Loading...

একটিমাত্র টিকাতেই কুপোকাত হবে কোভিড-১৯’এর সব ধরন

| Updated: December 23, 2021 20:47:27


একটিমাত্র টিকাতেই কুপোকাত হবে কোভিড-১৯’এর সব ধরন

টাঙ্গাইলের একটি দালানে লেখা ছিল আর চিন্তা নাই, ঘ্যাগের ওষুধ বাহির হইয়াছে।’ সেখানে ঘ্যাগ আক্রান্ত একজন পুরুষ এবং নারীর প্রতিকৃতি ছিল। ১৯৭১ সালে পাকবাহিনী সেই দু’টি প্রতিকৃতিকে ভেঙ্গে ফেললেও লেখাটা ছিল অনেককাল। এই ভবনটি পরবর্তীতে ঘ্যাগের দালান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। সে দালান এখন আর নেই।  নামটাও মুছে গেছে। ওই এলাকাকে টাঙ্গাইলবাসীরা এখন নিরালার মোড় হিসেবেই চিনেন। এককালে ঘ্যাগকে যেমন অনিরাময়যোগ্য রোগ বলে মনে করা হতো, বর্তমানে প্রায় তেমনই একটা অবস্থা তৈরি করেছে শুঁয়া (করোনা) ভাইরাস কোভিড-১৯’এর বিশ্বমারি।  

বারবার ধরন বদলে টিকার তৈরি দেহপ্রতিরক্ষার বেড়াজাল ফাঁকি দিতে চাইছে ধুরন্ধর এই ভাইরাস। ভাইরাস ঠেকানোর সব প্রতিরোধকে গুড়িয়ে দেওয়ার পণ করেই মনে হয় আর্বিভূত হয়েছে এই করোনা। কিন্তু  তারপরও টাঙ্গাইলের সেই দালানের মালিক যদি প্রায় অদম্য এই শুঁয়া (করোনা) ভাইরাস নিয়ে কিছু লিখতে চাইতেন, তবে এবার বিনা দ্বিধায় লিখে দিতে পারতেন, ‘আর চিন্তা নাই, সব শুঁয়া ভাইরাসকে এক টিকায় ঠেকানোর পথ পাওয়া গেছে।’ হ্যাঁ, সত্যিই বিজ্ঞানীরা বলছেন এক টিকায় করোনার ওমিক্রনসহ সব ধরন তো বটেই, এমনকি ‘সারস’জাত সব ভাইরাসকে পুরোপুরি রুখে দেওয়া সম্ভব হবে।     

সর্বধরননাশী এমন এক টিকা তৈরি করেছে আমেরিকার খ্যাতনামা গবেষণা সংস্থা ওয়াল্টার রিড আর্মি ইন্সটিটিউট অব রিসার্চ। আগামী কয়েক সপ্তাহর মধ্যে এ সংক্রান্ত ঘোষণা দেওয়া হতে পারে। সে কথাই জানিয়েছে ওয়েবসাইট ডিফেন্স ওয়ান ডটকমের পেন্টাগনের সিনিয়র রিপোর্টার টারা কপ।      

গত দু’বছর ধরে ভাইরাস নিয়ে টানা গবেষণার ফসল নতুন এই টিকা। ২০২০ সালে গোঁড়ার দিকে এই সেনা গবেষণাগারটি কোভিড-১৯ এর ডিএনএ পর্যায়ক্রম পায়। ওয়াল্টার রিডের সংক্রামক রোগ শাখা দ্রুত টিকা তৈরি করাকে সামনে রেখে সব গবেষণা সংক্রান্ত কাজ করার  সিদ্ধান্ত নেয়। তবে প্রচলিত টিকার বদলে তারা এ কাজে একটু এগিয়ে থাকার সিদ্ধান্তও নেয়। তারা শুধু বিরাজমান ধরন বা স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে নয় বরং এর সম্ভাব্য সকল প্রকার ধরন ঠেকাতে কাজ করবে এমন শক্তিশালী টিকা তৈরির কাজে নেমে পড়ে   

একই অঙ্গে এতো রূপ!

ওয়াল্টার রিডের স্পাইক ফেরিটিন ন্যানো পার্টিকেল কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন বা এসপিএফএন’এর প্রাণীদেহে পরীক্ষা চলতি বছরের শুরুতেই ইতিবাচক ফলাফলের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। ওয়াল্টার রিডের সংক্রামক রোগ শাখার পরিচালক ড. কেয়ভান মোজাররাদ ডিফেন্স ওয়ানকে একান্ত সাক্ষাৎকার দেন। তিনি জানান, মানবদেহে পরীক্ষার প্রথম ধাপে ওমিক্রন এবং অন্যান্য ধরনের বিরুদ্ধে এই টিকার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়েছে। চলতি মাসে এ পরীক্ষা শেষ হয়েছে  উল্লেখ করে তিনি বলেন, “পরীক্ষার ফলাফল হয়েছে ইতিবাচক।” 

