বর্তমানে প্রযুক্তি জগতের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর শব্দ হচ্ছে নন ফাঞ্জিবল টোকেন সংক্ষেপে এনএফটি। ২০১৪ সাল থেকে ব্লকচেইনের দুনিয়ায় রাজত্ব করে আসছে এটি। ফোর্বসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডিজিটাল সম্পদ কেনা-বেচার মাধ্যম হিসেবে পরিচিত এনএফটিতে এ পর্যন্ত ১৭৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আদান-প্রদান হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এনএফটি কী? পাঁচশত টাকায় কোনো পণ্য কেনার সময় দোকানদারকে এক হাজার টাকার নোট দিলে, দোকানদার ২০০ টাকার দুটি নোট এবং দুটি পঞ্চাশ টাকার নোট ফেরত দিতে পারে। এক্ষেত্রে একশত টাকার পাঁচটি নোট দিলেও কোনো পার্থক্য হতো না। এ বিষয়টিকে বলা হয় ফাঞ্জিবিলিটি।
আর নন ফাঞ্জিবিলিটি বলতে এর বিপরীত দিকটি নির্দেশ করে। এক্ষেত্রে ল্যুভ জাদুঘরে সংরক্ষিত মোনালিসার আসল ছবির সাথে নকলকৃত ছবিগুলোর মূল্যের হেরফের হওয়াটা একটি উদাহরণ। সহজ ভাষায়, ব্লকচেইনের মাধ্যমে টুইট, ইমেজ, ভিডিও, ক্লিপআর্টের মতো যেসব শিল্প ডিজিটাল মাধ্যমে মালিকানা হস্তান্তর করা সম্ভব তাকে নন ফাঞ্জিবল টোকেন হিসেবে অভিহিত করা হয়।
সাম্প্রতিকালে, এনবিএ ভিডিও হাইলাইটস, মিমস, ডিজিটাল শিল্প এমনকি সামান্য টুইটও মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হওয়ায় এনএফটির জনপ্রিয়তা তুঙ্গে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্লকচেইনে ডিজিটাল শিল্পে মালিকানা বরাদ্দ করার প্রক্রিয়া বা এনএফটি শুধু ডিজিটাল সম্পদে নয়, ভবিষ্যতে বাড়ি এবং জমির মালিকানার ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যাবে। সিএনবিসির পরিসংখ্যান মোতাবেক, বর্তমানে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিক্রি হয়েছে এনএফটি।
ব্লকচেইন প্রযুক্তি এবং এনএফটি মূলত শিল্পীদের শিল্পগুলো নগদীকরণের সুযোগ প্রদান করে। যার ফলে শিল্পীদের অর্থ উপার্জনের জন্য প্রদর্শনী কিংবা নিলামের উপর নির্ভরতা হ্রাস পেয়েছে। শিল্পীরা তাদের সুবিধামতো সরাসরি ক্রেতাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারে। এমনকি শিল্পী চাইলে ডিজিটাল সম্পদ ক্রেতার নিকট হস্তান্তরের পূর্বে রয়্যালটি সংযুক্ত করতে পারে। ফলে প্রতিবার নতুন মালিকের নিকট সম্পদ বিনিময় হলে অর্থের কিছু অংশের ভাগ পাবেন প্রথম বিক্রেতা।
তবে এনএফটি শিল্পীদের ক্ষেত্রে শুধু অর্থ উপার্জনের মাধ্যম নয়। চারমিন এবং ট্যাকো বেলের মতো ব্র্যান্ড দাতব্য তহবিল সংগ্রহের জন্য থিমযুক্ত এনএফটির সাহায্য নিয়েছে৷ আর এতে বিস্ময়কর ফলাফলও পাওয়া গেছে।
২০১১ সালে আবিষ্কৃত পপ টার্ট দেহসম্বলিত একটি বিড়ালের জিআইএফ এ বছর ফেব্রুয়ারী মাসে এনএফটিতে বিক্রি হয়েছে ৬ লক্ষ মার্কিন ডলারে। মার্চের শেষ দিকে এনবিএ টপ শট খ্যাত এনএফটি উপার্জন করেছে ৫শ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। অন্যদিকে লাব্রন জেমসের এনএফটি সংগ্রহ করেছে ২ লক্ষ মার্কিন ডলার। ইদানীং স্নুপ ডগ এবং লিন্ডসে লোহানের মতো তারকারাও ঝুঁকছেন এনএফটির দুনিয়ায়।
কিছুদিন আগে বিখ্যাত ডিজিটাল শিল্পী মাইক উইঙ্কলম্যান তথা বিপলের ৫ হাজার ছবির পোর্টফোলিও বিক্রি হয়েছে ৬৯ মিলিয়ন ডলার মূল্যে। যার প্রতিটি ছবির গড়মূল্য ছিল ৬৯ হাজার ৮শ মার্কিন ডলারের মতো। এর মূল্য প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। ডিজিটাল শিল্পের আবির্ভাবে ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ৬৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি মূল্য দিয়ে হলেও বিপল এনএফটি কিনতে প্রস্তুত ছিলেন ভিগনেশ সান্ডেয়ারসান নামক এক ব্যক্তি।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিষয়ক টেলিভিশন চ্যানেল সিএনবিসির স্কোয়াক বক্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মেটাকোভান নামে খ্যাত ভিগনেশ সান্ডেয়ারসান জানান যে, অনেকের মতে একটি জেপিইজি ফরম্যাটের ছবি এবং একটি হাইপারলিঙ্ক খুব সাধারণ হিসেবে বিবেচিত হলেও এর জন্য তিনি ৬৯ মার্কিন ডলার ব্যয় করলেও কোনো অনুশোচনা নেই।
