Loading...

ইউরোপের সংস্কৃতি বিনির্মাণের শিকড়ে রয়েছে উসমানিয়া সাম্রাজ্য

| Updated: December 08, 2021 17:56:57


উসমানিয় সুলতান মেহমেদের কনস্টান্টিনোপল জয় – উইকিপিডিয়া ছবি উসমানিয় সুলতান মেহমেদের কনস্টান্টিনোপল জয় – উইকিপিডিয়া ছবি

ধীর ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে উসমানিয়া সাম্রাজ্য ইতিহাসের অকথিত অধ্যায়। একই সাথে ইউরোপের সংস্কৃতি বিনির্মাণে উসমানিয়া সাম্রাজ্যের উল্লেখযোগ্য ভূমিকার কথাও ব্যক্ত হচ্ছে। ইউরোপের নব আবিষ্কারের যুগে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ছিল এই  সাম্রাজ্য, যার কথা এতকাল চেপে রাখা হয়েছিল বা প্রকাশে অনীহা ছিল। সম্প্রতি প্রকাশিত মার্ক ডেভিড বেয়ারের দুর্দান্ত বই ‘দ্যা অটোম্যানস: খানস, সিজারস অ্যান্ড খলিফস’-এর পর্যালোচনায় এসব কথাই বলেন বিখ্যাত লেখক, গবেষক ও ইতিহাসবিদ উইলিয়াম ড্যালরিম্পল।

তুরস্কের ঐতিহাসিক নগরী ইস্তাম্বুলে নিজের শেষ সফরের বর্ণনার মাধ্যমে দ্যা অটোম্যানস-এর পর্যালোচনার সূচনা করেন ড্যালরিম্পল। শরতের এক উজ্জ্বল দিনে সুবর্ণ শিং বা গোল্ডেন হর্ন-এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন ড্যালরিম্পল। এটি হলো ইস্তাম্বুল নগরীকে বিভক্তকারী এবং প্রাকৃতিক বন্দর, হাজারো বছর ধরে রোমান, বাইজেন্টাইন, উসমানিয়াসহ অন্যান্য জাহাজবহরকে আশ্রয় প্রদানকারী বসফরাসের একটি খাঁড়ি। চলার পথে আধা-মরু একটি এলাকায় এসে পড়েন তিনি। এখানেই রয়েছে একটি উসমানিয়া সমাধি কেন্দ্র। সেখানে মসজিদের চত্বরটি ছায়া ঢাকা। তার পিছনেই উঁকি দিচ্ছে সমাধির অষ্টভূজাকার বুরজ বা টাওয়ার।

উইলিয়াম ড্যালরিম্পল

আর এটিই প্রায় বিস্মৃত উসমানিয়া নৌ-সেনাপতি কিলিক আলি পাশার সমাধিক্ষেত্র। ১৫৭১-এ লিপান্টোর যুদ্ধে খ্রিস্টান হলি লিগের (ইউরোপীয় দেশগুলোর জোট) বিরুদ্ধে তাঁর অসীম বীরত্ব পরবর্তীতে লোকগাথা হয়ে ওঠে। বিধ্বংসী এ নৌ-লড়াইয়ে উসমানিয়া পক্ষের ২৩০টি যুদ্ধ জাহাজের মধ্যে ২০০টি ডুবে যায়। প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারেনি প্রায় ৫০ হাজার নাবিক। যুদ্ধে বীরত্বের পুরষ্কার হিসেবে কিলিক আলিকে কাপ্তান পাশা বা উচ্চ নৌ-সেনাপতির পদ দেওয়া হয়। ১৫৭৩ সালে ভেনিসবাসীদের নিয়ন্ত্রিত খ্রিস্টান (অধিকৃত) সাইপ্রাস জয়ের যুদ্ধে পাঠানো হয় তাকে। এখানে অস্বস্তির খোঁচা অনুভব করতে পারেন কেউ কেউ। মনে হতে পারে, ‘ভয়ানক তুর্কি’রূপকে মূর্ত করে তোলার অবতার হিসেবে কিলিককে বেছে নেওয়া হয়েছে। উস্কে দেওয়া হচ্ছে সভ্যতার সংঘাত! কিন্তু না। সচেতন ড্যালরিম্পলের কাছে ধরা পড়েছে যে কিলিক আলির আসল নাম ওচিয়ালি। ইতালির ক্যালাব্রিয়া অঞ্চলের অধিবাসী বা ক্যালাব্রিয়ান ওয়ালিচ উসমানিয়া বাহিনীতে ঢোকার জন্য ইসলাম গ্রহণ করেন। এশিয়া এবং ইউরোপের বাহিনীর সঙ্গে অনিবার্য কিছু যুদ্ধ নিয়ে প্রচলিত ধারণা এবারে বিপরীত স্রোতের মুখে এসে দাঁড়ায়। হ্যাঁ, এমনটা ঘটে যখন ড্যালরিম্পল জানতে পারেন, এই সমাধিক্ষেত্র বানিয়েছেন খৃস্টান ধর্মত্যাগকারী সাবেক খৃস্টান, মহান সিনান। আর্মেনিয়ার অধিবাসী সিনানের সাবেক নাম ছিল জোসেফ। বাইজান্টাইন গির্জা ‘হাইয়া সোফিয়া’র আদলেই এখানে মসজিদকে গড়ে তোলা হয়। [‘হাইয়া সোফিয়া’ শব্দ দুটি দিয়ে বোঝানো হয় "পবিত্র জ্ঞান।" যিশুকে এ উপাধিতে ভূষিত করেছে অর্থোডক্স চার্চ যা দ্বিতীয় বৃহত্তম খ্রিস্টান চার্চ হিসেবে গণ্য। এ চার্চের দীক্ষাদানোত্সব গ্রহণকারী ২২ কোটি সদস্য রয়েছে।]

