এক দিনের ভ্রমণস্থান - সময় স্বল্প কিন্তু বিস্তর ভ্রমণ গল্প


ফারিয়া ফাতিমা স্নেহ | Published: January 08, 2022 14:09:55 | Updated: January 09, 2022 11:31:01


- বালিয়াটি জমিদার বাড়ি

ঘুরে বেড়াতে কে না ভালোবাসে? কিন্তু ঢাকার জীবন-যাপনের বাস্তবতা, এ শহর ছেড়ে দিন কয়েকের অবসর দেয় খুবই কম।

বড়জোর বছর শেষের বার্ষিক সফর দিয়েই ভ্রমণপিপাসা মেটাতে হয় অধিকাংশের। কিন্তু অন্যান্য সময়গুলো? 'ডে ট্রিপ' বা একদিনের ভ্রমণগুলো হতে পারে এ প্রশ্নের জুতসই উত্তর।

সোনারগাঁও লোকশিল্প ও কারুশিল্প জাদুঘর:

নারায়ণগঞ্জের পানাম নগরে অবস্থিত এ জাদুঘরটি যেন বাংলাদেশের এক ছোট্ট প্রতিলিপি। অনন্য সংগ্রহে সমৃদ্ধ জাদুঘরটিতে এমনসব লোক ও কারুশিল্প রয়েছে যার অনেকগুলোই আমাদের দেশ থেকে হারিয়ে গেছে, দেশের অন্য কোথাও আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।

এখানে শীতকালে বসে লোকশিল্প মেলা। জাদুঘরটি শনিবার এবং রবিবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। প্রবেশমূল্য মাত্র ২০ টাকা।

একসময় এই সোনারগাঁও শুধু দেশের প্রশাসনিক রাজধানীই ছিল না, বরং শিল্পে সংস্কৃতিতে বিজ্ঞানে ছিল সবার চেয়ে এগিয়ে। এখনো সোনারগাঁওয়ের পানাম নগর প্রাচীন শিল্প সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্বমহিমায়। লোকশিল্প জাদুঘর থেকে মাত্র ১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ ঐতিহাসিক স্থাপনাটি দেখতে দেখতে সময় কীভাবে শেষ হবে তা টেরও পাওয়া যায় না।

২০০৬ সালে ওয়ার্ল্ড মনুমেন্ট ফান্ড এর করা তালিকায় সম্রাট ঈসা খানের এই হারানো রাজধানীকে বিশ্বের অন্যতম ঐতিহাসিক শহর হিসেবে ঘোষণা করেছে।

বালিয়াটি জমিদার বাড়ি

ঢাকা শহরের নিকটবর্তী সবচেয়ে দর্শনীয় প্রাসাদের মধ্যে অন্যতম এ জমিদার বাড়িটি। ঢাকা শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে সাটুরিয়া উপজেলায় অবস্থিত জমিদার বাড়িটিতে রয়েছে সাতটি ভবন। বালিয়াটিতে এসব ভবন একসাথে নির্মিত হয়নি। এই প্রাসাদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ভবন বিভিন্ন সময়ে জমিদার পরিবারের বিভিন্ন উত্তরাধিকারী দ্বারা নির্মিত হয়েছিল।

বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্লকটি জাদুঘর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে যা একসময় রংমহল নামে পরিচিত ছিল।

সাটুরিয়া উপজেলায় যাওয়ার জন্য গাবতলী থেকে সরাসরি বাস পাওয়া যায়। খরচ পড়বে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ টাকা। আর সাটুরিয়া বাস স্ট্যান্ড থেকে জমিদার বাড়ি যাওয়ার জন্য রিকশা ও সিএনজি পাওয়া যায়। জমিদার বাড়িটি রবিবার এবং সরকারি ছুটি ছাড়া প্রতিদিন খোলা থাকে; প্রবেশমূল্য মাত্র ১০ টাকা।

মৈনট ঘাট

ঢাকার দোহারে অবস্থিত মৈনট ঘাটের বিশাল জলরাশি, পদ্মায় মাছ ধরার নৌকার দৃশ্যসহ তীরে বাধা বড় বড় নৌকা- দর্শনার্থীদের মুহূর্তের জন্য যেন ভাবায় ঢাকার দোহার নয়, ভ্রমণ করছি কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে।

এ কারণে অনেকেই মৈনট ঘাটকে বলে থাকে 'মিনি কক্সবাজার। বর্ষাকালই মৈনট ঘাটে যাওয়ার উপযুক্ত সময়। তাজা ইলিশ মাছের আসল স্বাদ নেওয়ার জন্য এটি উপযুক্ত জায়গা, যেখানে রাস্তার দুপাশে বিস্তীর্ণ নিচু জমিতে বাদাম গাছের চাষ হয়, আবার বর্ষা আসলে পদ্মার জলে ডুবে যায়।

