রণাঙ্গনে রুশ সেনাদের তৎপরতা চীনের গণমুক্তি ফৌজের কাছে বিস্ময় হয়ে দেখা দিয়েছে বলেই ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। তাইপেই, তাইওয়ান থেকে ফাইনান্সিয়াল টাইমসের বৃহত্তর চীনের সংবাদদাতা ক্যাথরিন হিল এ কথাই জানান। এর আগে একই দৈনিকে যথাক্রমে মস্কো ব্যুরো প্রধান এবং বেইজিং সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
ইউক্রেনের প্রতিরোধের মুখে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীকে লড়াই চালিয়ে নিতে বেগ পেতে হচ্ছে। চীনের গণমুক্তি ফৌজ (পিএলএ) গভীর মনোযোগ দিয়ে ইউক্রেনের রণাঙ্গনের প্রতি নজর রাখছে।
ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর সামরিক তৎপরতাকে আগ্রাসন হিসেবে কবুল করতে অস্বীকার করেছে বেইজিং। বরং সেখানে রুশ বাহিনীর সমর তৎপরতা বেইজিংয়ের কাছে হয়ে উঠেছে অভিযান। চীনা সেনারা গত প্রায় অর্ধ শতক ধরে সরাসরি যুদ্ধ করেনি। রণাঙ্গনের অভিজ্ঞতাহীন পিএলএ’র কাছে রুশ বাহিনীর ইউক্রেন অভিযান তাজা সামরিক প্রশিক্ষণ হয়ে উঠতে পারে। ১৯৭৯’এ ভিয়েতনামের সাথে সংঘাতের পর পিএলএ আর কোনো যুদ্ধেই জড়িত হয়নি। বেইজিং আশংকা করছে, পিএলএ হয়ত জর্জরিত হয়েছে ‘শান্তি রোগে’ । বাহিনীটির নেই সম্মুখ রণাঙ্গনের অভিজ্ঞতা এবং হয়ত রয়েছে লড়াই উদ্দীপনার ঘাটতি।
‘বিশ্ব জুড়ে পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র’…
কথাটা বলেছে বাংলা ভাষার কবি। সমর-বিদ্যার ক্ষেত্রে পালন করছে চীন। নিজে যুদ্ধ করছে না। কিন্তু লড়াই দেখে রপ্ত করছে রণ-কৌশল। হ্যাঁ এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে গত কয়েক দশক ধরে, চীনা সামরিক পণ্ডিত এবং বিশ্লেষকরা বিশ্বের অন্যান্য স্থানের যুদ্ধ পর্যবেক্ষণ করছে। এ সব লড়াই থেকে প্রয়োজনীয় রণ-শিক্ষা নিচ্ছে। বেইজিংয়ের রণ-শিক্ষার এ কৌশল নিয়ে এক দশক আগে বই প্রকাশিত হয়েছে। ‘চাইনিজ লেসনস ফর আদার পিপল’স ওয়ার’ নামের বিখ্যাত বইটি প্রকাশ করেছে ইউএস আর্মি ওয়ার কলেজ, স্ট্যাট্রেজিক স্টাডিজ ইন্সটিটিউট (এসএসআই)।
ভিন্ন ভূমিতে অন্য দেশের যুদ্ধ পর্যবেক্ষণ করে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষায় সমৃদ্ধ হচ্ছে পিএলএ। এ সব শিক্ষার মধ্যে বিমান অভিযানের গুরুত্ব শিখেছে ১৯৯১’এর পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধে মার্কিন বিমান অভিযান থেকে। ১৯৯৯’এ কসোভো যুদ্ধকালীন মার্কিন নানা অভিযান এবং হামলা দেখিয়ে দেয় কী করে ক্ষেপণাস্ত্র মেরে শত্রুপক্ষের রণ-আদেশ কেন্দ্র এবং রণ-নিয়ন্ত্রণ কক্ষ মাটিতে মিশিয়ে দিতে হয়।
পিএলএ’র বিদেশি যুদ্ধ দেখে শেখার তৎপরতা সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ ইয়ান বার্নস ম্যাককাসলিন বলেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়ার সেনাবাহিনীর সাম্প্রতিক লড়াইগুলো পর্যবেক্ষণ করতে চীনা সামরিক বাহিনী উল্লেখযোগ্য তৎপরতা চালিয়েছে।” বর্তমানে তাইপেয়ের তামকাং বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন তিনি। ম্যাককাসলিন আরো বলেন, “সিরিয়ার লড়াইয়ে রুশ বাহিনী কী অভিজ্ঞতা অর্জন করছে তা ব্যাপক ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে চীন। সে কথা আমাদের জানা আছে। তাই স্বাভাবিক ভাবেই মনে করি ইউক্রেনের দিকেও বেইজিংয়ের সমরবিদদের চোখ-কান খোলা থাকবে।”
অন্যান্য সামরিক বাহিনীর অনুশীলন তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করাকে নিজ প্রশিক্ষণ এবং চর্চার অংশ করে নিয়েছে পিএলএ। পিএলএ’র এ বিষয়ে একটি গবেষণা-পত্রের সহ-লেখকও ছিলেন ম্যাককাসলিন। এ গবেষণা-পত্রে তিনি লিখেছেন, “সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে অনুকরণ করার উদ্দেশ্যে" বাহিনী তৈরির জন্য পিএলএ একটি কর্মসূচিও নিয়েছে।”
রুশ যুদ্ধ দিতে পারে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
রুশ সেনাবাহিনীর সাথে জড়িত লড়াই অন্য যেকোনো যুদ্ধের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিতে পারে বলে ভাবছেন চীনা সমর-বিশারদরা।
