আমেরিকান সিজারবাদরক্তমাংসের শরীর ধারণ করেছে। ২০১৬ সালে মার্চে এ বাক্যটি আমি লিখেছিলাম। (সিজারবাদ বলতে জুলিয়াস সিজারের কর্মে অনুপ্রাণিত কর্তৃত্ববাদী বা স্বৈরাচারী রাজনৈতিক দর্শনকে বোঝায়।) রিপাবলিকানরা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দলটির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে বেছে নেওয়ার আগেই লেখা হয় এমন একটি বাক্য। বর্তমানে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রটির সুরত বদলে স্বৈরতন্ত্রে রূপান্তরের তৎপরতা অনেক এগিয়েছে। ২০২৪-র মধ্যে হয়ত ফিরে আসা যাবে না এমন এক অপরিবর্তনীয় অবস্থানে চলে যেতে পারে দেশটি। এমনটি যদি শেষতক ঘটে তবে দুনিয়ার প্রায় সবকিছুই বদলে যাবে সমূলে।
এমন বিপদ গাঁথার রূপরেখা (নব্যরক্ষণশীল বিদগ্ধ পণ্ডিত এবং মার্কিন পররাষ্ট্র নীতির সমালোচক) রবার্ট কেগানের মতো আর কেউই হৃদয়গ্রাহ্য করে ফুটিয়ে তুলতে পারেননি। খতিয়ে দেখলে তাঁর যুক্তিতর্কের মধ্যে পরিষ্কার প্রধান দুটি উপাদান আমাদের দৃষ্টিগ্রাহ্য হবে। প্রথমত তিনি রিপাবলিক দলকে মতাদর্শের কষ্টি পাথরে নয় বরং ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্যের ধারাপ্রবাহে সংজ্ঞায়িত করেন। দ্বিতীয়ত, গত মার্কিন নির্বাচনে চুরি ঠেকান নামে একটি অপেশাদারী বালসুলভ আন্দোলন শুরু হয়েছিল। বর্তমানে এটি খোলস বদলে পরিণত মহা-প্রকল্পের পর্যায়ে চলে গেছে। এই প্রকল্পের একাংশে রয়েছে, সে সব কর্তাদের অপসারণ করা যারা ২০২০-এ নির্বাচনের ফলাফল উল্টে দেওয়ার ট্রাম্পের কোশেশে বাদ সেধেছিলেন। এর মূল মতলব, নির্বাচনের ফলাফল কেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত আইনপ্রণেতাদের কাঁধে চড়িয়ে দেওয়া। অতএব, স্বাস্থ্যে কুলালে, রিপাবলিকান দলের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হবেন ট্রাম্প। তাঁকে সমর্থন করবে এমন একটি দল যা এখন তাঁরই হাতের অস্ত্র হয়ে বিরাজ করছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি বলেছেন জর্জ ডব্লিউ বুশের সাবেক ভাষণ-লেখক ডেভিড ফ্ররুম। তিনি বলেন, ২০২০-এর আগে কখনোই রাজনৈতিক ক্ষমতা পেতে ইচ্ছুক গণসহিংসতাকে সমর্থন দেওয়ার মতো বিশাল জাতীয় আন্দোলন আমেরিকায় দেখা যায়নি। এখন এরকম দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে এমন তৎপরতার প্রতি সমর্থনের কারণ হলো, রিপাবলিকান দলের সমর্থকরা মনে করেন, তাদের প্রতিপক্ষরা প্রকৃত আমেরিকান নন। বড় একটি দল যদি ধরে নেয় পরাজয় অবৈধ এবং পরাজয়কে অসম্ভব করে তুলতে হবে; তা হলে মোটেও উদার গণতন্ত্রের জান বাঁচে না।
এখন দেখা মিলছে এমন এক রাজনৈতিক নেতার যিনি তাঁর বিরোধিতাকারীদের দলের প্রভাবশালী পদ থেকে মূলোচ্ছেদ করেছেন। অন্যায়ভাবে নির্যাতিত হয়েছেন -- এমন এক ধারণা তার মনে দানা বেঁধে আছে। বাস্তবতা বলতে কী বোঝায় অনুগতদের জন্য তাও নির্ধারণ করেন এই নেতা। পাশাপাশি তাঁর জোর দাবি হলো, একমাত্র তিনি বিজয়ী হলেই সে নির্বাচন বৈধ বলে বিবেচিত হবে। এতে আমেরিকায় সাংবিধানিক সংকটের ঘনঘটা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। কেগান তাই ২০২৪-র নির্বাচন নিয়ে সর্তক করে দিলেন, উচ্ছৃঙ্খলতা। ভাবুন, আমেরিকার বহু রাজ্যে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে চলছে গণ বিক্ষোভ। দুই দলের আইনপ্রণেতারা নিজ নিজ পক্ষের বিজয়ের দাবিতে গলা ফাটিয়ে চলছে। আর প্রতিপক্ষ অসাংবিধানিক ভাবে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করছে বলে পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগের কাদা ছুঁড়ছে।