তবে সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য হয়তো পদ্মা নদীর শান্ত রূপ। ট্রলারে বা নৌকায় বসে পদ্মায় দেখা অপরূপ সূর্যাস্ত মনে দাগ কেটে থাকবে বহু বহুদিন।

গুলিস্তান গোলাপ শাহ মাজার থেকে সবচেয়ে সহজে যাওয়া যায় মৈনট ঘাটে। যমুনা পরিবহন মাত্র ৯০ টাকা খরচে ১.৫-২.৫ ঘণ্টায় সরাসরি পাড়ে নিয়ে গিয়ে থাকে। একই বাসে আবার ফিরে আসা যায়। ঢাকার উদ্দেশ্যে শেষ বাস সন্ধ্যা ৬টার। এছাড়া রেন্ট-এ-কারের ব্যবস্থা তো রয়েছেই।

নুহাশ পল্লী

গাজীপুরে প্রায় ৪০ বিঘা আয়তনের এ রিসোর্ট গড়ে তুলেছেন যে কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ- তা বোধহয় এ দেশে তার পাঠক সমাজের কারো অজানা নয়।

মূলত পরিবারের সাথে সময় কাটানোর জন্য ব্যক্তিগত এ রিসোর্ট তৈরি করেছিলেন তিনি। আর একই সাথে এটি ছিল তার শুটিং স্পট।

এখন সবুজ গাছে ছেয়ে গেছে নুহাশ পল্লীর পুরো এলাকা যা দেখে স্বভাবতই প্রকৃতিপ্রেমীদের মন আনন্দে ভরে যায়। এলাকাটি হুমায়ূন আহমেদের পারিবারিক কটেজ, সুইমিং পুল, লিচু বাগান ও একটি বড় দিঘী (লীলাবতী) সহ বিভিন্ন অংশে বিভক্ত। এর মধ্যে নির্মিত 'গাছবাড়ি' এ রিসোর্টের অন্যতম আকর্ষণীয় জায়গা।

গুলিস্থান থেকে সরাসরি গাজীপুরের হোতাপাড়া বাজারে প্রভাতী বা বনশ্রী বাসে যাওয়া যায়। অথবা ঢাকা শহরের যেকোনো স্থান থেকে প্রথমে গাজীপুরে এসে তারপর হোতাপাড়া বাজারে চলে আসা যায়। সেখান থেকে অটো/ টেম্পুতে চেপে নুহাশ পল্লী।

এপ্রিল থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত খোলা থাকা এ রিসোর্টের প্রবেশমূল্য ২০০ টাকা। তবে ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য প্রবেশমূল্য ফ্রি।

গোলাপ গ্রাম

সাভার থানায় অবস্থিত সাদুল্লাপুর গ্রামটি এখন গোলাপ গ্রাম নামে পরিচিত। এখানে সারা বছরই গোলাপের ঘ্রাণে ভরে থাকে গোটা গ্রাম। বিশাল গোলাপ বাগানের সাথে রয়েছে রজনীগন্ধা, জারবেরা, গ্লাডিওলাসেরও বাগান।

মূলত এই গোলাপ গ্রামই ঢাকা শহরের ফুলের চাহিদা পূরণ করে চলেছে। যেকোনো ছুটিতে বা সপ্তাহান্তে ঘুরে আসতে পারেন এ গোলাপ গ্রামে।

প্রথমে মিরপুর-১ এর মাজার রোডে এসে বাস/ অটোরিকশা/ রিকশা নিয়ে শিনারটার্ক ঘাট বা বেড়িবাঁধে পৌঁছাতে হয়। এই ঘাট থেকে ইঞ্জিন বোটে চড়ে পৌঁছে যাওয়া যায় সাদুল্লাপুর বা গোলাপ গ্রাম। তবে শুষ্ক মৌসুমে নদীতীর থেকে একটু হেঁটেই গ্রামে যেতে হয়।

অন্যদিকে উত্তরা থেকে যেতে চাইলে হাউজ বিল্ডিং (উত্তর টাওয়ার) থেকে প্রথমে দিয়া বাড়িতে যেতে হয়। সেখান থেকে বিরুলিয়া ব্রিজে গিয়ে সাদুল্লাপুর বা গোলাপ গ্রামে যেতে হয় রিকশা/ লেগুনা/ অটোতে চড়ে।

এছাড়াও চমৎকার একটি ছুটির দিন কাটাতে ভ্রমণপিয়াসীদের জন্য রয়েছে মহেরা জমিদার বাড়ির ঐতিহাসিক স্থাপনা, জিন্দা পার্কের প্রাকৃতিক ছোঁয়া, আড়াই হাজারের মেঘনার চর, নিকলী হাওরের মতো প্রকৃতির আশীর্বাদ, শালবন বৌদ্ধ বিহার, উয়ারী-বটেশ্বর ধ্বংসাবশেষের মতো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রাচুর্যে ভরপুর সব স্থান।

ফারিয়া ফাতিমা স্নেহ বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়নরত।

fariasneho@gmail.com

Share if you like