ইরানের পরমাণু কর্মসূচির বিরুদ্ধে হামলার ঝুঁকি, বিপদ এবং বাস্তবতা


সৈয়দ মূসা রেজা | Published: December 28, 2021 14:55:24 | Updated: December 28, 2021 20:11:10


ছবিঃ লেখক

ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোর ওপর যারা আমেরিকার হামলা চালানোর কথা বলছেন তারা এক চোখা হরিণের মতোই কেবল সুবিধাগুলোই দেখছেন, হামলার ঝুঁকি কি হবে তা খতিয়ে দেখছেন না। এ কথা বলেন ডিফেন্স ওয়ানের সিনিয়র ফেলো চার্লস ভি পেন।

ইরানি বিপ্লবের ৪০তম বার্ষিকীকে কেন্দ্র করে তেহরানে অনুষ্টিত প্রতিরক্ষা শিল্প মেলায় ইরানের তৈরি ক্ষেপণাস্ত্রের সারি। ছবিঃ লেখক

ওয়াশিংটনের প্রভাবশালীরা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। এ সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। তাদের বক্তব্য, ইরানের পরমাণু কর্মসূচির দিনে দিনে বিস্তার ঘটছে। শেষ পর্যন্ত পরমাণু বোমা বানানোর প্রযুক্তি অর্জনের মধ্য দিয়ে এ কর্মসূচি চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাবে, দাবি তাদের। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন ইরানের এ লক্ষ্য অর্জন ঠেকাতে দেশটির বিরুদ্ধে সেনা নামানোর সুযোগগুলো খতিয়ে দেখছে। এমন বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা চলছে মর্মেও খবর বের হচ্ছে।

নিজ আকাশ থেকে মার্কিন ড্রোন আরকিউ ১৭০ নামিয়েছিল ইরান। পরে তারই মতো যুদ্ধ ড্রোন তৈরি করেছে ইরান।ছবিঃ লেখক

ইরানের পরমাণু সক্ষমতার বিরুদ্ধে সামরিক হামলার ওকালতি যারা করছেন তারা দিগবিজয়ীর হাসি দিয়ে ইরাকের ওসিরাকের পরমাণু স্থাপনার ওপর সফল হামলার কাহিনি তুলে ধরেন। ১৯৮১ সালে ইসরাইল সফল ভাবে এ হামলা করেছিল। হামলায় ওসিরাক বিধ্বস্ত হলে সাদ্দামের সরকারের পরমাণু বোমা বানানোর গোটা তৎপরতাই ভেস্তে যায়।

তেহরানে সাবেক মার্কিন দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ।ছবিঃ লেখক

কেক কাটার মতো সহজ হবে না

দুনিয়ার সবচেয়ে বড় পরাশক্তি এবং সামরিক ভাবে সবচেয়ে সক্ষম বাহিনীর অধিকারী দেশটিও ইরানের বিরুদ্ধে সহজেই অমন হামলা করতে পারবে। তুলনামূলক ভাবে হামলা সহজই হবে, তারা দাবি করেন। তারপর সিনাজুরি করে বলেনও, ইরানের কাছে দীর্ঘপাল্লার কোনো ক্ষেপণাস্ত্রই নেই। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূলভূমির ওপর প্রতিশোধ-হামলার সাধ তেহরানের থাকলেও সাধ্যে কুলাতে পারবে না। তবে তারা ভুলে যান, এমন সিনাজুরির মধ্য দিয়ে একটি প্রশ্ন উসকে দেওয়া হয়েছে, তা হলো, তেহরানের ভান্ডারে যদি দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের বালাই নাই থাকে তবে ইরান কী করে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকির ভয়াল কালো ছায়া বিস্তার করছে?

বিক্ষোভ শেষে সেলফি তোলার পালা। পেছনে তেহরানে সাবেক মার্কিন দূতাবাসের দেয়ালের গায়ে আমেরিকা বিরোধী ব্যঙ্গচিত্র আঁকা।ছবিঃ লেখক

১৯৮১ সালে ওসিরাকে ঘটে যাওয়া নাটকের পুনঃমঞ্চায়নও সম্ভব হবে না। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা বা আগ্রাসন যাই চালানো হোক না কেন তা জটিল সামরিক অভিযানে রূপ নেবে। সহজ কাজ হবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ রকম অভিযান চালানোর সক্ষমতা আছে। তবে অভিযান মোটেও কেক কাটার মতো আরামের হবে না। ইরাকে মার্কিন হামলা কেক কাটার মতো সহজ হবে বলেই অনেক রথীমহারথী ভবিষ্যত বাণী করেছিলেন। সে অভিযানের শেষ ফল কি হয়েছে, কতো রক্তে কতো কেক জমেছে, তা জানা আছে সবারই।

মার্কিন বিরোধী বিক্ষোভের ছবি তুলছেন ইরানি নারী আলোকচিত্রী।ছবিঃ লেখক

প্রথমত ইরানের পরমাণু কর্মসূচি একটি মাত্র স্থানে সীমাবদ্ধ নয়। প্রাথমিক হামলার লক্ষ্য হতে হবে অন্তত তিনটি। আরাক, বুশেহর এবং নাতাঞ্জ। আরাকে রয়েছে শিল্প ব্যবস্থা বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স। বুশেহরে রয়েছে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র আর পরমাণু জ্বালানি সমৃদ্ধ করার স্থাপনা রয়েছে নাতাঞ্জে।

এ ছাড়া, লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্ধারণ করতে হবে আরো অনেক স্থাপনা বা শিল্প ব্যবস্থা। এ সবের মধ্যে রয়েছে পরমাণু চুল্লি, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, উৎপাদন ব্যবস্থা, রূপান্তর এবং সমৃদ্ধকরণে জড়িত ব্যবস্থা, খনি শিল্প, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং গবেষণা ও উন্নয়নে নিয়োজিত সংস্থা - সব মিলিয়ে তালিকাকে আকারে-প্রকারে ছোট বলার অবকাশই থাকবে না। তালিকার কোনো কোনো লক্ষ্যবস্তু হয়ত রয়েছে গিরি-পর্বতের গহীন গভীরে। কোনো কোনটি রয়েছে ঘন বসতির এলাকায় বা এমন এলাকার কাছাকাছি। সেখানে হামলা হলে নিরীহ সাধারণ মানুষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হবে।

মার্কিন বিরোধী বিক্ষোভ করছেন এক ইরানি নারী।ছবিঃ লেখক

এ তালিকাই শেষ কথা নয়। এ সব স্থানে হামলা সফল করতে হলে অন্য একাধিক লক্ষবস্তুতেও আঘাত হানতে হবে। লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য হয়ত ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অকেজো করতে হবে। মার্কিন আঞ্চলিক স্থাপনাগুলোকে ইরানের প্রতিশোধের আগুন থেকে বাঁচাতে চাইলে তেহরানের ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে হামলার তালিকায় আনতে হবে। ইরানে কথিত সীমিত হামলার জন্য শশব্যস্ত মার্কিন কর্তাদেরকে শেষ পর্যন্ত শয়ে শয়ে লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করতে হবে। বোস্টন হতে ১৮৫৭ থেকে প্রকাশিত আমেরিকার অন্যতম পুরানো এবং সম্ভ্রান্ত সাময়িকী দ্যা আটলান্টিক(এরই সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডিফেন্স ওয়ান) ২০০৪ সালের শরতে ইরানের হামলা সংক্রান্ত একটি রণক্রীড়া চালায়। এর নেতৃত্ব দেন মার্কিন বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল স্যাম গার্ডিনার। মহড়ায় দেখা গেছে, ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ওপর আগাম হামলা চালানোর জন্য নির্ধারণ করতে হবে অন্তত তিনশ লক্ষ্যবস্তু ।

তারপরও একটা কথা মনে রাখতে হবে, হামলা করে সব লক্ষ্যবস্তুকে পুরোই মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া যাবে বা পুরোপুরি ধ্বংস করা যাবে সে বিষয়ে শত ভাগ নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।

ভ্রু পল্লবে ডাক দিলেই জ্বলে উঠবে যুদ্ধের দাবানল

মার্কিন হামলার মুখে হতভম্ব ইরান কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কেবলই বসে বসে কিলই খাবে তেমনটা মনে করার যুক্তি নেই। ইরানের পাল্টা প্রতিশোধ হামলা নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে হামলাকারীকে। ইরান শুধু সামরিক লক্ষ্যতেই হামলা করবে এমন সরল ভাবনারও অবকাশ নেই। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল যাতায়াত করে।

ইরানি বিপ্লবের ৪০তম বার্ষিকীকে কেন্দ্র করে তেহরানে অনুষ্টিত প্রতিরক্ষা শিল্প মেলায় ইরানের তৈরি হরমুজ(বামে) এবং খালিজে ফার্স(ডানে) ক্ষেপণাস্ত্র।ছবিঃ লেখক

যাতায়াতের জন্য এই প্রণালীতে এক মাইল প্রস্থ দুটি খালপথ বা চ্যানেল রয়েছে। পাল্টা প্রতিশোধ নিতে মাইন পেতে ইরান এই প্রণালীর তেল সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ করে দিতে পারে। কিংবা তারও দরকার পড়বে না, যুতমত বড় জাহাজ ডুবিয়ে দিয়ে বা প্রতিবন্ধকতা দিয়ে গোটা প্রণালী অচল করে দিতে পারবে ইরান।

আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধে ইরানের হারানোর কিছু নেই হিসাব কষে গোটা অঞ্চল জুড়ে অপ্রচলিত যুদ্ধ শুরু করতে পারে তেহরান। ইরান ভ্রু-পল্লবে ডাক দিলেই এমন যুদ্ধের দাবানল জ্বলে উঠবে। আমেরিকার কাছে এ যুদ্ধ সন্ত্রাসবাদ হিসেবে হয়ে দেখা দেবে।

