ইউক্রেইন প্রবাসী ব্যবসায়ী মাহবুব আলম তিন দিন আগেও ছিলেন দেশে, উদ্বেগ নিয়েই তাকে ফিরতে হয়েছে কিয়েভে। তার মত হাজার দেড়েক বাংলাদেশি এখন পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায় তা বোঝার চেষ্টা করছেন। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
উত্তেজনার পারদ উঠতে শুরু করেছিল ডিসেম্বর থেকেই। পশ্চিমা দেশগুলো বলে আসছিল, ইউক্রেইনে আগ্রাসন চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে রাশিয়া। উদ্বেগ শুরু হয়েছিল তখন থেকেই।
সোমবার ইউক্রেইনের পূর্বাঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা দুটি অঞ্চলকে ‘স্বাধীন’ রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়ে ‘শান্তি রক্ষার’ নামে সেখানে সেনা পাঠিয়েছে রাশিয়া। আর এ ঘটনাকে আগ্রাসনের সূচনা হিসেবে দেখছে পশ্চিমা দেশগুলো, রাশিয়ার ওপর জারি করা হচ্ছে একের পর এক অবরোধ।
যুদ্ধ বাঁধার শঙ্কায় বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে ইউক্রেইন থেকে তাদের নাগরিকদের সরিয়ে নিতে শুরু করেছে, বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারতও সেখানে উড়োজাহাজ পাঠিয়েছে নাগরিকদের ফিরিয়ে আনার জন্য।
সোয়া ৪ কোটি জনসংখ্যার দেশ ইউক্রেইনে দেড় হাজারের মত বাংলাদেশির বসবাস। কেউ কেউ ব্যবসা করেন, অনেকে গেছেন পড়তে। রাজধানী কিয়েভের বাসিন্দা মাহবুব আলমের সঙ্গে মঙ্গলবার টোলিফোনে কথা হয় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
পেশায় ব্যবসায়ী মাহবুব ১৯৮২ সাল থেকে ইউক্রেইনে বসবাস করছেন। সরকারি শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। এখন ইউক্রেইনের নাগরিক।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “একটা কাজে আমি দেশে গিয়েছিলাম। গতকাল (সোমবার) বিকেলে কিয়েভ ফিরেছি। বাংলাদেশে থাকার সময় মিডিয়ায় নানা খবর দেখে বেশ দুঃশ্চিন্তায় ছিলাম। এখানে চোখের দেখায় সব মোটামুটি স্বাভাবিক বলে মনে হয়, গণপরিবহনও চলছে। তবে সবার মধ্যে এটা নিয়ে আলোচনা চলছে, দুশ্চিন্তা আছে।”
কিয়েভে মাহবুবের যে অফিস আছে, সেখানেও এখন সবার আলোচনার বিষয় রাশিয়ার মতিগতি।
“রাশিয়া ইউক্রেইনের দুটো অঞ্চলকে স্বাধীনতার স্বীকৃতি দিয়ে ফেলেছে। স্বাভাবিকভাবেই মানুষ এটা নিয়ে চিন্তিত। ইউক্রেইন সীমান্তে তো আগে থেকেই রাশিয়ার সেনারা ছিল। এখন পিস মিশনের নামে আরো সেনা ঢোকানো হচ্ছে। দেখা যাক রাশিয়া কতদূর এগোয়,” বলেন মাহবুব।
বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত যে দুটি এলাকাকে রাশিয়া স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছে, সেই লুহানস্ক ও দোনেৎস্ক রুশ সীমান্ত লাগোয়া ইউক্রেইনের দুটি ডিভিশন বা বিভাগ। ২০১৪ সালে রাশিয়া যখন ইউক্রেইনের কাছ থেকে ক্রিমিয়া দখল করে নিল, তখন থেকেই এ দুটো বিভাগে বিদ্রোহীদের ইন্ধন দিয়ে যুদ্ধ বাধিয়ে রেখেছে মস্কো।
মাহবুব বলেন, “ডিভিশন দুটোর একটা অংশ বিদ্রোহীরা দখল করে আছে এবং একটা অংশ ইউক্রেইন কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখন ইউক্রেইন কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকা অংশ তারা দখলের চেষ্টা করবে কিনা- সেটা একটা প্রশ্ন।
‘‘যদি দখল করার চেষ্টা করে তখন ইউক্রেইন কী সিদ্ধান্তে নেবে, কী করবে, পাল্টা জবাব দেবে কিনা, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেইন এ ব্যাপারে পুরোপুরি পশ্চিমের ওপর নির্ভরশীল। এখন ওয়েস্ট নিজেদের প্রতিশ্রুতি কতটুকু রাখবে সেটাও দেখার বিষয়।”
তিনি জানান, ইউক্রেইনে ঠিক কতজন বাংলাদেশি আছেন, তার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে সংখ্যাটা এক থেকে দেড় হাজারের মধ্যে হবে বরে তার ধারণা।
সবচেয়ে বেশি অনিশ্চিয়তার মধ্যে রয়েছেন দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক এবং কাছাকাছি এলাকায় অবস্থানরত বিদেশিরা। তবে ওই দুটি এলাকায় কোনো বাংলাদেশি আছেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন মাহবুব।
“‘২০১৪ সালের যুদ্ধের পর ওই দুই অঞ্চলে এখন আর তেমন বাংলাদেশি থাকেন না বলেই আমি জানি। লুহানস্কের মেডিকেল ইন্সটিটিউটে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি পড়তেন, দোনেৎস্কেও ছিলেন। ওই যুদ্ধের পর অধিকাংশ বাঙালিই চলে যান। তারা এখন কিয়েভ, ওডেসাসহ অন্যান্য শহরে ট্রান্সফার হয়ে গেছেন।”
মাহবুব বলছেন, এ মুহূর্তে লুহানস্ক বা দোনেৎস্কে বাংলাদেশি কেউ থেকে থাকলেও কিয়েভে বাংলাদেশের অনারারি কনস্যুলেটের সঙ্গে হয়ত যোগাযোগ করেননি। যোগাযোগ করলে তারাও জানতে পারতেন।
“এখানে তো বাংলাদেশের কোনো দূতাবাস নেই, একটা অনারারি কনস্যুলেট আছে। তবে পোল্যান্ডে বাংলাদেশের দূতাবাস থেকে রাষ্ট্রদূত সুলতানা লায়লা হোসেন নিয়মিত আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। উনার সঙ্গে আমারও ব্যক্তিগতভাবে কথা হচ্ছে। ফার্স্ট সেক্রেটারি অনির্বাণ নিয়োগীও খুব অ্যাক্টিভ। তিনিও নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।”
উদ্বেগের এই সময়টায় নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখতে একটি সোশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছেন প্রবাসীরা, যাতে জরুরি খবরগুলো দ্রুত সবাইকে জানানো যায়।
কিয়েভে পোল্যান্ডের দূতাবাসও বিদেশিদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে বলে জানান মাহবুব।
“পোলিশ দূতাবাস আমাদের জানিয়েছে, পোলিশ অথরিটি এরকম একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদি সেরকম জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে ইউক্রেইনে যারা বিদেশি আছেন, তাদের জন্য হয়ত সহজে পোল্যান্ড চলে যাওয়ার একটা ব্যবস্থা করা হবে। এমন সিদ্ধান্ত তারা নিচ্ছেন বলে আমাদের জানানো হয়েছে।”
পোল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সুলতানা লায়লা হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ইউক্রেনে বসবাসরত প্রায় পাঁচশ বাংলাদেশি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং তারা চলে যেতে চাইলে তাদের কী ধরনের সহায়তা দেওয়া যাবে, তা নিয়ে তারা ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করেছেন।
পোল্যান্ড সরকার ইউক্রেইনের সাথে সীমান্ত খুলে দিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেছেন, “পোল্যান্ড সরকার এক ব্রিফিংয়ে আমাদের জানিয়েছে, ইউক্রেইনে থাকা তৃতীয় দেশের নাগরিকরা সেদেশ ছাড়তে চাইলে, পোল্যান্ড ১৫ দিনের জন্য তাদের ট্রানজিটে থাকার অনুমতি দেবে।”
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যে দেশগুলো হয়েছে, তার মধ্যে আয়তনের দিক দিয়ে রাশিয়ার পরই ইউক্রেইনের অবস্থান।ইউক্রেইনের বাসিন্দাদের অনেকেরই আত্মীয়-স্বজন রাশিয়ায় থাকেন।
মাহবুব আলম বলেন, ‘‘রাশিয়ার সঙ্গে এরকম একটা ঘটনা, এত শত্রুতামূলক পরিস্থিতি যে তৈরি হতে পারে, এটা কিন্তু আমরা কোনোদিন কল্পনাও করিনি। এটা অনেকটা দুঃস্বপ্নের মত।”
