ইমোজি কাহিনী  


মোঃ ইমরান খান   | Published: May 09, 2021 20:07:45 | Updated: May 09, 2021 20:45:28


ইমোজি কাহিনী  

ব্যাকরণ থেকে জেনেছিলাম, মনের ভাব প্রকাশ করার মাধ্যম হলো ভাষা। ভাষা আমাদের মুখনিঃসৃত ধ্বনিসমূহ মিলে গঠিত শব্দ এবং বাক্যের শেষ ফল। বর্তমান সময়ে এই ভাবপ্রকাশের বাহক শব্দ ও বাক্যের পরিবর্তে কিছু সাংকেতিক চিহ্ন জায়গা করে নিয়েছে। এগুলোকে আমরা ইমোটিকন নামে চিনি। আজকের লেখাটির মূল বিষয় হবে ইমোটিকন, এর ইতিহাস, প্রয়োগ, যোগাযোগের ভূমিকা এসব নিয়ে।

ইতিহাস

ইমোটিকন নামটি এসেছে ইংরেজি দুটি শব্দ ইমোশনাল ও আইকন থেকে। নব্বইয়ের দশকে ইন্টারনেট ব্যবস্থা চালু হওয়ার পরে দুই প্রধান অনুভূতি- আনন্দ ও দুঃখ প্রকাশের জন্য এদের ব্যবহার শুরু হয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কম্পিউটার বৈজ্ঞানিক স্কট ফাহলাম সর্বপ্রথম ১৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৮২ তারিখে ইমোটিকনের ব্যবহার সম্পর্কে বলেন, এভাবে যে :-) ইমোটিকন লেখা তা মূলত আনন্দ বা সুখের বার্তা বহন করে অপরদিকে :-( এই চিহ্নটি দুঃখের।

উল্লেখ্য, তিনি যখন এ বক্তব্য দেন তখনো আমাদের দেশে ইন্টারনেট ব্যবহার শুরু হয়নি। তখন ইমোটিকনগুলো চিহ্নের মতো ব্যবহার করা হতো, যা অনেকদিন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

প্রয়োগ

ইমোটিকনের ব্যবহার নিছক আনন্দ বা মজার জন্য হলেও ক্রমেই এটি যোগাযোগের মূল বাহন হিসেবে ব্যবহার হওয়া শুরু হয়।

ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারের ব্যক্তিগত কথোপকথন বা টুইটারের সম্পূর্ণ বার্তা লিখন, কিংবা মুঠোফোনে সংক্ষিপ্ত বার্তা আদান-প্রদান; প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইমোটিকন মানুষের যোগাযোগে একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে।

কেবল আবেগ প্রকাশের জন্য ইমোটিকনের ব্যবহার ঘটে না। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের জটিল বাক্য অত্যন্ত সংক্ষেপে ইমোটিকনের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়। এটি একধরনের নতুন যোগাযোগ কৌশলও বলা চলে। যেমন: আমার ঘুম পাচ্ছে বলতে এখন 😴 এই ইমোটিকনটি ব্যবহার করলেই হয়ে যায়।

ডিজিটাল পর্দার এই রাজত্বে আপনার যেন আর সম্পূর্ণ বাক্য লেখার প্রয়োজন নেই। কয়েকটি ইমোটিকন, (ক্ষেত্রবিশেষে একটি!) দ্বারাই আপনি সম্পূর্ণ ভাব প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছেন, যার সম্ভাব্য ফিরতি বার্তাও আপনি হয়তো ইমোটিকনের মাধ্যমে পেতে পারেন যা হলো শুভ রাত্রি অর্থাৎ, 🌌 এই ইমোটিকনটি।

যোগাযোগ ছাড়াও চ্যাটবক্সে বিভিন্ন মজার খেলাধুলায় এই ইমোটিকনগুলোর ব্যবহার দেখা যায়। যার মধ্যে একটি জনপ্রিয় খেলা হল ইমোটিকনের মাধ্যমে চলচ্চিত্র বা গানের নাম সঠিক বলতে পারা। মূলত এটি স্কুল কলেজে খেলা ডাম্ব শ্যারাডের ইমোটিকন রূপ।

যেমন 🃏‌ এর মাধ্যমে বোঝা যায়, এখানে জনপ্রিয় জোকার সিনেমার কথা বলা হচ্ছে আবার ❤️+👰+ 💃🚂 🏃-এর মাধ্যমে বোঝানো যায়, সিনেমাটি হলো 'দিল ওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে'।

