জলবায়ু পরিবর্তনের ধকলে আমাদের পরিচিত দুনিয়া ধীরে ধীরে উষ্ণ হয়ে উঠতে শুরু করেছে। এ সত্য আজ আমাদের সবারই জানা। আগামী সেই উষ্ণ দুনিয়ায় খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে রুটিফল। ব্রিটিশ বিজ্ঞান সাপ্তাহিক নিউ সায়েন্টিস্টের ১৬ অক্টোবর সংখ্যায় এ খবর দেন মাইকেল লি পেইজ। জলবায়ুর যেসব আদল (মডেল) তৈরি করা হয়েছে তার ভিত্তিতে মনে করা হচ্ছে, রুটিফলের গাছ উষ্ণমণ্ডলে আগামী বহু দশক ধরে ভালোভাবেই বেঁচে থাকবে। গজাবে। ফল দেবে।
বিশেষ করে, রুটিফল আবাদের চমৎকার সুযোগ রয়েছে গ্রীষ্মপ্রধান আফ্রিকায়। রুটিফল চাষের মতো বিস্তৃত জমিও আছে সেখানে। চলতি শতকের শেষ পর্যন্ত অন্তত সে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হবে না।
রুটিফল গাছের সুবিধার কথা বলতে যেয়ে ইলিনয়ের নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের লুসি চ্যাং বলেন, রুটিফল গাছে ব্যাপক ফল ধরে এবং এ গুলো উচ্চ পুষ্টিমানের। এছাড়াও একবার গাছ বড়ো হয়ে গেলে আর তেমন কোনো ঝামেলা থাকে না।
গ্রীষ্মমণ্ডলের কোন কোন অঞ্চলে বর্তমানে রুটিফল চাষ হয়। কিন্তু আবাদি গাছের জন্য কী ধরণের জলবায়ু দরকার তা খুঁজে বের করার কাজে নেমেছেন ইয়াং এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্যানিয়েল হর্টন। তাদের সাথে একযোগে কাজ করছেন শিকাগো বোটানিক গার্ডেনের নাইরি জেরেগা। এরপরের ধাপে জলবায়ু-আদল (মডেল) তৈরি করেন তারা। দেখেন, ২০৬০ থেকে ২০৮০ পর্যন্ত রুটিফল আবাদ করা যাবে।
তারা দেখতে পান, চাষযোগ্য জমির পরিমাণ বিশ্বজুড়ে চার শতাংশ কমছে। তারপরও রুটিফল ফলানোর ক্ষেত্রে তার কোনো প্রভাব পড়ছে না। হর্টন বলেন, রুটিফলের চাষ যে সব এলাকায় করা হচ্ছে তা অব্যাহত থাকবে। তবে ফলন হয়ত কমবে।
এটাকেই গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে। উষ্ণতা বাড়ার সাথে সাথে আবহাওয়া আরো উগ্র হয়ে উঠবে। তার অনিবার্য ধকলে পড়বে ধানের মতো অনেক প্রধান শস্য। ২০১০ সালের মতো ঘটনায় হয়ত আবারও ভড়কে যাবে দুনিয়া। তাপপ্রবাহে শস্যহানির ফলে সে বছর গম রফতানি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিল রাশিয়া।
এ গবেষক দল দেখতে পান, উষ্ণপ্রধান আফ্রিকায় রুটিফলের জন্য বড়ো ধরণের সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে এ মহাদেশে নামমাত্র রুটিফলের চাষ হয়। হর্টন বলেন, রুটিফল চাষ বাড়ানোর দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইতিবাচক এবং স্থিতিশীল প্রভাব ফেলতে পারবে এটি।
রুটিফল এলো কোথা থেকে
