মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল (এফটিএ) চুক্তি স্বাক্ষরে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞদের সমর্থন যোগাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নতুন পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এ জাতীয় চুক্তি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরসমূহের ভয় কাটাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নানা অংশীজনের পরামর্শ গ্রহণ করবে।
এলডিসি থেকে উত্তরণকালে এ জাতীয় চুক্তি জরুরি বলে গণ্য করা হচ্ছে।
অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আশঙ্কা, এ চুক্তির ফলে তারা মোটা অঙ্কের রাজস্ব হারাবে। সস্তা পণ্য আমদানির পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ার ব্যাপারেও ব্যবসায়ীরা শঙ্কিত।
২০১৮ সালের পর বাংলাদেশ এফটিএ গ্রহণের ব্যাপারে নিজস্ব মত বদলায়।
সে বছরের শেষের দিকে অর্থ মন্ত্রণালয় এফটিএ চুক্তির জন্য সম্ভাব্য কিছু দেশের তালিকা তৈরি করে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের প্রতি উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ আসে।
অর্থ মন্ত্রণালয় যে দেশগুলোকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিল, তাদের মধ্যে রয়েছে চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, পাকিস্তান, জাপান, আর্জেন্টিনা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা ও সৌদি আরব ।
সে সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো একটি চিঠিতে অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, এফটিএ চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাংলাদেশের বাণিজ্য ব্যবধান হ্রাস করা সম্ভব হবে, কারণ এ চুক্তি পণ্য রপ্তানির পরিমাণ বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে।
পরবর্তী সময়ে মন্ত্রণালয় বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের সাথে এফটিএ চুক্তির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে সমীক্ষা চালায়, যা এখনও অনেক দেশের ক্ষেত্রে চলছে।
এমনকি বাংলাদেশ ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কার সাথে এফটিএ অথবা পিটিএ (অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি) স্বাক্ষরের জন্য মতবিনিময়ও করেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শহিদুল ইসলাম দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে বলেন, সমীক্ষায় দেখা গেছে, কোনো দেশ বা অঞ্চলের সাথে এফটিএ চুক্তি স্বাক্ষর করতে হলে বাংলাদেশকে আমদানি শুল্ক অনেক কমাতে হবে।
তিনি বলেন, আশিয়ান জোটের সাথে এফটিএ চুক্তি করতে হলে গড় আমদানি শুল্ক ১৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশে আনতে হবে।
আমরা যদি আমদানি শুল্ক কমাতে না পারি, তাহলে আসিয়ানের সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে এই চুক্তি করা সম্ভব হবে না।
তিনি আরও বলেন, রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ হ্রাসের আশঙ্কায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এ শুল্ক কমাতে রাজি নয়।
আমাদের দীর্ঘমেয়াদী সুফলের কথা ভাবতে হবে। চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে রপ্তানি বাড়ার পাশাপাশি বিনিয়োগের পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে।"
আরেকজন বাণিজ্য কর্মকর্তা বলেন, এটা সত্য যে এফটিএ চুক্তির ফলে রাজস্ব আদায়ে একটি সাময়িক ধাক্কা আসবে। তবে নতুন বিনিয়োগের ফলে অদূর ভবিষ্যতে নতুন নতুন রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রও তৈরি হবে।
তিনি আরও বলেন, নতুন বিনিয়োগের ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি নতুন পণ্যের উপর মূল্য সংযোজন কর আসবে, এছাড়াও নতুন প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির ফলে আয়করের পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে।
দীর্ঘ মেয়াদে অধিক রাজস্বের আশা করা যায়।
তিনি জানান, বাংলাদেশ ট্রেড এন্ড ট্যারিফ কমিশনকে এ বিষয়ে আলোচনার জন্য শীঘ্রই একটি কন্সেপ্ট পেপার বা ধারণাপত্র তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
উক্ত আলোচনায় সংশ্লিষ্ট বিভাগ, মন্ত্রণালয় ও সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), অর্থনীতিবিদ, শীর্ষ চেম্বার, গবেষণাকর্মে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান ও সংবাদকর্মীরা উপস্থিত থাকবেন।
আমরা সংশ্লিষ্ট সবাইকে এই চুক্তি স্বাক্ষরের পক্ষে আনতে চাই।
এর আগে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ডিস্টিংগুইশড ফেলো ডক্টর দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে এফটিএ চুক্তির সম্ভাবনা যাচাই একটি ভালো পদক্ষেপ।
তবে কিছু জিনিস সমীক্ষায় লক্ষ্য রাখতে হবে, যেন বাংলাদেশ এই চুক্তি থেকে লাভবান হয়।
তাঁর মতে, শুল্ক হ্রাসের ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থায় এবং রপ্তানিযোগ্য পণ্যগুলো এফটিএর তালিকায় রাখার ব্যাপারে বাংলাদেশকে নিশ্চিত হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, এফটিএ থেকে হ্রাসকৃত রাজস্বের পরিমাণ নির্ধারণ এবং অশুল্ক বাধাসমূহ নিরসন করতে হবে।"