত।
দুবলহাটি রাজবাড়ি
২২৭ বছরের পুরনো এ রাজবাড়িটি নওগাঁ শহর থেকে ৬ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। রাজা কৃষ্ণনাথের পত্তন করা জমিদারিতে, দুবলহাটিতে ৫ একর এলাকা জুড়ে ছিল বিশাল প্রাসাদ। আর প্রসাদের বাইরে ছিল দীঘি, মন্দির, স্কুল, দাতব্য চিকিৎসালয়, ১৬ চাকার রথসহ বিভিন্ন স্থাপনা। প্রাসাদের ভেতর তিন তলা, চার তলা ভবনের ভেতর সাড়ে তিনশো’রও বেশি ঘর ছিল।
প্রাসাদের সামনে রোমান স্থাপত্যশৈলীর বড় বড় স্তম্ভ বা পিলার ছাড়াও স্বর্ণ- রৌপ্য, আইভরির তৈরি বিভিন্ন সিংহাসন ছিল। এছাড়াও প্রাসাদের চারদিকে রয়েছে শান বাঁধানো কুয়া, গোবিন্দ পুকুর, গানবাজনার জন্য গানবাড়ি নামক ভবন, বাগান বাড়ি এবং কালীমন্দির। প্রত্নতত্ত্ববিভাগ এর দায়িত্ব নিলেও সুরক্ষা ও সংস্কারের অভাবে এখনো অনেকটা আড়ালেই রয়েছে প্রাসাদটি।
ইতিহাস সমৃদ্ধ হলেও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো। হেরিটেজ ওয়াকিংয়ের মাধ্যমে এসব জায়গা পুনঃআবিষ্কার করে তুলে ধরা যেতে পারে নতুন প্রজন্মের কাছে। সেইসাথে স্থাপনাগুলো ঘিড়ে গড়ে উঠতে পারে সমৃদ্ধ পর্যটনশিল্প। হেরিটেজগুলো সংরক্ষণ করে পর্যটনশক্তিতে রূপান্তর করা হলে তা যেমন তৈরি করবে কর্মক্ষেত্র, তেমন দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবে বিশ্ববাসীরও।
সবচেয়ে কম বয়সে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলা ভ্রমণ করা মোঃ রিফাত জাহান শাওন জানান হেরিটেজ ওয়াক নিয়ে তার চিন্তাভাবনা, "নতুন প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্য তুলে ধরতে হলে অবশ্যই সেই জায়গাগুলো পর্যবেক্ষণ ও ইতিহাস সম্পর্কে সকলকে অবগত করতে হবে। হেরিটেজ ওয়াকের মাধ্যমে তারা পুরনো সময়টাকে উপলব্ধি করতে পারবে, ইতিহাসগুলো বুঝতে পারবে। হেরিটেজ ওয়াকিংয়ের উদ্দেশ্যে যখন তারা সে জায়গাটিতে যাবে, তখন সত্যিকার ইতিহাসটা শিখতে জানতেও আগ্রহী হবে।
হেরিটেজ ওয়াকিং নিয়ে ছোট ছোট ভিডিওর মাধ্যমে আগ্রহ বাড়ানো যেতে পারে এ বিষয়ে। এমনকি সরকারি/ বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা/ সংগঠন বা ট্যুর গ্রুপের মাধ্যমে নতুন নতুন করে হেরিটেজ ওয়াক চালু করলে নতুন প্রজন্ম আরও আগ্রহ পাবে বলে আমি আশাবাদী।"
তাঁর মতে, "বাংলাদেশে হেরিটেজ ওয়াক নিয়ে কাজ করার আগে দেখতে হবে যেসব হেরিটেজ আছে, সেগুলো ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে কি না। কেননা, বাংলার হাজার বছরের ইতিহাসে বহু মোঘল ও সুলতানি আমলের মসজিদগুলোর পুরনো স্থাপত্য ভেঙে নতুন ডিজাইন করা হচ্ছে, এতে করে ঐতিহ্য বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সেগুলো ভেঙে না ফেলে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের আওতায় আনা জরুরি। আর দেশ ও দশের স্বার্থে, সেসব একটা সিস্টেমের মধ্যে নিয়ে হেরিটেজভিত্তিক পর্যটনখাত তৈরি করাও প্রয়োজন।"
ফারিয়া ফাতিমা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
fariasneho@gmail.com