এরকম অসংখ্য গান ও চলচ্চিত্রের পরিচয় ইমোটিকনের মাধ্যমে তুলে ধরা যায়।

ফেসবুক ও ইমোটিকন

ইন্টারনেটে ইমোটিকনের ব্যবহার আগে থেকে হয়ে থাকলেও ফেসবুকের মাধ্যমে এর ব্যবহারের ব্যাপকতা দেখা যায়। ২০১৬ সালের আগপর্যন্ত ফেসবুকে শুধু লাইক 👍 বাটন ছিল ।

২০১৬ থেকে ফেসবুক রিঅ্যাক্ট নামক অপশনটি চালু করে। যেখানে আবেগ প্রকাশের জন্য কেবল লাইক ছাড়াও দুঃখ প্রকাশের জন্য 😞, আনন্দ প্রকাশের জন্য 😂 ভালোবাসা প্রকাশের জন্য ❤️ অবাক বা বিস্ময় প্রকাশ এর জন্য 😳 এবং রাগ বা ক্ষোভ প্রকাশের জন্য 😠 এই রিঅ্যাক্টগুলো চালু করে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেকোনো পোস্টে মানুষ তার পছন্দ অনুযায়ী এই রিঅ্যাক্টগুলো করতে পারে। রিঅ্যাক্টগুলো এখন এতটাই গুরুত্ব বহন করে যে যোগাযোগ শাস্ত্র ও ব্যবসায়ী শাস্ত্রে এসবের উপর প্রতিনিয়ত অনেক গবেষণা হচ্ছে। বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্যের মান ও সেবার মান পরিবর্তন করে থাকে এসব রিঅ্যাক্টের পর্যালোচনা করে।

ইমোটিকন এবং যোগাযোগের সমস্যা

ইমোটিকনের মাধ্যমে যোগাযোগ যেরকম সহজ হয়েছে, ঠিক তেমনি অনেকক্ষেত্রে ভুল যোগাযোগের পিছনে এই ইমোটিকন দায়ী। মৌখিক সরাসরি বার্তা আদান-প্রদানেও অনেকভুল বোঝাবুঝি হয়ে থাকে আর এটি তো শুধু ইমোটিকন, এখানে ভুল বোঝাবুঝি সুযোগ সাধারণ যোগাযোগের চেয়ে অনেক বেশি।

যেমন, 👍 এই ইমোটিকনটি ব্যবহার করা হয় কারো কাজে সম্মতি প্রকাশে বা কাজটি আপনি পছন্দ করেছেন এ অর্থে। কিন্তু বর্তমানে অনেকেই এই ইমোটিকনকে অনুধাবন করে কথা বলতে আগ্রহী নয় অর্থে। যার ফলে এক্ষেত্রে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। আবার :) বা 🙂 এই ইমোটিকনের ব্যবহার শুরু হয় মূলত আনন্দ প্রকাশ করতে, কিন্তু বর্তমানে আপনি এই ইমোটিকন ব্যবহার করলে অপরজন ধরে নিতে পারে যে আপনি এখন খুবই বিরক্ত বা অসন্তুষ্ট অবস্থায় আছেন।

বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে এই ইমোটিকনগুলোর আছে বিভিন্ন অর্থ। যেমন, 👍 এই ইমোটিকনটি পশ্চিমা সংস্কৃতিতে ভালো অর্থ বহন করলেও গ্রিক বা ম্যাডেটেরিয়ান সংস্কৃতিতে এর অর্থ অশ্লীল ও নোংরা। ঠিক একইভাবে আমেরিকায় কোনো ভালো কাজ করার জন্য স্বর্গদূত 😇 ও সাধুবাদ জানানোর জন্য 👏 হাততালির ইমোটিকন ব্যবহার করা হলেও চীনে যথাক্রমে এর অর্থ দাঁড়ায় মৃত্যু ও যৌন মিলন।

তাই ইমোটিকনের ব্যবহার সংস্কৃতি ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হতে দেখা যায়। ভাষাবিদ ভিভিয়ান ইভান ইমোটিকনের ব্যবহার বিশ্বজুড়ে সার্বজনীন মনে করলেও, বিশ্বের প্রথম ইমোটিকন অনুবাদক কিথ ব্রোনি মনে করেন, একটি সার্বজনীন নয় বরং আমাদের ভাষার প্রয়োগকে সহজ করার জন্য একটি উপকরণ মাত্র।

ইমোটিকনের গল্পের শেষে প্রিয় পাঠকদের জন্য কয়েকটি ধাঁধা দেওয়া হলো। আপনাদের বলতে হবে, সিনেমার নামটি কী। পারবেন তো, সঠিক উত্তর নির্ণয় করতে?

১. 👳 🌪️🌊 🦓🐅🛶

২. 🛀 ❤️

৩. 🤐 🐑

৪. 🌹🚂

৫. 💎 🤴 🏞️

লেখক বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। ইমেইল: mohd.imranasifkhan@gmail.com

Share if you like