Loading...
The Financial Express

ইউক্রেন সংকট কি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পুতিন বন্দনা ছড়াচ্ছে?

| Updated: February 03, 2022 19:58:16


ইউক্রেন সংকট কি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পুতিন বন্দনা ছড়াচ্ছে?

রাশিয়ার  প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মোকাবেলায় কী করতে হবে – তা নিয়ে পশ্চিমা দুনিয়ায় হয়ত বিভক্তি রেখা দেখা দিয়েছে। তবে একটি বিষয়ে আমরা পৃথিবীর মানুষ হয়তো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারি, তাই না? ইউক্রেন সংকট ঘিরে চলমান নাটকে রুশ প্রেসিডেন্ট রয়েছেন খারাপ মানুষের ভূমিকায়!

আসলে তা নয়। বরং সত্যি বলতে কী, পুতিন বন্দনা বা পুতিন কাল্ট হলো আজকের আন্তর্জাতিক রাজনীতির হতাশামূলক ও প্রকাশিত বৈশিষ্ট্যগুলোর অন্যতম। বিশ্বনেতা এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একটি উল্লেখযোগ্য দলের মধ্যে ব্যাপক পুতিন অনুরাগ বিরাজ করছে । বিশ্বজুড়ে রয়েছে পুতিন ফ্যান ক্লাব। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আমেরিকা এবং ইউরোপ সর্বত্রই দেখা মিলবে এমন গোষ্ঠীর।

পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকোভ ২০১৮ সালেই বলেছিলেন, “বর্তমান পৃথিবীতে সিদ্ধান্তগ্রহণে পারঙ্গম এবং সার্বভৌম নেতাদের বিশেষ  চাহিদা রয়েছে . . রাশিয়ার পুতিনকে দিয়ে এর সূচনা হয়েছে।”

১৯৯৯-২০০০ সালে পুতিন রাশিয়ার নেতা হিসেবে প্রথম আবির্ভূত হলেন। সে সময় তাঁর নেতৃত্বে কিছু বৈসাদৃশ্য বিদ্যমান ছিল। প্রযুক্তি-তাত্ত্বিক, বিশেষজ্ঞানে বিশারদ বা টেকনোক্র্যাট বিশ্বের যুগে  শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী হিসেবে তাঁর আর্বিভাব ঘটে। জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলো মার্কেল বলেই বসেন যে পুতিন ১৯ শতকের কলাকৌশলগুলোকে ভিন্ন যুগে প্রয়োগের চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন।

বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রচণ্ড টানাপড়েনের মুখে পড়েছে। অতীতের ধ্বংসস্তূপ মাঝ থেকে উঠে আসা কেউ নন, বরং বিশ্বরাজনীতির ভবিষ্যতকে আগেই দেখতে পেয়েছিলেন তিনি। পুতিনকে ঘিরে এমন ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে। ভক্ত এবং অনুরাগীদের আকৃষ্ট করেছেন রুশ নেতা। তাঁর মমতাহীন এবং ক্রূর আচরণ, সহিংস মনোভাব, “রাজনৈতিক শুদ্ধতা” এবং তাঁর স্বৈরাচারী নেতৃত্বের শৈলী রূপটি এখন প্রশংসায় ভাসছে। রুশ ভাষ্যকার দিমিত্রি ত্রেনিন  গত সপ্তাহে বলেন: “পুতিন হলেন কমিউনিস্ট-পূর্ব যুগের নেতা.. . . তিনি একজন জার।”

 ইউক্রেনের চলমান সংকটের একটি মস্ত বিপদের দিক রয়েছে। এ সংকটে পুতিন যদি বিজয়ী বেশে আবির্ভূত হন, তাহলে তাঁর নেতৃত্বের ঢং বা স্টাইল দুনিয়া জুড়ে আরো বেশি সম্মানীয় হয়ে উঠবে। বিশ্বজুড়ে বাড়বে তাঁর ভক্ত-অনুরক্তদের সংখ্যা । ভূমি জবর দখল, সামরিক হুমকি, মিথ্যা-ছলচাতুরী এবং হত্যা তৎপরতা সমাদৃত হবে বিজয়ের কৌশল হিসেবে।

এরই মধ্যে পুতিন ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ স্বৈরনেতা এবং জনতুষ্টবাদীদের নতুন প্রজন্মের একটি ধারার কাছে অনুকরণীয় আদল বা মডেল বনে গেছেন। পুতিনের প্রশংসায় মুখ খুলতে যেয়ে খানিকটা  লাজ-নম্র ভাব দেখিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সাবেক মার্কিন এই প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ কয়েক সহযোগী এক্ষেত্রে রাখঢাকের বালাই রাখেননি। ২০১৪ সালে ইউক্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার সাথে সংযুক্ত করার পর পুতিনের প্রশংসা করে রুডি গিলিয়ানি (নিউ ইয়র্কের সাবেক মেয়র)।  বলেন, “তিনি (পুতিন) একটি সিদ্ধান্ত নেন এবং তা দ্রুত কার্যকর করেন . . একেই নেতা বলবেন আপনি।” ইউক্রেনের চলমান সংকটের সময়ে ফক্স নিউজের সবচেয়ে প্রভাবশালী ভাষ্যকার টুকার কার্লসন প্রকাশ্যে পুতিনের প্রতি সমর্থন দেন।

হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী এবং ই্উরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে “উদারনৈতিক গণতন্ত্র”এর স্ব-ঘোষিত ধ্বজাধারী ভিক্টর অরবান এই সপ্তাহে পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাবেন। এর আগে অরবান বলেছেন যে “পুতিন নিজ দেশকে আবার মহান করে তুলেছেন” এ কথা ইইউর মেনে নেওয়া উচিত। পুতিনের মতো অরবানও ইউক্রেনের সংখ্যালঘু, এ ক্ষেত্রে জাতিগত হাঙ্গেরিয়দের, স্বার্থের রক্ষক হিসেবে দেখেন নিজেকে।

