Loading...

উপবাসে সত্যিই উপকার হয় কি?

| Updated: August 31, 2021 19:50:33


ছবিঃ ইন্টারনেট ছবিঃ ইন্টারনেট

হুমায়ূন আহমেদের ‘নলিনী বাবু বিএসসি’ বইটি পড়া আছে? খেয়াল করলে দেখবেন উপন্যাসটির মূল চরিত্র, যাকে ঘিরে গোটা গল্পটি আবর্তিত হয়েছে, সেই নলিনী ভট্টাচার্য মূলত একাহারী। অর্থাৎ, তিনি সকাল এগারোটার দিকে একবেলা খান, বাকি দিন আর তেমন কিছু খান না। তাঁর ভাষ্যমতে, এই বাকি দিনটা উপবাসের অভ্যাস শরীরকে ঠিক রাখতে সাহায্য করে।

শুধু নলিনীবাবুই নন, হুমায়ূন আহমেদের বেশ কিছু বইয়েই এমন কিছু স্বেচ্ছায় উপবাসী মানুষদের কথা পাওয়া যায়। ইদানীংকালেও আমরা সামাজিক মাধ্যমগুলোতে সময়ে সময়ে উপবাস নিয়ে এমন কিছু বক্তব্য খুঁজে পাই। কথা হচ্ছে, উপবাস কি সত্যি সত্যিই শারীরবৃত্তীয় কাজগুলিকে শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখতে সহায়তা করে? আদৌ কি উপবাস শরীরের জন্য উপকারী?

উপবাসের এই বিষয়টির পোশাকি নাম হচ্ছে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বা সবিরাম উপবাস। অর্থাৎ, একটি নির্দিষ্ট সময় বিরাম বা বিরতি দিয়ে দিয়ে উপবাস পালন করা। এই ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং-এর বেশ কয়েকটি রকমফের আছে। যেমন ১৬:৮ উপবাস, যেখানে আপনি দিনের ১৬ ঘণ্টা টানা না খেয়ে থাকবেন এবং বাকি ৮ ঘণ্টা যা ইচ্ছে হয়, তা-ই খেতে পারেন।

এছাড়াও আছে ৫:২ অনুপাতের উপবাস, যেখানে আপনি সপ্তাহের প্রথম দু’দিন উপবাস করবেন। এই দু’টো দিন আপনি বেশি হলে দিনপ্রতি ৫০০ ক্যালরির সমপরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করতে পারবেন, এর বেশি নয়। সপ্তাহের বাকি পাঁচটি দিন অবশ্য আপনি যত ইচ্ছা, তত খেতে পারবেন। তাছাড়াও আরও একরকম ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং আছে, যেখানে আপনি সপ্তাহে ৩৬ ঘণ্টা কিছুই না খেয়ে থাকবেন।

সবিরাম উপবাসের এমন বিভিন্ন রকমফের থাকার সুবিধা হচ্ছে, আপনি আপনার সাধ্যমত যেকোনো ধরনের একটি উপবাস বেছে নিতে পারেন। কিন্তু এই উপবাস আপনাকে কী ধরনের সুবিধা বা অসুবিধার মুখোমুখি করছে, সেটি জানাটাও জরুরি।

ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং-এর প্রথম যে উপকারিতা, সেটি হচ্ছে শরীরের চর্বি কমা। যেহেতু উপবাসের সময় আপনি কোনো ধরনের ক্যালরি গ্রহণ করছেন না, কাজেই আপনার শরীর প্রথমে সঞ্চিত শর্করা ভেঙে শক্তি উৎপাদন করতে শুরু করবে। সেই শর্করাও যখন ফুরিয়ে যাবে, তখন আরও শক্তি সরবরাহের জন্য শুরু হবে শরীরে সঞ্চিত ফ্যাট বা চর্বির ভাঙন। ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং করার প্রধান লক্ষ্যই এটা থাকে, যাতে করে শরীরে ক্যালরির ঘাটতি হয় এবং শরীরস্থিত চর্বির ভাঙন শুরু হয়। মূলত এই চর্বি কমানোই হচ্ছে ওজন হ্রাসের মূল চাবিকাঠি।

সারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সহযোগী রোনা অ্যান্টনির মতে, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং হৃদরোগের কিছু গুরুত্বপূর্ণ রিস্ক ফ্যাক্টরের ওপর খুবই উপকারী প্রভাব ফেলে। তাছাড়াও, ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের প্রতিবেদন অনুসারে উপবাসের ফলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় থাকে, কোলেস্টেরল এবং রক্তচাপ কম থাকে। এই সব কিছুই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষভাবে সহায়ক।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক গবেষণায় এটাও দেখা যায় যে, যারা ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং অবলম্বন করেছেন, একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তাদের রক্তচাপের পরিমাণ ৯ শতাংশ কমে গেছে। অন্যদিকে, যারা স্বাভাবিকভাবে রোজকার খাদ্য গ্রহণ করছেন, তাদের রক্তচাপ বেড়েছে ২ শতাংশ করে।

ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং-এর ফলে ঘুমের সময় কিছুটা বেড়ে যায়। এতে করে রক্তের শর্করা এবং জারণের পরিমাণ অনেকটাই কমে যায়, যা হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিসের মত দুরারোগ্য রোগের ক্ষেত্রে বিশেষ উপকারী প্রভাব ফেলে।

আমাদের পছন্দের গোয়েন্দা শার্লক হোমস চিন্তা করার সময় না খেয়ে থাকতে পছন্দ করতেন। কারণ, তাঁর ধারণা ছিল, না খেয়ে থাকলে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা অনেকটুকু বেড়ে যায়। ধারণাটি কিন্তু একেবারেই ভুল নয়। উপবাসের ফলে মস্তিষ্কে নিউরোজেনেসিসের হার বেড়ে যায়, অর্থাৎ, মস্তিষ্কের নতুন কোষ এবং স্নায়ুকলার গঠন ও বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিদ্যার অধ্যাপক মার্ক ম্যাটসনের মতে, উপবাস মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা, মেজাজ, একাগ্রতা, স্মৃতিশক্তি- সবকিছুই ভালো রাখতে সহায়তা করে।

আছে কিছু মন্দও

এতসব উপকারিতা থাকা সত্ত্বেও ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং-এর কিছু অপকারিতাও কিন্তু রয়েছে। প্রথমেই বলা যায়, একটা বিশাল সময় না খেয়ে থাকাটা কিন্তু সত্যিই খুব কঠিন কাজ! যেহেতু আপনি দীর্ঘসময়ের জন্য কোনো ধরনের ক্যালরি গ্রহণ করছেন না, একটা সময় জিনিসটা যথেষ্ট অসহ্য বলে মনে হতে পারে। এর কারণ হিসেবে অপেক্ষাকৃত কম শারীরিক শক্তি, তীব্র খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বা ক্রেভিং, খাদ্যাভ্যাস, কঠোর অনুশাসন ইত্যাদি অনেকগুলি কারণকেই চিহ্নিত করা যায়।

তাছাড়া, একটা দীর্ঘ সময় না খাওয়ার পর বাকি সময়টা তড়িঘড়ি করে খেতে যাওয়াটাও যথেষ্ট কষ্টের কাজ হতে পারে। এই বিষয়ে গবেষক ব্র্যাড পাইলনের মতামত হচ্ছে, “উপবাস শেষ করার পর এমন ভান করতে হবে, যেন আপনি কখনোই উপবাস করেননি।” অর্থাৎ, অযথা বেশি বেশি খেয়ে শরীরের ক্ষতি না করে, স্বাভাবিক মাত্রায় খাওয়াটাই কাম্য।

এছাড়াও, উপবাসের ফলের নানা ধরনের হরমোনাল বিশৃঙ্খলা ও এই কারণঘটিত নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে সেটা হতে পারে অনিয়মিত রজঃচক্র, উর্বরতা হ্রাস ইত্যাদি, আবার নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অনিদ্রা, মানসিক চাপ, থাইরয়েডের সমস্যা ইত্যাদিও হতে পারে।

এসব সমস্যা প্রতিহত করার জন্য মূলত অভিজ্ঞ চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ গ্রহণ করাটাই যুক্তিযুক্ত। যথাযথভাবে শারীরবৃত্তীয় কাজগুলি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং পালন করলে এর সুফল ভোগ করাটা অনেকটাই সুনিশ্চিত।

শুভদীপ বিশ্বাস বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগ, তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।

shuvodipbiswasturja1999@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic