Loading...

ঈদের একাল-সেকাল

| Updated: July 21, 2021 09:37:25


ঈদের একাল-সেকাল

- ভাই গরু কত?

- এক-বিশ (এক লাখ বিশ হাজার)

বছরের দ্বিতীয় ঈদ, ঈদ-উল-আযহার সময় এরকম প্রশ্ন প্রত্যেক গলিতে গলিতে শোনা যায়। এ ঈদ নিয়ে ছোট্ট শিশু থেকে বয়োজ্যেষ্ঠ সবারই থাকে বাড়তি উন্মাদনা। কেউ থাকে ব্যস্ত টাকার হিসেবে, কেউ থাকে কোরবানির পশুর সাথে খেলা করতে। কালের পরিক্রমায় এ নিয়ে মানুষের আয়োজন, উৎসাহ-উদ্দীপনা সবকিছুর পরিবর্তন হয়েছে, আবার কিছু বিষয় আছে ধ্রুব। আজকের লেখায় থাকবে কোরবানি নিয়ে পুরনো দিনের স্মৃতির সাথে বর্তমানের গল্প।

হাটের দিনগুলো

হাট থেকে গরু কেনা যুদ্ধে অংশ নেয়ার মতো। ঈদের কয়েকদিন আগে থেকেই বাড়ির ছেলেরা আশেপাশের হাটগুলো দিনে কয়েকবার করে ঘুরে আসে। প্রতিবেশীর বাসায় গরু আসলে তার দাম কত? কোন হাট? – এসব প্রশ্নের উত্তর জেনে নিয়ে তারা বাজারটা মেপে নেয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র আসিফ উল্লাহ বলেন, “হাট থেকে গরু আনার বিষয়টা আনন্দের।“ তিনি বর্ধিত পরিবারের অংশ হওয়ায়, ঈদের চারদিন আগে থেকেই তাদের মাঝে গরু কেনা নিয়ে তোড়জোড় শুরু হয়। অবশেষে চাচা-ফুফু আর ভাই-বোনদের সাথে ঈদ উদযাপন করা হয়।

হাট থেকে গরু কিনে আনার বিষয়টিতে সময়ে সময়ে কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। আগে যেখানে হাট থেকে গরু ক্রয় করা হতো সপ্তাহ খানেক আগে, এখন তা ক্রয় করা হয় দু-একদিন আগে। এমনকি ঈদের দিন ভোর তিনটায় নিয়ে এসে সেদিন সকালেই কোরবানি করা হয়।

এ নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন পুরান ঢাকার নারিন্দার অধিবাসী মোঃ শওকত আলী, বয়স যার এখন ষাটের ঘরে। তিনি বলেন, আমি যখন হাফপ্যান্ট পরি, বয়স আট কিংবা ঊর্ধ্বে দশ, তখন আমার নানা গাবতলী থেকে ৫০০-৭০০ টাকায় গরু নিয়ে আসতেন, যেটা এখন সত্তর হাজারের বেশি। তখন ট্রাকের ব্যবস্থা ছিল না, আর ঢাকায় লোক ছিল অনেক কম। তাই গাবতলী থেকে হেঁটেই লক্ষীবাজারে চলে আসতেন।“ তবে তিনি মনে করেন, আগে গরু রাখার যথেষ্ট জায়গা ছিল, এখন নেই। "এইযে শ্যামা প্রসাদ আর নন্দলাল দত্ত লেনের মাঝ দিয়ে রাস্তাটা গিয়েছে, এর আশেপাশে যত উঁচু বিল্ডিং দেখা যায়, এগুলো আগে ছিল না। এখন বাড়ি বড় করতে গিয়ে মানুষের মন আর উঠান দু’টাই ছোট হয়ে গেছে। তাই জায়গার অভাবে সাতদিন আগে গরু কেনা যায় না। গরু কিনলে রাখবে কোথায়? আবার রাখলেও এইটার আলাদা চার্জ আছে।“

ব্যাপারিদের ঈদ

এখন ঢাকার বিভিন্ন স্থানে গরুর হাট বসে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যাপারিরা গরু নিয়ে আসে। বর্তমানে হাটের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও আগে গাবতলী, নয়াবাজার আরো কিছু জায়গায় বসত।