এ কথা হয়তো অনেকেরই জানা, যে রুটিফল আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠাল পরিবারের (Moraceae) সদস্য। ফলটির গঠন প্রকৃতির সঙ্গে কাঁঠালের মিল আছে। দেখে বুঝতে কারো অসুবিধা হয় না বাংলাদেশের জাতীয় ফল আর রুটিফল একই পরিবারের সন্তান। রুটিফলের বৈজ্ঞানিক নাম আরটোকারপাস আলটিলিস (Artocarpus Altilis)। লাতিন শব্দ আরটস অর্থ রুটি আর কারপাস অর্থ ফল। কিন্তু কাঁঠাল পরিবারের সন্তান হওয়ার পরও এ ফলের চাষ বাংলাদেশে প্রায় নেই।
তাহিতি, হাওয়াই ও ক্যারাবীয় দ্বীপপুঞ্জ অঞ্চলে রুটিফল প্রধান খাদ্য হিসেবে বহুকাল ধরে ব্যবহার হচ্ছে। যদিও রুটিফলের উৎপত্তির সঙ্গে নিউগিনি, ফিলিপাইন এবং মালুকু দ্বীপপুঞ্জের নাম জড়িয়ে আছে। ১৮ শতকের দিকে ব্রিটিশ এবং ফরাসি নাবিকরা রুটিফলের বিচিহীন কিছু প্রজাতি ছড়িয়ে দেয় পলিনেশীয় অঞ্চলে। বর্তমানে দক্ষিণ এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, প্রশান্তমহাসাগরীয় অঞ্চল, ক্যারিবীয় অঞ্চল, মধ্য আমেরিকা এবং আফ্রিকায় অন্তত ৯০ দেশে রুটিফলের চাষ হয়।
১৭৬৯ সালে এনডেভর অভিযানের সময়, তাহিতিতে অবস্থানকালে, স্যার জোসেপ ব্যাংকসসহ অন্যান্যরা উচ্চ ফলনশীল ফসল হিসেবে রুটিফলের খাদ্যমূল্য বুঝতে পারেন। এ অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন জেমস কুক। ব্রিটিশ উপনিবেশগুলিতে দাসদের জন্য সস্তা কিন্তু উচ্চ-শক্তিতে ভরপুর খাদ্যের তালাশ করতে যেয়ে নজর পড়ে রুটিফলের দিকে। ক্যারিবীয় অঞ্চলে রুটিফলের চাষাবাদের বিস্তার ঘটানোর প্রয়োজন অনুভব করতে থাকে উপনিবেশবাদী ব্রিটেন। এদিকে অভিযানে সফল হওয়ার পুরস্কার স্বরূপ রয়েল সোসাইটির সভাপতি ব্যাংকস নগদ অর্থ এবং স্বর্ণ পদক দেন।
ব্রিটিশ সরকার এবং নৌবাহিনীতে তার বন্ধুদের কাছে রুটিফলের জন্য একটি নৌ অভিযান চালানোর সফল তদবির করেন। ১৭৮৭তে উইলিয়াম ব্লাইকে এইচএমএস বাউন্টি নামের জাহাজের নেতৃত্ব দিয়ে দক্ষিণ প্রশান্তমহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে রুটিফলের গাছ আনতে পাঠানো হয়। তবে বিদ্রোহের কারণে এ যাত্রায় সেই প্রচেষ্টা ভেস্তে যায় এবং রুটিফল কখনোই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। দ্বিতীয়বার তিনি প্রভিডেন্স এবং অ্যাসিসটেন্ট নামের দুই জাহাজ নিয়ে অভিযানে যান। এবারে বিচিহীন রুটিফলের গাছ তাহিতি থেকে যোগাড় করেন। এগুলোকে আটলান্টিকের সেন্ট হেলেন দ্বীপ এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেন্ট ভিনসেন্ট এবং জ্যামাইকাতে রোপণও করেন। ব্লাইয়ের কপালে রয়েল সোসাইটির স্বর্ণপদক জুটেছিল। যদিও তার তৎপরতা পুরোপুরি সফল হয়নি। দাসরা খাদ্য হিসেবে রুটিফলকে মুখে তুলতে অস্বীকার করাই এর কারণ।
রুটিফল জন্ম দিল ধ্রুপদী চলচ্চিত্র