সান্ডেয়ারসান ২০১৩ সাল থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং ক্রিপ্টোকোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগ করছেন। শুরুতে তিনি কোনো অর্থ ছাড়াই বিনিয়োগ করতেন এবং ক্রিপ্টোকোম্পানিগুলোতে কাজ করার সুবাদে ক্রিপ্টো অর্থনীতিকে ঘিরে যেসব ক্রমবর্ধনশীল প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করতে সক্ষম ছিলেন।
তিনি কেবল বিটকয়েন এবং ইথেরিয়ামে বিনিয়োগ করেননি, ব্লকচেইন নেটওয়ার্ক পলকা ডট এবং ফ্লোতেও বিনিয়োগ করেছেন। তার মতে নিয়ন্ত্রক বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক হতে ক্রিপ্টো নিষেধাজ্ঞা আসার কোনো আশঙ্কা নেই। এ সম্পর্কে সান্ডেয়ারসান সাক্ষাৎকারে বলেন, ক্রিপ্টোকে দমিয়ে রাখতে চাইলে নিয়ন্ত্রকরা বিগত বছরগুলোতে আরও কঠোর হতো। যেহেতু হননি, এর মানে তারাও ক্রিপ্টোকে নিয়ে ইতিবাচক প্রভাব দেখতে পাচ্ছেন।
তিনি মনে করেন, নন ফাঞ্জিবল টোকেন বা এনএফটির উত্থানের ফলে এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। যেখানে প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে শিল্পী এবং সংগ্রাহকদের আরও সহজে ও গণতান্ত্রিকভাবে শিল্প ক্রয়-বিক্রয়ের অনুমতি দিয়েছে।
এনএফটিকে শিল্প ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করে সান্ডেয়ারসান বলেন, এগুলো চিনতে এবং উপলব্ধি করতে মানুষের একটু সময়ের প্রয়োজন। আমি ঠিকই আছি। আমি শিল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ স্থানান্তরে অংশ নেয়ার সুযোগ পেয়েছি ঠিক যেভাবে শিল্প শতাব্দীর পর শতাব্দী গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে।
এনএফটি নামে পরিচিত ডিজিটাল শিল্পকে নগদীকরণের এই ডিজিটাল মাধ্যম বিশ্বজুড়ে হাজারো মানুষ সাদরে গ্রহণ করছে। সান্ডেয়ারসানের মতে, একে ঘিরে একটি অর্থনৈতিক ক্ষেত্র গড়ে উঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যুগ যুগ ধরে শিল্পে সম্পদের পরিচায়ক হিসেবে শেতাঙ্গ সংগ্রাহক এবং শিল্পীদের একচেটিয়া প্রভাব ছিল। এনএফটির আবির্ভাবের পরে ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড বা ভারতের শিল্পীরাও এখন ইন্টারনেটে প্রথমেই ৫০০ থেকে ১ হাজার মার্কিন ডলার উপার্জন করতে সক্ষম হবে।
তবে এনএফটির মালিকানা পাওয়ার জন্য সান্ডেয়ারসান ঠিক কী পরিমাণ মূল্য দিতে প্রস্তুত ছিলেন তা না বললেও তিনি জানান, ক্রিস্টির নিলামের মতো এটিও বেশ প্রতিযোগিমূলক হবে এটা জানতাম। কিন্তু প্রাথমিক মূল্য যতটা হবে ভেবেছিলাম তা ৬৯.৩ মিলিয়ন ডলারের চেয়ে বেশি।
৬৯ মিলিয়ন ডলারে কেনা বিপলের মূল্য আগামী ১০ বছরে কত হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার এটি বিক্রি করার কোনো ইচ্ছা নেই। তবে ভবিষ্যতে এটি ভার্চুয়াল জাদুঘরে প্রদর্শন কিংবা এর খন্ডাংশ নগদীকরণের পরিকল্পনা ব্যক্ত করেন।
অবশ্য বর্তমানে এনএফটি কেনার ঝুঁকি না নিতে পরামর্শ দিয়েছেন ওয়াশিংটন টেকনোলজি ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন ক্যাসকাডিয়া ব্লকচেইন কাউন্সিলের প্রধান এবং ইয়েলো আমব্রেলা ভেঞ্চারসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অ্যারি ইউ। ফোর্বসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এনএফটির ভবিষ্যত অনিশ্চিত। আমাদের কাছে বিস্তারিত কোনো ইতিহাসের তথ্যও নেই যা দিয়ে এর কার্যকারিকতা সম্পর্কে যাচাই করা সম্ভব হবে। তবে যেহেতু এটি একটি নতুন প্রযুক্তি, চাইলে স্বল্প পরিসরে বিনিয়োগ করা যেতে পারে। তবে সেটি সম্পূর্ণ যার যার ব্যক্তিগত বিষয়। মনে রাখা উচিত, এনএফটির বিক্রয়মূল্য কেমন হবে সেটি শুধুমাত্র ক্রেতার সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে।
এনএফটি ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য ইতোমধ্যে পরিচিতি লাভ করেছে ফাউন্ডেশন, ওপেনসিয়া এবং র্যারিবল নামক ওয়েবসাইটগুলো।
আসরিফাসুলতানা রিয়া বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়ন করছেন।
asrifasultanareya@gmail.com