Loading...

একুশের দিনে বইমেলায় জনস্রোত

| Updated: February 22, 2022 12:19:49


একুশের দিনে বইমেলায় জনস্রোত

ভাষার অধিকার আদায়ে রক্ত ঝরানোর দিন একুশে ফেব্রুয়ারি প্রতিটি বাঙালির আবেগের একটি দিন, সেই দিনে একুশের বইমেলার জমে ওঠাটা স্বাভাবিক, এবার মহামারী দৃশ্যপট বদলে দিলেও দৃশ্য বদলাতে পারেনি। আর চেনা সেই ভিড়ে অচেনা হয়ে উঠেছিল স্বাস্থ্যবিধি।

একুশে ফেব্রুয়ারি সোমবার বইমেলার ফটক খোলে সকাল ৮টায়, চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। ছুটির এই দিনে বরাবর শহীদ মিনার থেকেই বইমেলায় ছোটে জনস্রোত। এবারও তা ছিল। তবে অন্য বারের মতো সকালে তেমন দেখা না গেলেও বিকালে নামতেই বদলে যায় চিত্র।

বিকাল ৩টার পর থেকে সাড়ে ৭ লাখ বর্গফুটের বিশাল মেলাপ্রান্তরে বয়ে যায় প্রাণের প্রবাহ; জনসমাগমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়তে থাকে বইয়ের বিকিকিনি। প্যাভিলিয়নগুলোতে প্রিয় লেখকের উপস্থিতিতে তৈরি হয়েছিল ক্রেতাদের জটলা। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কমে আসার মধ্যে বইমেলা শুরু হলেও সব পর্যায় থেকে মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে আহ্বান জানানো হচ্ছিল বারবার, কিন্তু এদিন বেশিরভাগের মুখে দেখা যায়নি মাস্ক। প্রবেশ পথগুলোতেও ধাক্কাধাক্কির চোটে তাপমাত্রা মাপা কিংবা হাতে স্যানিটাইজার মাখার সুযোগটুকুও ছিল না।

মেলায় আগতদের বেশিরভাগই ছিল তরুণ-তরুণী। মা-বাবার হাত ধরে শিশুরাও এদিন বেশ ভিড় জমায়। কেউ সাদা-কালো পোশাকে, কেউবা ফাগুনের সাজে বেরিয়েছিলেন ঘর থেকে। সব মিলিয়ে মেলার দুই প্রাঙ্গণ- বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছিল ছিল উপচেপড়া ভিড়।

সকালে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে বিকেলে বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে মেলায় এসেছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাসিবুর রহমান।

তিনি  বলেন, “সকালে ফুল দিয়ে আর বাসায় যাওয়া হয়নি। সারাদিন ঘোরাফেরা করেছি। বিকেলে বইমেলায় আসলাম, এত মানুষ হবে কল্পনাও করিনি।”

মুগদা থেকে ছেলে-মেয়েকে নিয়ে দুপুরে মেলায় আসেন নাহিদা আলম। তিনি বলছিলেন, “ভেবেছিলাম দুপুরে লোকজন কম থাকবে। একটু পর থেকেই দেখি মানুষের ঢল। বাচ্চাদের নিয়ে মেলা থেকে বের হওয়াই দুঃসাধ্য।“

মেলায় বিপুল জনসমাগমে খুশি প্রকাশক-বিক্রেতারা। তাদের ভাষ্য, বিলম্বে ১৫ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মেলায় এ দিনই বই বিক্রি হয়েছে সবচেয়ে বেশি।

অন্বেষা প্রকাশনের মালিক শাহাদাত হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মহামারী পরিস্থিতির কারণে এবারের বইমেলা নিয়ে আমরা একটু ভয়েই ছিলাম। কিন্তু এখন আমরা খুবই খুশি। অপ্রত্যাশিত পাঠক সমাগম হয়েছে আজ। একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে যে পরিমাণ আমরা প্রত্যাশা করেছি, তার চেয়ে বেশি লোক সমাগম হয়েছে, বেচাকেনাও ভালো হয়েছে ।”

আদর্শ প্রকাশনীর অপারেশন কো-অর্ডিনেটর মো. শারাফাত বলেন, “গত বছরের সঙ্গে তুলনা করলে এবার বেচাকেনা অনেক ভালো। তবে বিশ (২০২০) সালের কাছাকাছি এখন পর্যন্ত যায়নি, কেবল তো এক সপ্তাহ গেল। আমরা প্রত্যাশা করছি, ধীরে ধীরে বিক্রি বাড়বে।”

প্যাভিলিয়নগুলোতে লোকসমাগম থাকলেও সাধারণ স্টলগুলোতে তেমন ছিল না। বেচাকেনাও ছিল কম।

সংহতি প্রকাশনীর নির্বাহী কর্মকর্তা আল আমিন রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ক্রেতা সমাগম অনেক। কিন্তু বিক্রি তেমন নাই। অনেকে মেলায় ঘুরতে আসছে।”

অমর একুশে বইমেলার সপ্তম দিনে মেলায় নতুন বই এসেছে ২২৪টি।

মূল মঞ্চের আয়োজন

শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বিকাল ৪টায় ‘অমর একুশে বক্তৃতা-২০২২’ আয়োজন করে বাংলা একাডেমি। ফিরে দেখা : আমাদের ভাষা আন্দোলন শীর্ষক বক্তৃতা করেন কবি আসাদ চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা।

তিনি বলেন, “আমাদের একুশ এখন সারা বিশ্বের। একুশের সত্তর বছর আমাদের জাতিসত্তার উৎসমূলে নতুন করে দৃষ্টিপাত এবং ভাষা-সংস্কৃতি ও জাতিতাত্ত্বিক নিবিড় আত্মঅন্বেষায় উদ্বুদ্ধ করে।”

কবি আসাদ চৌধুরী বলেন, “অমর একুশের সত্তর বছর পূর্ণ হল আজ। তবে বাঙালির ভাষা আন্দোলন কেবল সত্তর বছরের বিষয় নয়; হাজার বছর ধরে বাঙালি আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকারের জন্য লড়াই করে এসেছে। এ লড়াই কেবল সাংস্কৃতিক লড়াই ছিল না, এ লড়াই ছিল অর্থনৈতিক-সামাজিক এবং অবশ্যই রাজনৈতিক।”

কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বলেন, “অমর একুশের সত্তর বছর পূর্তি বাঙালি জাতির জন্য পরম গৌরবের বিষয়। ভাষা-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।”

‘লেখক বলছি’অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন ইমদাদুল হক মিলন ও আনিসুল হক।

অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি মাকিদ হায়দার, বিমল গুহ ও আবদুস সামাদ ফারুক। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী দেওয়ান সাইদুল হাসান, জয়ন্ত রায়, শাহাদৎ হোসেন নিপু।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করেন ‘ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী’। নৃত্য পরিবেশন করেন নৃত্যশিল্পী সৌন্দর্য প্রিয়দর্শিনী ঝুম্পা ও ফরহাদ আহমেদ শামীম। সংগীত পরিবেশন করেন মহাদেব চন্দ্র ঘোষ, কল্যাণী ঘোষ, স্বর্ণময়ী মণ্ডল, তাজুল ইমাম ও আরিফ রহমান।

মুক্তমঞ্চের অনুষ্ঠান

সকাল ৮টায় মুক্তমঞ্চে শুরু হয় কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ। স্বরচিত কবিতাপাঠে অংশ নেন অর্ধশতাধিক কবি। সভাপতিত্ব করেন কবি অসীম সাহা।

বিকাল ৩টায় এই মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় কবিকণ্ঠে একুশে কবিতাপাঠ। স্বরচিত কবিতা পাঠে অংশ নেন ২৫ জন কবি। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সচিব কবি হাসানাত লোকমান।

অমর একুশের সত্তর বছর পূর্তি স্মরণে এই মঞ্চে বিকেল ৪টায় প্রদর্শিত হয় জহির রায়হান পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’।

মঙ্গলবারের আয়োজন

মঙ্গলবার অমর একুশে বইমেলা চলবে দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত।

বিকাল ৪টায় মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ : লেখক বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন মোহাম্মদ সেলিম। আলোচনায় অংশ নেবেন ঝর্না রহমান ও তানভীর আহমেদ সিডনী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন।

সন্ধ্যায় থাকছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। 

Share if you like

Filter By Topic