রুটিফল সংগ্রহের জন্য ব্লাইয়ের প্রথম অভিযান ভেস্তে যাওয়ার কথা সবাই জানেন। বিদ্রোহের কারণে এ অভিযান বানচাল হয়ে যায়। তবে এ কাহিনি সম্বল করে ১৯৬২তে নির্মিত হয় অমর চলচ্চিত্র মিউটিনি অন দ্য বাউন্টি। শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ সাত বিভাগে ৩৫তম অস্কারের জন্য মনোনয়ন পেলেও শেষ অবধি বরাতে কোনো পুরস্কারের শিকা ছেঁড়েনি।
তবে ১৯৩৫ সালে একই নামে মার্কিন নাট্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন ফ্রাংক লয়েড। চার্লস নরডফ ও জেমস নরম্যান হলের মিউটিনি অন দ্য বাউন্টি নামের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন চার্লস লটন ও ক্লার্ক গ্যাবল। অন্যান্য চরিত্রে ছিলেন ফ্রাঞ্চট টোন, মোভিতা কাস্তানেদা, ও ম্যামো ক্লার্ক।
চলচ্চিত্রটি সে সময়ে জনপ্রিয়তাও পায়। এর ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে নানা প্রশ্ন বিরাজ করছে। তা সত্ত্বেও চলচ্চিত্র সমালোচকেরা একে মিউটিনি অন দ্য বাউন্টি উপন্যাসের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকরণ বলে স্বীকার করেন এবং শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসাবে ৮ম অস্কার পুরস্কার লাভ করে।
রুটিফলের খাদ্য ও ভেষজগুণ
লুসি ইয়াং বলেন, স্বাদের দিক থেকে আলুর সঙ্গে মিল আছে তবে এটি গাছে গজায়। রুটিফলের ৭১ শতাংশই পানি। ২৭ শতাংশ শর্করা এবং ১ শতাংশ আমিষ। এতে নামমাত্র চর্বি পাওয়া যায়। কাঁচা রুটিফলে ৩৫ শতাংশ ভিটামিন সি মিলে। এ ছাড়া, ১০ শতাংশ থিয়ামিন এবং পটাসিয়ামও আছে।
কাঁচা ও পাকা উভয় রুটিফলই খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে কাঁচা ফলকে খাওয়ার আগে রেঁধে নিতে হয়। রান্নার অংশ হিসেবে একে সেদ্ধ, ঝলসানো বা ভাজি করা হয়। এক মৌসুমে প্রতি রুটিফল গাছে ২০০ কেজি ফল হতে পারে। শ্রীলংকায় রুটিফল নারকেলের দুধ দিয়ে রান্না করার চল আছে। এছাড়া, দেশে দেশে নানা ধরনের রান্না করা হয়।
রুটিফল গাছের কিছু ভেষজগুণ আছে বলে শোনা যায়। রুটিফলের পাতার ক্বাথ উচ্চ রক্তচাপ ও শ্বাসকষ্ট কমায়। জিহ্বার প্রদাহে পাতা বেঁটে প্রলেপ দিলে উপকার পাওয়া যায়। রুটিফল গাছের কষ চর্মরোগ কমাতে সাহায্য করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল চত্বরে, ফার্মগেটের খামারবাড়ি, ময়মনসিংহের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কুমিল্লার বার্ডে রুটিফলের কয়েকটি গাছ আছে। ভারত এবং শ্রীলংকায় রুটিফলের বাণিজ্যিক চাষ হয়। বাংলাদেশও এ গাছ বেড়ে ওঠার উপযোগী বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।
[দ্য নিউ সায়েন্টিস্ট অবলম্বনে]