এতো সব হাঙ্গামা-হুজ্জত, প্রাণ-ধন-সম্পদ-অর্থ-সময়ক্ষয় করে আমেরিকার সত্যিই কি ইরানের পরমাণু কর্মসূচি মুছে দেওয়ার মতো রক্তস্নাত, কষ্টকর কসরত করার দরকার আছে? সব শেষ এ প্রশ্নই বড় হয়ে দেখা দেবে। যদিও ওয়াশিংটন এবং তার মিত্রদের জন্য আরামপ্রদ হবে না কিন্তু এর যথার্থ উত্তরটি হলো: না।

হামলা না চালানোর ঝুঁকি সামাল দেওয়া বিস্তর সহজ

ইরানকে আবার পরমাণু চুক্তির লাগামে আবদ্ধ করার এবং তেহরান পরমাণু অস্ত্রধর না হয়ে ওঠে সে চেষ্টার ত্রুটি করবে না আমেরিকা ও তার মিত্ররা। (এ কথা সত্য যে, বুনো ঘোড়ার মতো চুক্তির লাগাম ছুঁড়ে ফেলে এক তরফা ভাবে আমেরিকাই চুক্তি থেকে বের হয়ে গিয়েছিল আগে, ইরান নয়। তারই জবাবে বাতিল কাবিননামার মতো ধাপে ধাপে চুক্তির শর্ত ছুঁড়ে ফেলেছে ইরান।) চুক্তি নিয়ে সর্বাত্মক চেষ্টার অংশ হিসেবে আমেরিকাকে কূটনীতির পথ ধরেই এগোতে হবে। তবে কষ্ট ছাড়া কেষ্ট মেলে না প্রবাদ এ ক্ষেত্রে সত্য হয়ে নাও দেখা দিতে পারে। পরমাণু চুক্তিতে ফেরার এবং ইরানকে ফেরানর কোশেশ শেষ হতে পারে ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে। সেক্ষেত্রে আমেরিকাকে অগত্যা পরমাণু ইরানকেই মেনে নিতে হবে ।

দুনিয়ার দিকে তাকালে দেখা যাবে, উত্তর কোরিয়ার মতো অতিশয় দুষ্টমতি শাসকের সংখ্যা খুবই কম। তারপরও কিম জং-ঊন আমেরিকার জন্য পরমাণু বোমা নিয়ে মহাপ্রলয়ের নটরাজ এর ভূমিকায় নামেনি।

তেহরানের শাসকগোষ্ঠীকে, পশ্চিমারা যাদেরকে মোল্লা হিসেবে বলতেই পছন্দ করে, একক ভাবে আত্মঘাতী রাস্তায় না গেলে, ইরান পরমাণু শক্তি অর্জন করলেও পরমাণু বোমাকে ব্যবহার করবে না। উত্তর কোরিয়াও পরমাণু বোমা এখনো ব্যবহার করেনি। বরং বিশ্বে পরমাণু বোমা ব্যবহারের একমাত্র রেকর্ডের অধিকারী আমেরিকাই।

ইরান কেন পরমাণু বোমা ব্যবহার করবে না? সংখ্যায় এবং শক্তিতে আমেরিকার পরমাণু অস্ত্র ভাণ্ডারের সঙ্গে টেক্কা দেওয়া ইরানের পক্ষে সম্ভব নয়। আমেরিকার বিরুদ্ধে এমন অস্ত্র প্রয়োগ করার মানেই হলো ইরানের শাসকগোষ্ঠীর জন্য সেধে ধ্বংস ডেকে আনা।

জোসেফ স্টালিন এবং মাও-সে-তুংকে তাদের সময় আমেরিকা ছিটগ্রস্ত বলেই মনে করতো। তারপরও মার্কিন পরমাণু অস্ত্র ভান্ডারকে সমঝে চলেছেন তারা। একই ভাবে অভাব্য চিন্তা থেকে বিরত থাকছেন কিম। ইরানের প্রেসিডেন্ট আয়াতুল্লাহ ইব্রাহিম রাইসির সরকারও কোনো রকম, আমেরিকার দৃষ্টিতে, মাথা গরম কাজে নামবে না। এ ছাড়া, রাহবার বা নেতা হিসেবে পরিচিত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়িও পরমাণু অস্ত্র অর্জন বা ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর ফতোয়া দিয়ে রেখেছেন।

ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির প্রযুক্তি বা পরমাণু অস্ত্র হাতে পেলে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়বে। মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র পরমাণু শক্তিধর ইসরাইলের জন্য রসায়নটি হবে আরো মারাত্মক জটিল। তারপরও হামলা বা আগ্রাসন চালিয়ে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করতে গেলে ঝুঁকির জাহান্নামের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। কিন্তু তার চেয়ে হামলা না চালানোর ঝুঁকি সামাল দেওয়াই হবে বিস্তর সহজ।

syed.musareza@gmail.com

(সূত্র https://www.defenseone.com/ideas/2021/12/dont-attack-iran/360061/)

Share if you like