বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের কাছে ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) চির আরাধ্য এক স্বপ্নের নাম।
১৮৬১ সাল থেকে বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিতে অসামান্য অবদান রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ব র্যাংকিং-এ শীর্ষে অবস্থান করছে প্রতিষ্ঠানটি। এমআইটিতে বহিরাগত শিক্ষার্থীদের যেখানে ভর্তি হতে পারাটাই থাকে অনিশ্চয়তায়, সেখানে বৃত্তি পাওয়া তো প্রায় অসম্ভবের খাতায়।
তবে এ বছর যোগ্যতার জোরে এমআইটিতে ডক্টর অব ফিলোসফি (পিএইডি) গবেষণার জন্য ফুল-ফান্ডেড স্কলারশিপ পেয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) - এর তিনজন শিক্ষার্থী।
তারা হলেন কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শাশ্বত সৌম্য, কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের নিশাত তাবাসসুম এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মাহমুদুল ইসলাম রিদুল।
মেধা, মনন এবং পরিশ্রমে অর্জিত এ সুযোগের জন্য তারা বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের শুভেচ্ছাবার্তায় ভাসছেন।
সৌম্য এবং রিদুলের কাছে প্রশংসনীয় এই সফলতার গল্প শুনতে গিয়ে যা জানা যায় তা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। অবাক হলেও দুজনের উত্তরই ছিল- "আকাঙ্ক্ষার তালিকায় এমআইটি তাদের কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল না।"
রিদুল বলেন, "আমি কখনই এমআইটিতে যাওয়ার 'স্বপ্ন দেখিনি। আমি সেরা অধ্যাপক এবং বিশ্বমানের গবেষণা সুবিধাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে বেশি আগ্রহী ছিলাম।"
"আমি ৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেছি, যার প্রায় সবগুলোই ছিল বিশ্বসেরা। এমআইটিও সেগুলোর মধ্যে একটি। সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের ধরন ছিল সমপর্যায়ের। তাই আমি একসাথে সেগুলোয় আবেদন করা শুরু করি," জানান সৌম্য।
তবে এ প্রেক্ষিতে যারা বিদেশে পড়াশোনা করতে চাইছে তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, "কারোর প্রচেষ্টা ও সম্পদ কেবল একটি ক্ষেত্রেই পুঞ্জিভূত করা উচিত নয়, কারণ এতে সব সুযোগ একসাথে হারানোর সম্ভাবনা থাকে।"
প্রস্তুতির জন্য, জিআরই, আইইএলটিএস-এর মতো পরীক্ষাগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে তারা মনে করেন। তবে এর অন্যান্য দিকও রয়েছে।
"মূলত যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের জন্য পাঁচটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ - গ্রেড, গবেষণা পোর্টফোলিও, একটি উদ্দেশ্য বিবৃতি (এসওপি), কমপক্ষে ৩টি সুপারিশপত্র এবং জিআরই, টোফেল পরীক্ষার স্কোর।"
সৌম্য বলেন, "বুয়েটে ৩য় বর্ষ থেকে আমি বেশ কিছু গবেষণা প্রকল্পে কাজ শুরু করি। আমার স্নাতক কোর্স শেষ করার আগে ২০২০ সালে আমি জিআরই এবং টোফেল পরীক্ষা দিয়েছিলাম।"
তবে রিদুল জানান তিনি স্নাতক পাশের পর প্রথমে জিআরই এবং টোফেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরে ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছেন।
রিদুল বলেন, "বুয়েটে ২য় বর্ষে পড়াকালীন গবেষণা করতে শুরু করায় ইতোমধ্যে বেশ কিছু গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। বেশ খানিকটা সময় বাকি থাকায় আমি ভালোভাবে আমার উদ্দেশ্য বিবৃতি প্রস্তুত করতে পেরেছি, সাবেক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়েছি এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও এর অনুষদগুলো সম্পর্কে গবেষণা করেছি।"
