একবিংশ শতাব্দীতে এসে বাংলাদেশের সামনে থাকা অন্যতম প্রধান সমস্যা- বেকারত্ব। অধিক জনসংখ্যা, দক্ষ জনশক্তির অভাব, কর্মমুখী শিক্ষার অপর্যাপ্ততা ইত্যাদি বিষয়গুলো মূলত এর জন্য দায়ী। বিগত কয়েক বছর ধরে সরকার যদিও বেকারত্ব নিরসনে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, কিন্তু তাতেও বেকারত্বের হার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমানো যায়নি। আর তাই এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে এবং একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যে জিনিসটির উপর এখন জোর দেওয়া হচ্ছে, সেটি হলো উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠার মাধ্যমে নিজের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিজেই করা।
মূলত চাকরির পেছনে না ছুটে কোনো একটি কাজের মাধ্যমে নিজের জন্য একটি আয়ের ব্যবস্থা গড়ে তোলাকে বলা হয় উদ্যোগ বা আত্মকর্মসংস্থান। আর যিনি এই কাজটি করেন, তাকে বলা হয় উদ্যোক্তা। আমরা সবাই জানি, বর্তমানে চাকরির বাজার ঠিক কতটা কঠিন। এদেশের আয়তনের তুলনায় অত্যধিক জনসংখ্যা হওয়ায় কোনোভাবেই এই বিপুল জনসংখ্যার সবাইকে সরকারি বা কোনো বেসরকারি সংস্থার অধীনে চাকরির আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না।
একটি দেশে বেকারত্ব যত বাড়বে, সে দেশের দারিদ্র্যের হারও তত বাড়বে। তাই একজন তরুণ যদি তার পড়ালেখা শেষ করে শুধু চাকরির পেছনে না ঘুরে কোনো একটি কাজের উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাহলে সে একদিকে যেমন নিজের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে এবং একই সাথে আরো অনেকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবে।
প্রথমেই আত্মবিশ্বাস
তবে অন্য সকল কাজের মতো একজন উদ্যোক্তাকেও অনেক বাধা-বিপত্তি মোকাবেলা করার মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। এক্ষেত্রে প্রথমেই যে বাধাটির সম্মুখীন হতে হয়, তা হলো পরিবার-পরিজন বা কাছের মানুষ থেকে বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক কথা শোনা। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষই চাকরি করাকে যতটা সহজভাবে নেয়, উদ্যোক্তা হওয়াটাকে ততটা সহজভাবে নেয় না। “তুমি পারবে না”, “উদ্যোক্তা হতে গিয়ে সব হারাবে”, কিংবা “তুমি একজন শিক্ষিত যুবক হয়ে কিনা করবে এই ধরনের কাজ!”- এসব কথাগুলো প্রায় সকল উদ্যোক্তাকেই প্রথমদিকে শুনতে হয়। এতে করে অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং শেষে তার আর উদ্যোক্তা হওয়া হয় না।
উদ্যোক্তা হতে চাইলে আপনার কর্মক্ষেত্রটি বেছে নেওয়ার পর নিজের কাজের উপর শতভাগ আস্থা রেখে সামনে এগিয়ে যান এবং সমালোচনায় কান না দিয়ে নিজের ছোট উদ্যোগটিকে কীভাবে আরো বৃহৎ পরিসরে নিয়ে যাওয়া যায়, তা নিয়ে ভাবুন। আর মনে রাখবেন- যে কোনো কাজে সফল হওয়ার জন্য যে বিষয়টি সবচেয়ে কাজে আসে সেটি হল আত্মবিশ্বাস।
অর্থনৈতিক সমাধান
উদ্যোক্তা হতে গেলে আর্থিক সমস্যা অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বিষয়। একজন উদ্যোক্তা তার পরিবার বা নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে প্রারম্ভিকভাবে তার ব্যবসা শুরু করতে পারেন। তা ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও বর্তমানে উদ্যোক্তাদের মধ্যে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা হচ্ছে। এর মধ্যে নারী উদ্যোক্তারা যাতে আত্মকর্মসংস্থানে আকৃষ্ট হন, সেজন্য তাদেরকে কিছু বাড়তি ঋণ সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, করোনা মহামারিতে দেশে বেকারত্ব বেড়ে যাওয়াতে সরকার এখন উদ্যোক্তাদেরকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং তারই পরিপ্রেক্ষিতে ৪ শতাংশ সুদে বিভিন্ন ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে।
