এলি গোল্ডস্টেইন আর ডাউন সিনড্রোম: শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে হার মানানোর গল্প


শবনম জাবীন চৌধুরী | Published: November 27, 2021 15:10:57 | Updated: November 28, 2021 17:22:56


এলি গোল্ডস্টেইন আর ডাউন সিনড্রোম: শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে হার মানানোর গল্প

১৮ বছর বয়সে আমরা সাধারণত কী করে থাকি? হয়তো সদ্য কলেজের গন্ডি পেরিয়ে উচ্চতর পড়াশোনার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করি আর নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করে সে অনুযায়ী স্বপ্ন বুনতে শুরু করি।

যে বয়সে আমরা কেবল ভবিষ্যৎ স্বপ্নের বীজ বপন করতে শুরু করি সেই বয়সেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে প্রচলিত সৌন্দর্য সংজ্ঞাকে নতুন রূপে আখ্যায়িত করে বিশ্ব সমাদৃত হয়েছে ১৮ বছর বয়সী এক কিশোরী, নাম তার এলি গোল্ডস্টেইন।

২০২০ সালে আনকনভেনশনাল বিউটি শিরোনামে গুচির (ইতালির একটি ফ্যাশন ব্র্যান্ড) পক্ষ থেকে একটি বিউটি ক্যামপেইনের আয়োজন করা হয়। যেখানে চোখের মাশকারার মডেল হিসেবে লাইম লাইটে আসে ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত এই কিশোরী।

এলি গোল্ডস্টেইনের কথা জানবার আগে তার শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, ডাউন সিনড্রোম সম্পর্কে একটু ধারণা নেয়া যাক। এটি একটি জেনেটিক অবস্থা এবং এই অবস্থায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের দেহের ২১ নং ক্রোমোসোমে আরো একটি বাড়তি ক্রোমোসোম থাকে।

আর এই ত্রুটির কারণে তারা জন্মগতভাবেই কিছু শারীরিক ও মানসিক জটিলতা বা অসামঞ্জ্যস্যতা নিয়ে জীবনধারণ করতে থাকে যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক বিকলাঙ্গতা, অসামঞ্জস্যপূর্ণ মুখাবয়ব, এদের পেশিসমূহ দুর্বল হয় তাই শরীর নরম ও তুলতুলে হয়ে থাকে, বাচনভঙ্গি অনেকসময় অস্পষ্ট হয়ে থাকে এবং সঠিক শারীরিক বিকাশও ব্যাহত হয়।

লন্ডন শহরের নিকটবর্তী শহর ইলফোর্ডে একটি খ্রিস্টান পরিবারে এলি গোল্ডস্টেইনের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাস্তর পেরিয়ে বর্তমানে একটি স্থানীয় কলেজে পারফর্মিং আর্টস বিষয়ে পড়াশোনা করছেন তিনি।

যে বয়সে শিশুরা প্রাক-প্রাথমিক পড়াশোনা ও খেলাধুলায় মত্ত থাকে সেই বয়সে আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে পাঁচ বছর বয়স থেকে সে মডেল হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে এবং নিজের প্রতি এক অটুট বিশ্বাস স্থাপন করে যে সে একদিন বড় হবেই।

এলির আজকের এই সফলতার পেছনে রয়েছে অনেক প্রচেষ্টা, ধৈর্য আর সবকিছুকে উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছা। পাঁচ বছর বয়স থেকেই সে নাচের তালিম নিতে শুরু করে এবং স্কুলের স্টেজ পারফরম্যান্সে (নাটক) অংশ নিতে শুরু করে।

এরপর এলি নাটকে অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নিতে আরম্ভ করলো, তাকে নিয়মিত দেখা গেল রয়্যাল অপেরা হাউজ ও রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে মঞ্চস্থ বিভিন্ন নাটকে। তার এই পথচলাটা কিন্তু সহজ ছিল না। কারণ সমাজে শারীরিকভাবে অসম্পূর্ণতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করা মানুষগুলোর নিজের প্রতিভা প্রকাশের জন্য খানিকটা সুযোগ বা স্থান করে নেওয়াটা মোটেও সহজ কাজ নয়।

এলি গোল্ডস্টেইনের পনেরতম জন্মদিনের কিছুদিন পূর্বে তার মা যেবেদি ম্যানেজমেন্ট নামক একটি প্রতিভা অনুসন্ধানকারী একটি সংস্থা সম্পর্কে জানতে পারেন যারা দৃশ্যত শারীরিক অসামঞ্জস্যতাপূর্ণ মানুষগুলোকে তাদের প্রতিভা প্রকাশ ও প্রদর্শনের সুযোগ দিয়ে থাকে, বিশেষ করে যারা মডেল হতে চায় বা অভিনয় জগতে নিজের ক্যারিয়ার গড়তে চায়।

এলির নৈপুণ্য, শৈলী ও ইতিবাচক মনোভাবে সংস্থাটির সকলেই মুগ্ধ হয়ে উঠে। টানা তিন বছর এলি তাদের সাথে কাজ করে। একটি ছোট্ট মেয়ে থেকে একজন সফল তরুণী হয়ে উঠে।

আঠারো বছর বয়সে এলি গুচি ব্র্যান্ডের সাথে কাজ করার সুযোগ পায় যা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। গুচির ইন্সটাগ্রাম অ্যাকাউন্টে নিজের ফটোশ্যুটের ছবি দেখে এলির প্রতিক্রিয়াটা ছিল অনেকটা এরকম,

গুচির ইন্সটাগ্রাম অ্যাকাউন্টে যখন আমি নিজের ছবিগুলো দেখি তখন আমি ভাবছিলাম, বাহ! কে এই মেয়ে? আমি নাকি অন্য কেউ? আমার বন্ধু-বান্ধব ও পরিবার সকলে ছবিগুলো দেখেছিল। এ যেন ছিল আমার কাছে এক অন্য রকমের অনুভূতি। আমি খুবই আনন্দিত যে অবশেষে কেউ আমাদের মতো মানুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্যকে ছাপিয়ে তাদের প্রতিভা দেখানোর সুযোগ করে দিয়েছে।

এছাড়াও নিক, ভোডাফোন, এলি প্রিমার্ক, কার্ট গেইজার, স্পোর্টস ডিরেক্টের মতো বেশ কিছু ব্র্যান্ডের সাথে কাজ করছেন এলি।

সুযোগ পেলে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেড়ে ওঠা মানুষগুলোও যে অনেক কিছু অর্জন করতে পারে, ডাউন সিনড্রোম জয়ী এলি গোল্ডস্টেইন তার একটি বাস্তব উদাহরণ। সমাজের প্রচলিত বাঁধাধরা ছাঁচিকরণ আর সরলীকরণের বিপরীতে সফল হওয়া এলি একজন যোদ্ধা, একজন অনুপ্রেরণাও বটে।

শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।

zabin860@gmail.com

Share if you like