রিদুল আরও জানান, "আমি এমআইটির অনুষদের কয়েকজন সদস্যকে ইমেইলে যোগাযোগও করেছি। আমি মনে করি, আগে থেকে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত থাকায় এবং সে অনুযায়ী কাজ করায় বেশ উপকৃত হয়েছি।"
একাডেমিক ফলাফলের বিষয়ে দুজনের কাছেই প্রায় একই উত্তর পাওয়া যায়।
"সিজিপিএ মূলত অসংখ্য আবেদনকারীদের মধ্য থেকে সেরাদের বাছাই করার জন্য ভূমিকা পালন করে। তবে এক্ষেত্রে একজনের সম্পূর্ণ প্রোফাইল বিবেচনা করা হয়, সিজিপিএ শুধু উল্লিখিত পাঁচটি দিকের মধ্যে একটি," বলেন সৌম্য।
রিদুলও একইভাবে বলেন, "সিজিপিএ গুরুত্বপূর্ণ। যাইহোক, আমি মনে করি না এটি একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। আমার মতে, স্কলারশিপ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান পার্থক্যকারী ফ্যাক্টর হল গবেষণা।"
সৌম্য স্কলারশিপের ধরন নিয়েও কথা বলেন। "সাধারণত মার্কিন স্কুলগুলিতে পিএইচডি স্তরে ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় মাসিক উপবৃত্তি হাতে হাতে আসে। এটি তিনটি আকারে আসতে পারে - টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ (TA), রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ (RA) এবং ফেলোশিপ।"
সৌম্যের ভাষ্যমতে, "ফেলোশিপ ছাড়াও অ্যাসিস্ট্যান্টশিপের সাথে কাজের দায়িত্বও বর্তায়। এমআইটি-এর ইইসিএস বিভাগের ক্ষেত্রে, একজন পিএইচডি শিক্ষার্থীকে প্রথম বছরের জন্য একটি বিভাগীয় ফেলোশিপের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়।"
তিনি আরও বলেন, "তারপর তারা তাদের পছন্দ এবং সুপারভাইজারের মতামতের ভিত্তিতে TA-শিপ বা RA-শিপ বেছে নিতে পারেন। শতভাগ স্বাস্থ্য বীমা কভারেজের সাথে ৫৫,৫১০ মার্কিন ডলার সমমূল্যের বার্ষিক টিউশন ফি সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়।"
রিদুল মনে করেন এমআইটি বা আইভি লীগের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়া কোনো সুউচ্চ পাহাড়ে চড়ার চেয়ে কম নয়। আর তার জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও কৌশল। স্কলারশিপ প্রত্যাশীদের জন্য রিদুল কিছু দিক-নির্দেশনাও দিয়েছেন।
এ পর্যায়ে তিনি বলেন, "আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পর্যায়ের ১ম ও ২য় বর্ষ থেকেই স্কলারশিপ প্রত্যাশীদের সিজিপিএ বা একাডেমিক ফলাফলের প্রতি মনোনিবেশ করা উচিত। ৩য় বর্ষে তারা গবেষণা প্রকল্প বা অধ্যাপকদের সাথে সহযোগিতার সন্ধান করতে পারে। আর স্নাতকের আগে জিআরই এবং টোফেল/আইইএলটিএস দিলে পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সঠিকভাবে গবেষণা করার জন্য যথেষ্ট সময় পাওয়া যাবে।"
সৌম্য বলেন, "স্বপ্নের জায়গায় যেতে হলে দৃঢ় সংকল্প এবং কঠোর পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়। গবেষণামূলক কাজ করতে হলে একজন শিক্ষার্থীর অবশ্যই আত্মবিশ্বাস এবং কঠোর পরিশ্রম করার মানসিকতা থাকতে হবে।"
তিনি শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার পাশাপাশি ইসিএ-র কিছু ফর্মের প্রতি অবগত থাকার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয়ের ২য় বর্ষ প্রাসঙ্গিক বিষয়সমূহ এবং বর্তমানের গবেষণামূলক কাজে মনোনিবেশ করার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। তারা তখন থেকেই তাদের পছন্দের গবেষণা ক্ষেত্র খুঁজতে পারে।"
এমআইটির মতো শিক্ষাঙ্গনে স্কলারশিপ নিয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাওয়া কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। বুয়েটের এই তিন শিক্ষার্থীও তা-ই প্রমাণ করলেন।
asrifasultanareya@gmail.com