পরিশেষে
উপরিউক্ত দু’টি সমস্যার সমাধান করা গেলে একজন উদ্যোক্তার শতকরা ৯০ ভাগ সমস্যারই সমাধান হয়ে যায়। এর বাইরে উদ্যোক্তাদেরকে দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারি পর্যায়ে বেশ কিছু সুবিধা চালু রয়েছে। যেমন- বাংলাদেশ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উদ্যোগে তরুণদেরকে কৃষি, ব্যবসা, এবং তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে স্বল্পমূল্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে কর্মমুখী বিভিন্ন পরামর্শও পাওয়া যায়। পাশাপাশি একজন উদ্যোক্তা তার যেকোনো সমস্যা নিয়ে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ করার সুযোগ পান, যেটি তাদের কাজকে আরো সহজ করে তোলে।
উদ্যোক্তাদের মধ্য থেকে কথা হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের এমবিএর শিক্ষার্থী মাহমুদুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, “লকডাউনে যখন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায় তখন নিজ জেলা কুমিল্লায় ‘এইচ রহমান পোল্ট্রি কমপ্লেক্স’ নামক একটি পোল্ট্রি ফার্ম গড়ে তুলি। আজ সেই ফার্ম থেকে যে আয় হচ্ছে, তা আমার এবং আমার পরিবারের জন্য যথেষ্ট। তবে এই কাজটি করা আমার জন্য সহজ ছিল না। সবাই বলত, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ে এসব কাজ করার কোনো মানে হয় না। কিন্তু আমি হাল না ছেড়ে নিজের স্বপ্ন পূরণে লেগে থাকি। আর সেই আত্মবিশ্বাসই আমাকে সফলতা পেতে সাহায্য করেছে। আমার সমবয়সী যারা এখন বিভিন্ন জায়গায় চাকরি করছেন, তাদের থেকে আমার মাসিক আয় আরো অনেক বেশি।”
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোনো সাহায্য পেয়েছেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, “সরকার বর্তমানে উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করছে। এর পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের কাজগুলোকে আরো কম সময়ে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করা গেলে সেটি উদ্যোক্তাদের জন্য আরো বেশি সহায়ক হবে।”
বাংলাদেশের অনেক বিখ্যাত উদ্যোক্তা আছেন যারা ক্ষুদ্র থেকে শুরু করে তাদের উদ্যোগকে দেশের গন্ডি ছড়িয়ে বিদেশ পর্যন্ত নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন। বিখ্যাত উদ্যোক্তা প্রয়াত স্যামসন এইচ চৌধুরীর কথা আমরা সবাই জানি, যিনি তার আরো তিনজন বন্ধুকে নিয়ে মাত্র আশি হাজার টাকা বিনিয়োগ করে স্কয়ার নামক একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যেটি আজকে দেশের বিখ্যাত শিল্প গ্রুপগুলোর মধ্যে একটি। এছাড়া, ‘বেঙ্গল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন’ নামক নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এর প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত জহুরুল ইসলাম এবং ‘ব্রেইন স্টেশন-২৩’ নামক বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মের উদ্যোক্তা রাইসুল কবিরের নামও এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য
ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে সামাজিক কিংবা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি- সব জায়গাতেই একজন উদ্যোক্তার গুরুত্ব অপরিসীম। কারন একজন উদ্যোক্তা নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি আরো অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেন। আশা করা যায়, আগামীতে উদ্যোক্তাদের কার্যাবলী আরো বিকশিত হবে, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
তানজিম হাসান পাটোয়ারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।
tanjimhasan001@gmail.com
