Loading...

ইউক্রেইনের লড়াইয়ে কাঁধ মেলালেন বিদেশি নাগরিকরা

| Updated: March 06, 2022 16:16:02


অস্ত্র হাতে পাওয়ার পর প্রশিক্ষণে ইউক্রেইনিয়ান টেরিটোরিয়াল ডিফেন্স ফোর্স। ছবি: রয়টার্স অস্ত্র হাতে পাওয়ার পর প্রশিক্ষণে ইউক্রেইনিয়ান টেরিটোরিয়াল ডিফেন্স ফোর্স। ছবি: রয়টার্স

পিচঢালা ধূসর একটি সড়ক পোল্যান্ডে গিয়ে মিশেছে ইউক্রেইনের শেহেনি সীমান্তে। গত এক সপ্তাহ ধরে এই পথেই দেখা গেছে দেশটি ছেড়ে যাওয়ার চেষ্টায় ঘর ছাড়া মানুষের ৩০ মাইল দীর্ঘ সারি। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য ইউক্রেইনে থেকে যাওয়া পরিবারের সদস্য আর বন্ধু-স্বজনদের প্রায়ই দেখা গেছে চোখের জলে বিদায় জানাতে।   

সিএনএনের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধের সপ্তম দিন বুধবার এই সড়কে ছিল ভিন্ন এক চিত্র। ভারী ব্যাগ আর সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে পোল্যান্ড থেকে দল বেঁধে ইউক্রেইনে ঢুকছে তরুণরা।

ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ‘বিশ্বের নাগরিক’ হিসেবে ‘রাশিয়ার যুদ্ধাপরাধীদের’ বিরুদ্ধে লড়াইয়ের যে আহ্বান জানিয়েছেন তাতে সাড়া দিয়েছেন এই যুবকরা।

তাদেরই একজন ইউক্রেইনীয় বংশোদ্ভূত নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা ভাসিক ডিডাইক। মাথায় কমলা রঙের টুপি পরা ২৬ বছর বয়সী এই যুবক পেশায় ছুতোর।

ইউক্রেইনের শেহেনি সীমান্তে সিএনএনকে তিনি বলেন, “এটা আমাদের মাতৃভূমি। আমেরিকায় আয়েশী জীবনে থেকে, এখানে যা ঘটছে, সেটা বসে বসে দেখতে পারি না।”

ডিডাইকের সঙ্গে রয়েছে তার বন্ধু ইগর হারমাই। নিজ দেশে ঢোকার আগে নিউ ইয়র্ক থেকে ২৪ ঘণ্টার যাত্রা শেষে পোল্যান্ডে পৌঁছেছেন। তার পিঠে ছিল ব্যাকপ্যাক, হাতে চাকা লাগানো স্যুটকেস।

হারমাইয়ের কোনো সামরিক প্রশিক্ষণ নেই। তার বাবা-মাও ইউক্রেইনে বাস করছে না। তিনি যুদ্ধে অংশ নিচ্ছেন শুনে ফোন করে তারা কান্নাকাটি করেছেন।

তিনি বলেন, “গত চার বছরে আমি ইউক্রেইনে আসিনি… কিন্তু এটা ছাড়া কিছু করারও নেই। দেশের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমাকে আসতে হয়েছে।”

গত সপ্তাহে ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযান শুরুর পর থেকে আতঙ্কে আছে বিশ্ববাসী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে যা হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় স্থল যুদ্ধ।

ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির প্রতিরোধ কেবল রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করেনি, বিদেশি স্বেচ্ছাসেবক এবং প্রবাসী ইউক্রেইনীয়দেরও লড়াইয়ে অনুপ্রাণিত করেছে।

রোববার ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, “এটা কেবল ইউক্রেইনে রাশিয়ার আগ্রাসন নয়, এটা ইউরোপের বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধের সূচনা।

“এই যুদ্ধ ইউরোপীয় কাঠামো, গণতন্ত্র, মৌলিক মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন, নীতিমালা এবং শান্তিপূর্ণ সহবস্থানের বিরুদ্ধে।”