পশ্চিম ইউরোপে পুতিনের অন্যান্য ভক্ত-অনুরাগীর মধ্যে রয়েছেন ব্রেক্সিটপন্থী নাইজেল ফারাজ এবং ইতালির উগ্র-ডান লিগের নেতা এবং সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনি। মধ্যপ্রাচ্যে পুতিনের সেনা পাঠানোর নিয়ে মন্তব্য করতে যেয়ে নাইজেল ফারাজ বলেন: “সিরিয়ার গোটা ঘটনা নিয়ে যেভাবে তিনি খেলেছেন, তা সত্যিই অসাধারণ।” অন্যদিকে মাত্তিও সালভিনি একবার পুতিনের টি-শার্ট পরে রেড স্কোয়ারে ছবির জন্য পোজ দিয়েছেন।

পুতিন ফ্যান ক্লাবের বিস্তার ঘটেছে এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যেও। ফিলিপাইনের নেতা রদ্রিগো দুতের্তে প্রেসিডেন্ট থাকার সময় ঘাতক দলের বা ডেথ স্কোয়াডের মদদ দিয়েছেন বলে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। দুতার্তের কাছে একবার জানতে চাওয়া হয় যে,  তিনি কোন বিশ্বনেতার সবচেয়ে বেশি প্রশংসা করবেন। উত্তর দুতের্তে বলেন,  “আমার প্রিয় বীর নায়ক হলেন পুতিন।”

আরেকজন স্ব-ঘোষিত লৌহমানব  ইসরায়েলের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু রাশিয়া সফর করেছিলেন পুতিনের সাথে ভূ-রাজনীতি নিয়ে আলোচনার জন্য। ২০১৯ সালের পুনঃ-নির্বাচনী প্রচারে ইসরায়েলি এ নেতার একটি পোস্টার দেখা গেছে। এতে পুতিনের সঙ্গে করমর্দনরত নেতানিয়াহুর ছবি ছাপা হয়েছে। আর নিচে লেখা ছিল “নেতানিয়াহু: নিজের দলের মানুষ।”

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য লৌহমানবদের সঙ্গেও সম্পর্ক রেখেছেন পুতিন। তিনি মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিকে একটি কালাশনিকভ রাইফেল উপহার দেন। সিসির নিরাপত্তা বাহিনী মিশরের রাস্তায় শত শত বিক্ষোভকারীকে হত্যা করেছে। পুতিনের উপহারে মুগ্ধ হয়েছেন সিসি।

সৌদি আরবের যুবরাজ এবং দেশটির কার্যত সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী   মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস)ও পুতিনের আরেক অনুরাগী। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পরই তাঁর কয়েকজন ব্রিটিশ উপদেষ্টার কাছে  পুতিনের ব্যাপক প্রশংসা করেন এমবিএস। এমবিএস বলেন, “তিনি (পুতিন) তাঁকে মুগ্ধ করেছেন। . . পুতিন যা করেছেন তা তাঁর পছন্দ হয়েছে।”

সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার দায়ে অভিযোগের সব তির ছোটে এমবিএসের দিকে। মনে হতে থাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমবিএস হয়ত একঘরে হয়ে যাবেন। এ সময় সৌদি এবং রুশ লৌহমানবদ্বয়ের মধ্যে সহানুভূতি-সম্পর্ক নতুন এক মাত্রা নেয়। পুতিনই তাকে বিশ্ব নেতাদের সংগঠনে স্বাগত জানান। খাশোগির পৈশাচিক খুনের পর অনুষ্ঠিত প্রথম অনুষ্ঠিত  জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে হাসতে হাসতে উচ্চস্বরে সৌদি নেতাকে স্বাগত জানান পুতিন। পুতিন নিজেই পরে আলেক্সি নাভালনিকে হত্যা প্রচেষ্টা অনুমোদনের দায়ে অভিযুক্ত হন।

পুতিন এবং এমবিএসের মধ্যে সেই উষ্ণ উচ্ছ্বসিত হাত মেলানোর ছবি পুতিনের আন্তর্জাতিক ভক্ত-অনুরক্তমণ্ডলী, বন্দনাকারী কিংবা কাল্টের  হৃদয়ে গেঁথে গেছে। রুশ এই নেতার সবচেয়ে বড় স্তাবক দুতের্তে এবং এমবিএস। এ দুজনেই প্রয়োজনে সহিংসতাকে  পথ হিসেবে বেছে নিতে এবং মানবাধিকারকে কাঁচকলা দেখাতে দ্বিধার বিন্দুমাত্র পীড়ন অনুভব করেন না।

এ কারণেই রাশিয়া এবং পশ্চিমের মধ্যে চলমান সংঘাত ইউক্রেনের স্বাধীনতার মতো জরুরি বিষয়ের চেয়েও বেশি কিছু। এ সংঘাতে মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হবে বিশ্ব রাজনীতির সুরও। পুতিন যদি পশ্চিমা গণতন্ত্রকে রুখে দিতে পারেন তবে তাঁর মাস্তানি ঢংয়ের কঠোর  নেতৃত্বই ভবিষ্যৎ বিশ্বে তরঙ্গের মতো বিস্তার লাভ করবে।

[ফাইনান্সিয়াল টাইমস অবলম্বনে সৈয়দ মূসা রেজা]

আরো পড়ুন:

রাশিয়া এবং চীন নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার পরিকল্পনায় মগ্ন

নয়া বিশ্বব্যবস্থার দৌড়ে কে থাকবে এগিয়ে?

 

Share if you like

Filter By Topic