চীনের একাডেমি অফ মিলিটারি সায়েন্সের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পিএলএ’র এক অবসরপ্রাপ্ত কর্তা বলেন, “সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সশস্ত্র বাহিনীর আদলেই চীনা সশস্ত্র বাহিনী গঠন করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার কাছ থেকে বেশিরভাগ অস্ত্র সংগ্রহ করছে চীন। এ ছাড়া দেশটির সাথে ঘনিষ্ঠ সামরিক বিনিময়ও করছে চীন।” তিনি আরো বলেন, “চীনের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ অফিসার রুশ একাডেমিগুলোতে সময় কাটিয়েছে। রুশ-চীন সেনারা একইসাথে অনুশীলন করছে এবং একে অপরের কমান্ড এবং নিয়ন্ত্রণ কাঠামো সম্পর্কে শিক্ষা নিচ্ছে। তাই যুদ্ধের ময়দানে রুশ বাহিনীর কর্ম-তৎপরতা শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ায় তা চীনা বাহিনীর জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক।”
এই ঘনিষ্ঠ দহরম-মহরমের সূত্রে ইউক্রেনের মাটিতে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা চীনের কাছে অপ্রত্যাশিত চমক হয়ে দেখা দিতে পারে। ইউক্রেন এবং মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, সেখানে যোগাযোগ ও সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে রুশ স্থল বাহিনী গুরুতর সমস্যার মোকাবেলা করছে বলেই মনে হচ্ছে। জানা গেছে, রুশ সাঁজোয়া বহরের যানবাহনগুলোর জ্বালানি খতম হয়ে গেছে। আরো জানা গেছে, রুশ সেনারা দিকভ্রান্ত হয়ে আটকা পড়েছে। পাশাপাশি, প্যান্তসির বিমান-ধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ট্রাকের মতো রুশ মূল রণ-সরঞ্জামগুলোকে রাস্তায় ফেলে রেখে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে এসব পরিচালনাকারী সেনারা ।
ইউক্রেন যুদ্ধ নিজ ভূমিকা স্পষ্ট করেনি বেইজিং তারপরও দেশটির মাটিতে ঘটে যাওয়া এ সব ঘটনাকে সম্ভাব্য মাথাব্যথা বলে হিসাব কষছে চীন। গত ১৫ বছর ধরে রুশ বাহিনী বিশ্বে নানা সংঘাতে জড়িয়েছে। যেমন ২০০৮’এ জর্জিয়ার যুদ্ধ, ২০১৪’তে ক্রিমিয়ায় হামলা এবং একই বছর সিরিয়ার লড়াই- এ সব যুদ্ধকে কেন্দ্র করে এ ধারণা সৃষ্টি হয় যে রুশ বাহিনী খুবই সংগঠিত। এমনকি রাশিয়াকে উদাহরণ হিসেবে নিয়ে চীন নিজ সামরিক কাঠামোর কিছু অংশকে রুশ আদলেও গড়ে তোলে। ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং চীনা সামরিক সংস্কার শুরু করেন। বিশাল এই তৎপরতার সর্বশেষ পর্বের অধীনে তিনি দেশটিতে কৌশলগত সহায়তা বাহিনী তৈরি করেন। মহাকাশ, সাইবার এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধের দায়িত্ব বর্তায় এ নবগঠিত বাহিনীর ওপর। চীনা সেনাবাহিনীর অন্যান্য শাখাকে চলাফেরা এবং যোগাযোগ সংক্রান্ত সহায়তার দায়িত্ব দেওয়া হয় কৌশলগত বাহিনীকেই।
পিএলএ কীভাবে রাশিয়া থেকে শিক্ষা নিচ্ছে সে বিষয়ে একটি গবেষণাপত্র লিখেছেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জেনারেল মন্দিপ সিং। গবেষণাপত্রটিতে বলা হয়েছে, “রুশ আদলে অনুপ্রাণিত হয়ে মনে হচ্ছে পিএলএ’র কৌশলগত বাহিনীকে প্রতিষ্ঠা করা হয়।” তিনি আরো লেখেন, “চীনা সামরিক কর্তা এবং কৌশলবিদরা ‘নতুন প্রজন্মের যুদ্ধ’ নিয়ে রুশ সমর-বিদ্যালয়গুলোতে অধ্যয়ন অব্যাহত রেখেছেন। তারা রুশ কৌশলকে মূল যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার নিয়ামক হিসেবেও চিহ্নিত করেছেন।”
শীর্ষ সামরিক নেতার হাতে চূড়ান্ত হুকুম দেওয়ার ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার যে উদাহরণ পুতিন সৃষ্টি করেন তাও অনুসরণ করেন প্রেসিডেন্ট শি।
যুদ্ধক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত হুকুম কাঠামো গড়ে তোলার ঝুঁকিকেই তুলে ধরেছে ইউক্রেনে রুশ স্থল বাহিনীর যোগাযোগ সংক্রান্ত সমস্যাগুলো। এতে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হলে সেনারা এক অসহায় পরিস্থিতিতে পড়তে পারে। যদিও পিএলএ নিচুস্তরের পদগুলোতে আরো হুকুম-কর্তৃত্ব দেওয়ার বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। এ সত্ত্বেও বিশ্লেষকরা দেখতে পেয়েছেন, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং আনুগত্যকে প্রাধান্য দিচ্ছে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি। এ নিয়ে পার্টির উদ্বেগের ফলে হুকুম-কর্তৃত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনো আসেনি। চীনের সামরিক বিষয় নিয়ে গবেষণাপত্রের লেখক আরো বলেন, “ইউক্রেনের সামরিক অভিযান পর্যবেক্ষণ করার অত্যাবশ্যকতা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত অভিযানের সাফল্য বা ব্যর্থতার উপর ভিত্তি করেই সবকিছু বিচার করা হবে।”