একই সময়কালে সবচেয়ে ক্ষমতাধর উসমানিয়ার উজির ছিলেন নপুংসক হাসান আগা। বৃহত্তর ইয়ারমুখের অধিবাসী হাসান আগার  সাবেক নাম স্যামসন রোলি। অন্যদিকে উসমানিয়া শাসনামলের এক সেনাপতি ‘ইংলিজ মুস্তফা’ নামে খ্যাতির শিখরে উঠেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন স্কটল্যান্ডের অধিবাসী এক ক্যাম্পবেল (প্রচলিত একটি স্কটিশ নাম হলো ক্যাম্পবেল)। তিনি ইসলাম গ্রহণ করে তুরস্কের পদাতিক সেনাবাহিনী জানিসারিতে যোগ দিয়েছিলেন।

দুই মহাদেশের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ আন্তঃসাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে জীবনযাপনে অভ্যস্ত কিলিক আলি পাশার ইস্তাম্বুল সমাধিক্ষেত্রকে অবস্থানগত বিচারে খুঁতহীন বলতে হবে। ভিনদেশি রূপ-বৈভবে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও ইস্তাম্বুল, সম্রাট কনস্টানটাইনের ‘নতুন রোম’, সর্বদাই ইউরোপীয় নগরীর অভিধায় পরিচয় পেয়েছে। উসমানিয়া তুর্কিদের শিকড় ছিল আনাতোলিয়াতে, তার আগে ছিল মধ্য এশিয়াতে। এরপরও ইউরোপীয় ইতিহাসে তাঁরা কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁদের অবস্থান যখন শিখরে ছিল তখন দানিয়ুবের একটি তীর নিয়ন্ত্রণ করেছেন তাঁরা। ভেনিসের উপকণ্ঠে গেড়েছিলেন সামরিক-শিবির। উসমানিয়ার বিশ্ব সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করেছে ইউরোপের এক চতুর্থাংশ। তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল আজকের সার্বিয়া, বসনিয়া, মেসিডোনিয়া, আলবেনিয়া, বুলগেরিয়া, হাংগেরি এবং গ্রিস। এছাড়া পশ্চিমা ইউরোপের সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদারও ছিলেন তাঁরা। মার্ক ডেভিড বেয়ারের দুর্দান্ত নতুন বই  ‘দ্য অটোম্যানস’ এর মূল প্রতিপাদ্য বিষয়ই হলো এ সব।

দ্য অটোম্যাসন বইয়ের প্রচ্ছদ

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের আন্তর্জাতিক ইতিহাসের অধ্যাপক বেয়ার লিখেছেন, “উসমানিয়া সাম্রাজ্যে (১২৮৮-১৯২২) যেমন কেবলমাত্র তুর্কি ভাষাই প্রচলিত ছিল না, ঠিক সেভাবেই এটি কেবলমাত্র তুর্কিদের সাম্রাজ্য ছিল না।” তিনি আরো বলেন, “কেবল মুসলমানদের নিয়েই এ সাম্রাজ্য গঠিত হয়নি... বরং রোমান  সাম্রাজ্যের মতো এটি ছিল একটি বহু-জাতিগত সংখ্যালঘু, বহুভাষিক, বহুজাতিক, বহু-ধর্ম বিশ্বাসীদের নিয়ে গড়ে ওঠা সাম্রাজ্য । এটি ছিল একটি ইউরোপীয় সাম্রাজ্য, যা ইউরোপীয় সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে  রয়েছে।"