ধরে নিন যে, বৈধ প্রক্রিয়ায় কিংবা নয়-ছয়ের জোরে ট্রাম্প আবারো নির্বাচনে বিজয় হাসিল করেছেন। সেক্ষেত্রে প্রথম মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা প্রয়োগের সময় নির্বুদ্ধিতা এবং অযোগ্যতার কারণে যে সব ভুল তিনি করেছিলেন, তা আর ঘটবে না বলেই ধারণা করা যেতে পারে। ট্রাম্প নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন সুচারুভাবে ক্ষমতা চালাতে হলে আত্মত্যাগী কিছু অনুগত লোকের প্রয়োজন পড়বে তাঁর। অবশ্য, অনুগত লোকের অভাব হবে না। এ সব অনুগতদের দিয়েই বিচারের দায়িত্বে নিয়োজিত বিভাগ, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাস্তবায়নের বিভাগ, রাজস্ব বিভাগ, গোয়েন্দা এবং প্রতিরক্ষা বিভাগ চালাতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে তাঁর প্রতি একান্ত অনুগত কর্মকর্তাদেরকেই মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিয়োগ করা হবে। তিনি একটি অনুগত রিপাবলিকান পার্টি পাবেন। তিনি যাদেরকে পছন্দ করবেন তাঁদের নিয়োগ নিশ্চিত করার প্রয়োজনেই সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দরকার পড়বে। আর মনে হয় এমনটিই ঘটবে।
একইভাবে নিশ্চিত হয়েই বলা যায় যে বিত্ত এবং প্রতাপশালীদেরকে তাঁর পঙক্তিতে শ্রেণিবদ্ধ করতে তাঁদের ওপর যারপরনাই চাপ দেবেন তিনি। এতে স্বজনতোষী পুঁজিবাদের বিস্তার ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। এ বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে মার্কিন ডানপন্থী পণ্ডিতদের প্রশংসায় ধন্য অনুদার গণতান্ত্রিক পরিবেশে বসবাসরত হাংগেরিবাসীদের প্রশ্ন করতে পারেন।
কেগান বলেন, হাতে গোণা গুটি কয়েক রাজনীতিবিদ বাদে মার্কিনীরা এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে এবং এটি ঠেকানোর চেষ্টা করতে অস্বীকার করছে। এরপর তিনি আরো বলেন, ফ্যাসিবাদের উত্থান হয়েছে এমন সব দেশেও একই ঘটনা ঘটেছে। স্বৈরশাসকের মোহন ব্যক্তিত্বের সামনে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষরা সংশয়ে দোদুল্যমান এবং হতবাক বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল।
এবারে ২০২০-র নির্বাচন বানচালের চেষ্টায় ট্রাম্পের অভ্যুত্থানের কলকাঠি নাড়ার প্রচেষ্টার কথাই ভাবুন। একই সাথে ভাবুন, কেউকেটাদের বিশেষ করে খোদ ট্রাম্পকে জবাবদিহিতা থেকে বাঁচাতে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা এবং সমর্থকরা কেমন সমাবেশ করেছেন। যাঁরা অভ্যুত্থান প্রতিরোধের চেষ্টা করেছেন বা নিন্দা জানিয়েছেন, একমাত্র তাদের ওপরই নেমে এসেছে শাস্তির বজ্রাঘাত। রিপাবলিকানরা এরই মধ্যে প্রত্যাবর্তনের শেষ সীমারেখাও অতিক্রম করেছে। তাদের পক্ষে আর ফিরে আসা সম্ভব নয়।
মার্কিন গণতন্ত্রকে কেন এমন গুরুদশায় পড়তে হলো? জবাবে বলতে হবে, লোভ, উচ্চাভিলাষ এবং ক্রোধ খিচুড়ি পাকিয়ে উঠেছে এমন এক দেশে যা কিনা ধীরে ধীরে বিভাজনের আবর্তে আটকে পড়ছে। সেখানে দেশটির মানুষের বিশাল অংশকে নিরাপদ প্রবৃদ্ধির নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে অর্থনীতি। এ অবস্থায়, দেশটিতে বহিরাগতদের ভিন্ন মানুষ-এর কাতারে ঠেলে দিয়ে, জাতির অহংবোধকে প্ররোচিত করে, বিত্তশালীদের রক্ষা করা এবং একজন মহান নেতার স্তাবক হয়ে ওঠার মতো পরিচিত পথে জোটবদ্ধ হতে দেখা যায়। করোনার কষ্টিপাথরে যাচাই করলেই এ গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষগুলোর কূপবাসী মনোজগতের ঠিকানা পাওয়া যায়। ৫৭ শতাংশ রিপাবলিকানই টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াকে কোভিড-১৯-র থেকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন। এটাই উপজাতিসুলভ মানসিকতার মাপকাঠি।