বিভিন্ন দেশে ইউক্রেইনীয় দূতাবাসগুলো বিদেশি যোদ্ধাদের সংগ্রহের কাজে সহায়তা করছে।

এছাড়া এক সময় বিদেশি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার বিরোধিতা করলেও পশ্চিমা সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ ইউক্রেন যুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়া নাগরিকদের সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছেন।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিজ ট্রাস রোববার বিবিসিকে বলেন, “লোকজন যদি এই লড়াইয়ে সহায়তা করতে চায়, আমি তাদের সে কাজে সমর্থন দেব।”

ইউক্রেইনে নিজ দেশের নাগরিকদের যুদ্ধের সম্মতি দেওয়া হবে কী না জানতে চাইলে ফরাসি সরকার সিএনএনকে বলেছে, “ইউক্রেইন একটি যুদ্ধক্ষেত্র, ভ্রমণ পরামর্শে যা রেড জোন শ্রেণিভুক্ত।

“নিয়মিত এটা হালনাগাদ করা হয় এবং এই লিঙ্কে তা পাওয়া যাবে (ট্র্যাভেল অ্যাডভাইস)। এ জন্য আমরা ইউক্রেইনে যে কোনো ধরনের ভ্রমণে বিরত থাকার পরামর্শ দেই।”

এ বিষয়ে বুধবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ের সময় জানতে চাওয়া হলে অবশ্য সরাসরি তার উত্তর দেননি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন।

আমেরিকার বিদেশি যোদ্ধাদের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন যুক্তরাষ্ট্র ‘স্পষ্ট করে’ বলে দিয়েছে, “আমেরিকানদের মধ্যে যারা সেখানে ভ্রমণ করার কথা ভেবেছেন, তারা যেন না যায়।”  

আমেরিকানরা যদি ইউক্রেনকে সহায়তা করতে চায়, “সেটা করার অনেক উপায় আছে। এসবের মধ্যে মানবিক সহায়তা দেওয়া এনজিওগুলোকে সহযোগিতা করা যেতে পারে।

 “এছাড়া ইউক্রেইনের পক্ষে যারা কাজ করার চেষ্টা করছেন সেই গ্রুপগুলোকে প্রয়োজনীয় রসদ যুগিয়ে সহায়তা করতে পারেন।”

বৃহস্পতিবার জেলেনস্কি জানান, ‘আমাদের জীবন এবং স্বাধীনতা রক্ষায় এবং সকলের জন্য’  প্রথম ধাপে ১৬ হাজার বিদেশি যোদ্ধা ইউক্রেইনে আসার বন্দোবস্ত করছেন।

অবশ্য এই সংখ্যার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সিএনএন।

ইউরোপের ওপর আগ্রাসন

ইউক্রেইনের শেহেনি থেকে ১২শ মাইলেরও বেশি দূরে ব্রিটেনের মিল্টন কেইনেস শহরের বাসিন্দা জ্যাকে ডেল জানান, ইউক্রেইন যুদ্ধে বিদেশিদের যোগদানের আহ্বান তাকে অনুপ্রাণিত করেছে।

ব্রিটিশ এই নির্মাতা জানান, শুক্রবার তিনি পোল্যান্ডের উদ্দেশ্য বিমানের টিকেট কাটেন। শনিবার বিকালের মধ্যেই তিনি ইউক্রেইনে ঢুকে পরার লক্ষ্য ঠিক করেছেন।

“যখন তার (জেলেনস্কির) আহ্বান শুনেছি… এটা আমাকে ভাবিয়েছে যে, তার সাহায্য দরকার।”

২৯ বছর বয়সী এই যুবক বলেন, “আমি মনে করি, জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ। আমার বান্ধবীও তাই মনে করে।

“এতে সে অবশ্যই মর্মাহত হয়েছে,যে কেউই তা করবে, কিন্তু এতে তার সমর্থন রয়েছে, কারণ সে দেখছে আমি সাহায্য করতে চাই।”

এর আগে ২০১৫ সালে সিরিয়ার আইএসআ ইএসের বিরুদ্ধে কুর্দিশ মিলিশিয়া গ্রুপ, পিপলস প্রোকেটশন ইউনিট কিংবা ওয়াইপিজিতে যোগ দিতে চেয়েছিলেন জ্যাকে ডেল।

কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের সতর্কতার কারণে সেই সিদ্ধান্ত থেকে তাকে সরে আসতে হয়।

এবার তিনি ইউক্রেইন যুদ্ধে যোগ দিয়ে দেশে ফেরার সময় সম্ভাব্য আইনি সমস্যা নিয়ে চিন্তিত নন। ডেল বলেন,“আমি এটা মোকাবেলা করতে চাই।”

পোল্যান্ডে ভ্রমণের সময় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছিলেন, ইউক্রেইন যুদ্ধে অংশ নিতে ইচ্ছুক স্বেচ্ছাসেবীদের সিদ্ধান্তকে যুক্তরাজ্য ‘সক্রিয়ভাবে’ সমর্থন করে না।

“আমি বুঝতে পারছি, লোকজন কেন এটা করতে চায়। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংঘাতের বিষয়ে আমাদের দেশে আইন আছে এবং বিষয়টি কীভাবে মোকাবেলা করতে হবে সে বিষয়েও।”

ব্রিটিশ বাহিনীর সাবেক পদাতিক সৈনিক ৩৬ বছর বয়সী পিটার হার্স্টের সঙ্গে ইউক্রেইনে যাচ্ছেন ডেল। ২০১১ সালে চাকরি ছাড়ার আগে তিনি আফগানিস্তানে গিয়েছিলেন।

পাঁচ সন্তানের জনক পিটার ব্রিটেনের পন্টেফ্র্যাক্ট শহরের বাসিন্দা। কাছাকাছি একটি শহরে সেনা সরঞ্জাম সরবরাহের দোকান থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নেওয়ার সময় ভিডিও কলে তিনি সিএনএন এর সঙ্গে কথা বলেন।

পিটার জানান, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং স্বাধীনতা রক্ষায় লড়াই করতে চান তিনি।

“এটা মনে হচ্ছে ইউরোপের ওপর আক্রমণ। আপনি যদি সেখানে (ইউক্রেনে) যুদ্ধ থামাতে সাহায্য না করেন, তাহলে এটা সম্ভবত ছড়িয়ে পড়বে।”

ইউক্রেনে ব্রিটিশ চিকিৎসা সরবরাহ এবং সামরিক সহায়তা দিতে গড়ে ওঠা একটি ফেসবুক গ্রুপে এ সপ্তাহেই পরিচিত হন হার্স্ট ও ডেল।

ইউক্রেনীয় দূতাবাসের একটি তথ্য প্যাকে গ্রুপটিকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যারা পোল্যান্ডে সামরিক পোশাক এবং ভেস্ট সরবরাহ করবে।

তবে ইউক্রেইনে বিদেশিদের যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তকে সবাই সমর্থন করছে না।

উগ্রপন্থি তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ‘সাইট ইন্টেলিজেন্স’ গ্রুপ ‘আজভ’ এর মতো সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে সতর্ক করেছে। ‘আজভ’ একটি আধাসামরিক গোষ্ঠী, যারা লোগো হিসেবে ব্যবহার করে নাৎসি জার্মানির ব্যবহর করা ‘উলফসঅ্য্যাঞ্জেল’ প্রতীক।

সাইট ইন্টেলিজেন্সের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, “ইউক্রেনে রাশিয়ার সাম্প্রতিক হামলার পর অনলাইনে অতি-ডানপন্থী সম্প্রদায়গুলো অনলাইনে আজভ  এর মতো গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগ দিয়েছে। ইউক্রেইনের পক্ষে তহবিল সংগ্রহ ও তাদের সঙ্গে লড়াই করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছে।”

ব্রিটিশ সরকারও সামরিক প্রশিক্ষণ ছাড়া কাউকে যুদ্ধে না যাওয়ার জন্য বলেছে।

Share if you like

Filter By Topic