গ্রামে অনেকেই নিজের পালা গরুই কোরবানি করে। গরু বিক্রি হওয়ার সময়ে মালিকের অশ্রুসিক্ত চোখ তার প্রিয় পশুকে ছাড়তে চায় না। কোরবানির পশুটি যেন তার মালিকের কথা বুঝে। সেও তাকে ছেড়ে যেতে চায় না। এরকমই অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন মোঃ শওকত আলী, যা তিনি কখনো ভুলতে পারেননি- “আমি গরু আর মালিক দু'জনের চোখেই মায়া দেখেছি। মালিক তার গরুটির গলা জড়িয়ে কান্না করে যাচ্ছিল।”

একইরকম অভিজ্ঞতা হয় নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এস. এম. শাদমানের। তিনি তখন জে.এস.সি পরীক্ষার্থী। তিনি দেখেন, এক ব্যাপারি ছেড়ে যাওয়ার পর পাঁচটি রশি দিয়েও গরুটি বেঁধে রাখা যাচ্ছিল না। অবশেষে গরুর ব্যাপারি হাট থেকে দৌড়ে এসে আবার বেঁধে যায় এবং স্নেহের সাথে বলে শান্ত থাকতে। কোরবানির করা পর্যন্ত পশুটি শান্তই ছিল।

পশুর দেখাশোনা

ধোলাইপাড়ের অধিবাসী মোঃ শাহজাহান তার নাতি-নাতনিদের সাথে প্রতি বছর ঈদ উদযাপন করে থাকেন। তিনি কোরবানির পশু বাড়িতে নিয়ে আসার পর থেকেই তার নাতি-নাতনি গরুর দেখাশোনা করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তার ছয় বছরের নাতি আরমান, গরুর সাথে খেলা করে, এটা-ওটা প্রশ্ন করে। তিনি বলেন, "এই আনন্দটা সময়ের সাথে পাল্টায়নি। আমিও ছোট থাকতে এভাবেই যত্ন করতাম আর খেলতাম। পরের দিন কোরবানি হয়ে গেলে আবার কান্নাও করতাম।‌”

কোরবানির দিন

কোরবানির দিন পশুকে গোসল করানো শেষে কসাইকে বারবার ফোন দেওয়া ঈদের দিনের নির্ধারিত দৃশ্য। তারা মূলত বছরের এই দিনটাতে চুক্তিভিত্তিক কাজ নেয়। বর্তমানে দোয়া পড়ার জন্য হুজুরের চাহিদাও বেড়ে যায়। পশু কেনার আগে থেকেই অনেক দর কষাকষি করে ঠিক তাঁদের কাছে সময় নিয়ে রাখতে হয়।

পুরনো দিনে সাধারণত যারা পশু কিনে আনত, তারাই কোরবানি করত। ধর্মীয় বিধানে নিজেকেই কোরবানি করতে উৎসাহ দেওয়া হয়। গ্রামে অনেকেই নিজেরাই কোরবানি করে। তবে বর্তমানে এখানেও পরিবর্তন এসেছে।

মাংস বিলি

ঈদের দিনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো মাংস দান করা। ইসলাম ধর্মমতে কোরবানি গ্রহণযোগ্য হবে না, যদি কেউ বিধান মোতাবেক মাংস দান না করে। বাড়ির ছোট-বড় সবাই এই ভাগ-বাটোয়ারায় অংশ নেয়।

ষাট, সত্তরের দশক কিংবা একবিংশ শতাব্দীর বর্তমান সময়, কোরবানির মাংস বিলি করার চিত্রটি একই রয়েছে। একইভাবে মাংস কাটাকাটি করা এসব কাজেও বাড়ির ছেলেদের দায়িত্বে পরিবর্তন আসেনি। কোরবানির পর মাংস সাথে সাথেই চুলায় চড়িয়ে দেয়াটা বাড়ির নারীদেরও যেন যুগ যুগ ধরে চলে আসা একটি‌ নির্ধারিত কাজ।

ঈদের চিত্রনাট্যে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। সরাসরি যোগাযোগের বদলে এসেছে স্মার্ট ফোন, নিজেদের করা কোরবানির পরিবর্তে এখন আছে চুক্তিভিত্তিক ভাড়া করা কসাই, পালা পশুর জায়গায় রাজত্ব করছে বড় বড় এগ্রো ফার্ম। মাঝখানে উঠোন দখল করে হয়েছে আকাশচুম্বী অট্টালিকা। তবে এসবের মাঝেও ছোট্ট শিশুটি তার প্রিয় পশুর পিছনে দৌড়ানো থামেনি, কারণ কিছু জিনিস কখনো বদলায় না।

মোঃ ইমরান খান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।

mohd.imranasifkhan@gmail.com

 

Share if you like

Filter By Topic