মার্কিন মুল্লুকে কি উদার গণতন্ত্রের এমন পতন এখনো ঠেকানো যাবে? সম্ভবত যাবে। ২০২০-এর নির্বাচনী ফলকে উল্টে দেওয়ার ট্রাম্পের ব্যর্থ চেষ্টার আলোকে অনেকেই বলেছেন, পতন ঠেকানোর কাজটি কখনোই সহজ হবে না। তিনি নিজ দলের পুরোটা নিয়ন্ত্রণ করছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাভাবিক রাজনৈতিক চক্রের কারণে রিপাবলিকানরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেতে পারে। সে ক্ষেত্রে তিনি ২০২২ সালে কংগ্রেসকে তাঁর রক্ষায় এবং তাঁর সেবায় প্রায় সদাপ্রস্তুত অবস্থায় পাবেন। নীতিগত দিক থেকে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের বিশাল এক সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশও রয়েছে তাঁরই সমর্থনে। মার্কিন ২৩ অঙ্গরাজ্যের সবকটি শাখার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে রিপাবলিকানরা। অন্যদিকে ডেমোক্রেটদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কেবল ১৫ অঙ্গরাজ্য। রিপাবলিকান দলের ব্যাপক সংখ্যক সিনেটরা ভোট অধিকার সংক্রান্ত আইনের অনুমোদন দিয়েছেন। এ ধরণের আইনকে মার্কিন আইন বিভাগ যেন বাতিল করতে না পারে তার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন তাঁরা। কেগান এই সিদ্ধান্তের ওপর ভর করেই মার্কিন উদার গণতন্ত্র রক্ষার বিষয়ে আশাবাদ ধরে রাখতে চাইছেন।
তবে এখানেও কথা আছে। ট্রাম্পকে যাঁরা ঘৃণা করেন তাঁরাও দলের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখতে চাইছেন। সরকারি ঋণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ নিয়ে এক বিতর্ককালে দেখা গেল রিপাবলিকান দলের সদস্যরা জো বাইডেনকে ব্যর্থ করে দিতে দ্বিধা করছেন না।
এবার ভাবুন, ২০২৪-এ ক্ষমতায় ফিরে আসবেন ট্রাম্প। কংগ্রেস এবং সুপ্রিম কোর্টের পৃষ্ঠপোষকতায় শত্রুদেরকে একহাত দেখে নিতে চাইবেন তিনি। এমনটি সাময়িক সময়ের জন্য ঘটতে পারে। ট্রাম্প বুড়ো হয়ে গেছেন। তাঁর মৃত্যুর ফলে কর্তৃত্বপূর্ণ মুহূর্তের আপাত ইতি ঘটবে। কিন্তু কাহিনির শেষ হবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন ব্যবস্থা বা রিপাবলিকান দল আর কখনো আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না। দলটি একটি প্রতিক্রিয়াশীল কর্মসূচির মৌলবাদী দলে পরিণত হয়েছে।
বিশ্বে আমেরিকা একমাত্র গণতান্ত্রিক পরাশক্তি। দেশটির চলমান রাজনৈতিক সুরত বদল দুনিয়ার সর্বত্র উদার গণতন্ত্রের ওপর গভীর ছায়া ফেলবে। একই সাথে জলবায়ু ঝুঁকির মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড দুনিয়া কিভাবে সামাল দেবে তার ওপরও বর্তাবে এর প্রভাব। ২০১৬-তে হয়ত এ ধরণের বিপদ নিয়ে না ভাবলেও চলত। এখন সবার্থে কানা হলেই এমন বিপদগুলো চলতে পারে।
[মার্টিন উলফ ফাইনান্সিয়াল টাইমসের অর্থনীতিবিষয়ক প্রধান ভাষ্য রচয়িতা। তাঁর ইংরেজি নিবন্ধটি বাংলায় রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]