পাসপোর্ট থেকে ইসরায়েল প্রসঙ্গ বাদ দেওয়া হলেও বাংলাদেশিদের সেদেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা ‘বহাল আছে’ এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতেও কোনো পরিবর্তন আসেনি বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এ বিষয়ে ইসরায়েলের এক কূটনীতিকের টুইটের পর রোববার এক বিবৃতিতে এভাবেই বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, “বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের ইসরায়েল ভ্রমণে আগের মতই নিষেধাজ্ঞা আছে। ইসরায়েলের বিষয়ে বাংলাদেশের যে অবস্থান সেখান থেকে বাংলাদেশ সরে আসেনি এবং বাংলাদেশ এক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অবস্থানেই অবিচল রয়েছে।”
বাংলাদেশি নাগরিকদের পাসপোর্টে এক সময় লেখা থাকত- ‘দিস পাসপোর্ট ইজ ভ্যালিড ফর অল কান্ট্রিজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড এক্সসেপ্ট ইসরায়েল, তাইওয়ান অ্যান্ড দ্য রিপাবলিক অব সাউথ আফ্রিকা’ কথাটি।
পরে দক্ষিণ আফ্রিকা ও তাইওয়ানের নামটি ওই নিষেধাজ্ঞার তালিকা থেকে বাদ গেলেও ইসরায়েল থেকে যায়। দশককাল আগে হাতে লেখা পাসপোর্ট থেকে যন্ত্রে পাঠযোগ্য পাসপোর্ট (এমআরপি) চালুর পরও আগের মতো প্রথম পৃষ্ঠায়ই লেখাটি ছিল।
এখন ই পাসপোর্টে এসেছে পরিবর্তন। তাতে লেখা হচ্ছে শুধু- ‘দিস পাসপোর্ট ইজ ভ্যালিড ফর অল কান্ট্রিজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’।
গাজায় সাম্প্রতিক ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের মধ্যে বাংলাদেশের পাসপোর্টে এই পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে গত দুদিন ধরেই আলোচনা চলছে। এর মধ্যেই ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উপ পরিচালক রাষ্ট্রদূত গিলাড কোহেনের একটি টুইট ওই আলোচনাকে আরও উস্কে দেয়।
বাংলাদেশ ইসরায়েলের ওপর থেকে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ‘তুলে নিয়েছে’ মন্তব্য করে বিষয়টি স্বাগত জানানোর পাশাপাশি কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে বাংলাদেশ সরকারকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয় ওই টুইটে।
ইসরায়েলের ওই টুইট নজরে আসার কথা জানিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, নতুন ইস্যু হওয়া ই-পাসপোর্ট থেকে ’অল কান্ট্রিজ এক্সসেপ্ট ইসরায়েল’ অংশটি বাদ দেওয়ার পর এই বিভ্রান্তির তৈরি হয়েছে।
“বিষয়টি তুলে দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের ই-পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার জন্য। তার মানে এই নয় যে মধ্যপ্রাচ্যের বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো পরিবর্তন হয়েছে। বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের ইসরায়েল ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা অপরিবর্তিতই থাকছে।”
বাংলাদেশ এখনও ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি, ফলে দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কও নেই। বরং ফিলিস্তিনকে দূতাবাস করতে ঢাকায় জায়গা দেওয়া হয়েছে।
সরকারের সেই অবস্থান অটুট থাকার কথা জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, ”আল-আকসা মসজদি কম্পাউন্ড ও গাজায় বেসামরিক লোকজনের উপর দখলদার ইসলায়েলি বাহিনীর সাম্প্রতিক সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
“জাতিসংঘের প্রস্তাবের আলোকে দুই রাষ্ট্র সমাধানকে স্বীকৃতি জানানোর মৌলিক অবস্থানেই আছে বাংলাদেশ, যেখানে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধ-পূর্ববর্তী সীমানা ঠিক রেখে দুটি রাষ্ট্র তৈরি এবং পূর্ব জেরুজালমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী করার বিষয়টি রয়েছে।”
ই-পাসপোর্টে পরিবর্তনের বিষয়ে জানতে চাইলে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আইয়ুব চৌধুরী বলেছেন, “সরকারের সিদ্ধান্তের আলোকে এটা হয়েছে।”ইমিগ্রেশন অ্যান্ড পাসপোর্ট অধিদপ্তর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি দপ্তর।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল শনিবার বলেন, “আন্তর্জাতিক মানের পাসপোর্টের স্ট্যান্ডার্ড রাখতে গিয়ে এটা করা হয়েছে।”
“বিশ্বের কোনো দেশ এ শব্দটি ব্যবহার করেনি। এমনকি আরব অঞ্চলের দেশগুলোও,” যুক্তি দেখান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ই- পাসপোর্টে পরিবর্তন এলেও এমআরপিতে তা আগের মতোই রয়েছে।
তবে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এমআরপিতে পূর্বের কথাটি এখনও লেখা হচ্ছে। বাদ দেওয়ার বিষয়টি চলমান প্রক্রিয়া।”
পাসপোর্টের লেখায় পরিবর্তন হলেও তা পররাষ্ট্র নীতির কোনো পরিবর্তন নয় বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
“আমাদের ফরেন পলিসির কোনো পরিবর্তন হয়নি,” বলেন তিনি।
পাসপোর্ট থেকে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শব্দবন্ধটি উঠে যাওয়ায় এখন বাংলাদেশ থেকে ইসরায়েল যাওয়ার পথ খুলল কি না- প্রশ্ন করা হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “পাসপোর্ট একজনের পরিচিতি। আর কোনো দেশে যেতে হলে তো ভিসা লাগে।”
বিষয়টির ব্যাখ্যায় দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকা-না থাকার কথা বলেন তিনি।
“কূটনৈতিক সম্পর্ক তো লাগবে। আবার কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও অনেকেই অনেক দেশে ভিসা না পাওয়ার কারণে যেতে পারেন না।”