উসমানিয়রা ভাবতো যে ইউরোপে তাদের অগ্রযাত্রার মানে দাঁড়াচ্ছে  তারা বাইজেন্টিয়দের সুযোগ্য উত্তরাধিকারী। কাজেই তাদেরকে  ‘নতুন রোমান’এর পঙক্তিতে ফেলে হিসেব করা উচিত। তাদের এ ভাবনাকে সে সময় দুনিয়ার মানুষ খুশি মনেই স্বীকার করেছে বা স্বীকার করতে পেরে  খুশি হয়েছে। "আরব, পারস্য, ভারতীয় এবং তুর্কিরা উসমানিয়া শাসকদের সিজার বলেছে। পাশাপাশি তাদের শাসনকে ‘রোমান সাম্রাজ্য’ হিসাবে উল্লেখ করেছে," বেয়ার লিখেছেন। "কনস্টান্টিনোপলে উসমানিয় বিজয়ের ভোর দেখা দেওয়ার সাথে সাথেই পশ্চিম ইউরোপীয় কিছু লেখকের কলমেও এমন স্রোত নেমে এসেছিল।" এরপর তিনি আরো বলেন, “পাঁচশত বছর আগে ইউরোপীয়রা যে ভাবনায় মেতে উঠেছিল আজকের দিনে ইউরোপ বা পাশ্চাত্যে সে ভাবনাকে আমরা ভুলে গেছি কেন? উসমানিয়রা ইউরোপের সমান্তরাল ধারায় বিবর্তিত হয়নি; তাদের কাহিনি হল গল্পের সেই অস্বীকৃত অংশ যা পশ্চিম নিজেদের সম্পর্কে বলে।"

মার্ক ডেভিড বেয়ার

এশিয়ার মিষ্টি পানির মধ্য দিয়ে দ্রুত ধাবমান উসমানিয়া বাইচের নৌকার মতোই গতিতে ভরপুর বায়ারের টানটান গদ্য। গতি এবং যুক্তির কষ্টিপাথরে ঘষে ঘষে একপেশে ভাবনার জগতকে বিদ্ধ করছেন তিনি। বদ্ধ পানির পুরানো ঘাটে জমে থাকা শেওলার মতো আমাদের দীর্ঘকালের অনুমানকে এভাবেই দ্বিতীয়বার ভাবনার আবর্তে ফেলতে বাধ্য করেন তিনি। একটি সাম্রাজ্যের ছায়া এক সময়ে গোটা বিশ্ব জুড়ে পড়েছিল। যাকে একসময় বহির্বিশ্বের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনায়ও নেওয়া হতো। সেই উসমানিয়রা আধুনিক বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে কম অন্বেষণ, অনুসন্ধানের অন্যতম ক্ষেত্রও হয়ে উঠেছে। একে "ভুলে যাওয়া দৈত্য" বলে আখ্যা দিয়েছেন এক উসমানিয় ঐতিহাসিক।

আজকের দুনিয়ায় যদি তাদের একান্তভাবেই স্মরণ করা হয় তবে তাদের আক্রমণাত্মক চেহারাই প্রধান হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত তাদের ক্ষয় ঘটেছিল সে কথাই বলা হয়। বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতার জগতে অননুসন্ধিৎসু যোদ্ধা হিসাবে তাদের গণ্য করা হয় এবং তাদের নিয়ে আলোচনাকে এ সব তকমা লাগিয়ে সরাসরি বরখাস্ত করা দেওয়া হয়। তাদের সম্পর্কে বলা হয়, সেকেলে ধাঁচের ভূমি সাম্রাজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল তারা। কিন্তু পরিশেষ ইউরোপীয় বিজ্ঞানের বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্নিশক্তির ক্রমবর্ধমান আন্তঃমহাদেশীয় সমুদ্র শক্তির দাপটের মুখে হার হয়েছিল তাদের। উসমানিয়ার সময়ের গবেষণায় সাম্প্রতিককালে বৃত্তির হার বেড়েছে। এর সুফলে এবং ইস্তাম্বুলের তোপকাপি প্রাসাদের সংরক্ষণাগারে দীর্ঘ শ্রমসাধ্য গবেষণার কল্যাণে বেয়ার দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেন, উসমানিয়দের নিয়ে এমন ভাবনাগুলোর পেছনে ইতিহাসের কোনো শিকড় নেই। এসবই ব্যাপক ভুলের বায়বীয় প্রাসাদের ওপর ভর করে আছে।

বইটির সূচনায় তিনি আরো লিখেছেন, ইউরোপের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অনেক বিকাশেরই অংশ ছিল উসমানিয়ারা। এতকাল এ সব কৃতিত্বের ফুলঝরি কেবল পশ্চিম ইউরোপের ওপরই ঝরেছে।

[ফাইনান্সিয়াল টাইমস অবলম্বেন]

Share if you like

Filter By Topic