তিনি আরো জানান, এসপিএফএন টিকার সাথে প্রচলিত টিকার তফাৎ আছে। এসপিএফএন টিকায় অনেকটা ফুটবলের মতো দেখতে একটি আমিষ বা প্রোটিন ব্যবহার হয়েছে। এ আমিষের রয়েছে ২৪টি মুখ। চলতি কথায় যাকে একই অঙ্গে এতো রূপ বলা হয় এ যেন তারই ফলিত  চেহারা! “গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, তাই দিয়ে যায় চেনা”র মতই ভাইরাস চেনা যায় শুঁয়া দিয়ে। এতোগুলো মুখ থাকায় খুব সুবিধা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা আমিষটির এক এক মুখে ভাইরাসের এক এক শুঁয়া বা স্পাইক জুড়ে দিতে পারবেন। এভাবে নতুন ধরন আসলেও প্রায় চট করেই তার টিকা পাওয়া যাবে। বেশি সময় ধরে নিধিরাম পালোয়ান সেজে অসহায় অপেক্ষা করতে হবে না।

ড. কেয়ভান মোজাররাদ

বাকি শুধু ২ এবং ৩ পর্বের পরীক্ষা

ড. মোজাররাদ বলেন, “আমি মনে করি, গবেষণাকে এ পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারাটা আমাদের গোটা দল এবং  সেনাবাহিনীর  জন্য খুবই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।”

তিনি আরো জানান, “মানুষের শরীরে টিকার কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে যে সময় লাগবে বলে ধারণা করা হয়েছিল তার চেয়েও বেশি সময় লেগেছে।” এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি জানান, টিকা দেওয়া  হয়নি বা আগে কোভিডে আক্রান্ত হয়নি এমন মানুষদের শরীরেই নতুন টিকার পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।  

কিন্তু আমেরিকায় একদিকে যেমন টিকা দেওয়ার হার বেড়েছে অন্যদিকে ডেল্টা এবং ওমিক্রন ধরনের বিস্তার বেড়ে যাওয়ার ফলে এমন গবেষণা কাজের জন্য মানুষ যোগাড় করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

পাশাপাশি ওমিক্রন নিয়ে কঠোর কথাই বলেন তিনি। তিনি বলেন,  “ওমিক্রন ধরনের ভাইরাসের হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার কোনো পথ খোলা নেই। আপনি বা আমি, কেউ ভাইরাসের এ ধরনের হাত থেকে রক্ষা পাবো না বা একে এড়াতেও পারব না। তাই আমি মনে করি খুব শীঘ্রই হয় গোটা বিশ্বকে টিকা দিতে হবে, না হয় ওমিক্রন ভাইরাসের কবলে পড়তে হবে।”  

যাদেরকে আগে এক দফা টিকা দেওয়া হয়েছে বা যারা ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের দেহে সর্ব-শুঁয়া (করোনা) ভাইরাস এর এই নতুন টিকা কীভাবে কাজ করে তা খতিয়ে দেখতে হবে পরীক্ষার পরের ধাপে। বৃহত্তর ক্ষেত্রে উৎপাদনের জন্য একজন শিল্প উদ্যোক্তার সঙ্গে কাজ করছে গবেষণা সংস্থা ওয়াল্টার রিড। তবে সে শিল্প উদ্যোক্তার নাম এখনো  প্রকাশ করা হয়নি।

ড. মোজাররাদ আরো বলেন, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ওপর নতুন টিকা  কীভাবে কাজ করে এবং বাস্তবে টিকার অবস্থা কী দাঁড়ায় তা মূল্যায়ন করতে হবে। নতুন টিকাকে এখনো ২য় এবং ৩য় পর্বের পরীক্ষার পর্যায় অতিক্রম করতে হবে। এই দুই পর্বে নতুন টিকার সঙ্গে প্রচলিত টিকার তুলনা করা হবে। নতুন টিকা মানবশরীরের জন্য কতোটা নিরাপদ কিংবা এটি প্রয়োগে অনাকাঙ্ক্ষিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয় কিনা ইত্যাদি খুঁটিয়ে দেখা হবে।

নতুন টিকা আবিষ্কারে ভূমিকা রয়েছে সবার

তিনি বলেন, “দুই বছরের নতুন টিকা তৈরিতে ওয়াল্টার রিডের প্রায়  আড়াই হাজার কর্মী বাহিনীর সবার ভূমিকা রয়েছে। তিনি বলেন, সারস ভাইরাসের উদ্ভব কীভাবে ঘটেছে সে দিকে দৃষ্টি সীমাবদ্ধ না রেখে বরং দীর্ঘমেয়াদে এ ভাইরাসের ক্ষেত্রে কী রূপান্তর বা পরিবর্তন ঘটতে পারে সেদিকে নজর রেখেছে ওয়াল্টার রিড। ভাইরাসের পরিব্যক্তি (মিউটেশন) ঘটে, নতুন নতুন ধরনের ভাইরাস দেখা দেয়। পুরানো ভাইরাসের বদলে নতুন প্রজাতি আসতে পারে। তাই আমরা প্রতিরোধের এমন একটা মঞ্চ তৈরি করতে চেয়েছি যা কিনা ভবিষ্যতের ভাইরাস মোকাবেলার জন্য থাকবে সদা প্রস্তুত।”

[ডিফেন্স ওয়ান অবলম্বনে]

syed.musareza@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic