Loading...

ইউক্রেইন সংকট কি যুদ্ধেই গড়াবে?

| Updated: February 12, 2022 12:33:08


ইউক্রেইন সংকট কি যুদ্ধেই গড়াবে?

এক দিকে রাশিয়া, অন্যদিকে পুরো পশ্চিম। মাঝখানে ইউক্রেইনকে রেখে চলছে বাগযুদ্ধ। শুধু কথার খেলা নয়, রীতিমত সমরসজ্জা চলছে। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

নানা কায়দায় নানা ফোরামে কূটনীতিক তৎপরতা চলছে, যুদ্ধ লাগলে পরিণতি কতটা ভয়াবহ হবে, সেই হুঁশিয়ারি দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু উত্তেজনার পারদ নামছে না।

গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহের চাকা এখন দ্রুত গড়াতে শুরু করেছে। ইউক্রেইনের দক্ষিণের ওই দুটি সাগরে নৌমহড়ার নামে বিপুল সমর শক্তি জড়ো করেছে রাশিয়া। দুই দেশই বলেছে, সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে ফরাসি ও জার্মান কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের আলোচনায় কোনো অগ্রগতি হয়নি।

পরিস্থিতি ‘খুব দ্রুত খারাপ হতে পারে’ বলে হুঁশিয়ার করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। নিজের দেশের নাগরিকদের তিনি ইউক্রেইন থেকে সরে পড়তে বলেছেন। নেদারল্যান্ডস, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াও তাদের নাগরিকদের একই নির্দেশ দিয়েছে।

ইউক্রেইন সীমান্তে রাশিয়া আরও সৈন্য পাঠিয়েছে এবং যে কোনও সময় আগ্রাসন চালাতে পারে বলে সতর্ক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন। এর বিপরীতে পূর্ব ইউরোপে নেটোর সামরিক উপস্থিতি শক্তিশালী করতে পোল্যান্ডে পৌঁছেছে মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান।

প্রেসিডেন্ট বাইডেন অবশ্য বলেছেন, ইউক্রেইনে তিনি সৈন্য পাঠাবেন না, কারণ তার ভাষায়, আমেরিকা এবং রাশিয়া একে অপরের দিকে গুলি শুরু করলে তা হবে ‘বিশ্বযুদ্ধ’।

কিন্তু রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আসলে ইউক্রেইনে কী নিয়ে কী করতে চাইছেন-  সে প্রশ্নের উত্তর মিলছে না।

কূটনেতিক পথে কি সঙ্কট এড়ানো সম্ভব হবে? নাকি যুদ্ধ লেগেই যাবে? কিংবা এরই মধ্যে কি শুরু হয়ে গেছে?

অচলাবস্থা

২০১৪ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়া উপদ্বীপকে দখল করে নেওয়ার পর থেকে কৃষ্ণ সাগর ও আজভ সাগরে রাশিয়া ও ইউক্রেইনের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। আট বছর পর ফের তা তুঙ্গে উঠেছে।

নেটো সামরিক জোটের সদস্য হতে চায় ইউক্রেইন, যুক্তরাষ্ট্র আর ইউরোপীয় মিত্ররাও মোটামুটি রাজি। কিন্তু রাশিয়ার তাতে ঘোর আপত্তি।

গতবছরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র খবর দেয়, ইউক্রেইন সীমান্তে লাখ খানেক সেনা সমাবেশ ঘটিয়েছে রাশিয়া; যে কোনো সময় আগ্রাসন চালানোই তাদের উদ্দেশ্য। তখন থেকেই এবারের উত্তেজনার শুরু।

রাশিয়া অবশ্য দাবি করে আসছে, ইউক্রেইনে অভিযান চালানোর কোনো ইচ্ছে তাদের নেই। কিন্তু সীমান্তে রুশ সমরশক্তি বৃদ্ধির খবর উদ্বেগ বাড়িয়েই চলেছে।

উত্তেজনা প্রশমনে রাশিয়া সফরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করে এসেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। দুদিন আগেই তিনি বলেছেন, যুদ্ধ এড়ানো এখনও সম্ভব। সেই চেষ্টাতেই বৃস্পতিবার বার্লিনে ফরাসি ও জার্মান কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলের রাশিয়া আর ইউক্রেইনের প্রতিনিধিরা।

কিন্তু গভীর রাতে রাশিয়ার দূত দিমিত্রি কোজাক ব্রিফিংয়ে বলেছেন, ডনবাসে যুদ্ধ থামানোর লক্ষ্যে ২০১৫ সালে হওয়া চুক্তির বিষয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেইনের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার কারণে দুই পক্ষ একমত হতে পারেনি।

আর ইউক্রেইনের দূত আন্দ্রেই ইয়েরমাক বলেছেন, দুই পক্ষ কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারলেও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে।

ডনবাস নামে পরিচিত উইক্রেইনের বিচ্ছিন্ন হতে চাওয়া দুটি অঞ্চল দোনেৎস্ক ও লুহানস্কে আপাত যুদ্ধবিরতি চললেও সেখানে যে কোনো সময় বড় ধরনের যুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইউক্রেইনের ভাষ্য, ২০১৪ সাল থেকে ওই অঞ্চলে যুদ্ধে প্রায় ১৫ হাজার মানুষের প্রাণ গেছে।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পূর্ব ইউরোপের আর কিছু কমিউনিস্ট দেশ এবং সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের মতো ইউক্রেইনে দুটি রাজনৈতিক ধারা বেশ স্পষ্ট। একটি অংশ চায়- পশ্চিম ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দিতে এবং নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য নেটো সামরিক জোটের সদস্য হতে।

অপর অংশ রুশ প্রভাব বলয়ে থাকার পক্ষপাতী। কারণ ইউক্রেইনের জনসংখ্যার বিরাট অংশ রুশ ভাষাভাষী, তারা জাতিগতভাবেও রুশ। রাশিয়ার সঙ্গে তাদের রয়েছে ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক যোগাযোগ।

রাশিয়া বহুদিন ধরেই চেষ্টা করছে, ইউক্রেইন যাতে কোনভাবেই ইউরোপীয় ইউনিয়নে না যায়। তাদের আরও আপত্তি নেটো জোট নিয়ে। যদিও ইউক্রেইন এখনো নেটো জোটের সদস্য নয়। কিন্তু পূর্ব ইউরোপের আরও অনেক সাবেক কমিউনিস্ট দেশের মতো প্রতিবেশী দেশটি সেই পথে চলেছে বলে মনে করছে রাশিয়া।

সমরসজ্জা

উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা-আলোচনার মধ্যেই বেলারুশের সঙ্গে ১০ দিনের যৌথ সামরিক মহড়ায় নেমেছে রাশিয়া। তার প্রস্তুতিতে রুশ বাহিনী আজভ সাগর পুরোপুরি অবরোধ করে রেখেছে এবং কৃষ্ণসাগরে প্রবেশ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ইউক্রেইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মইত্রো কুলেবা।

মহড়া চলাকালে ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাগুলির প্রশিক্ষণ হবে জানিয়ে ওই উপকূলের সবাইকে প্রশিক্ষণ এলাকা থেকে দূরে থাকার জন্য সতর্ক করেছে রাশিয়া। আর ইউক্রেইনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, “যে বিশাল এলাকাজুড়ে মহড়ার আয়োজন করা হয়েছে, তা নজিরবিহীন। এতে উভয় সাগরেই জাহাজ চলাচল অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

আর ইউক্রেইনের মার্কিন দূতাবাস এক টুইটে বলেছে, “রাশিয়া কৃষ্ণ সাগর ও আজভ সাগরে সামরিক মহড়ার অজুহাতে ইউক্রেইনের সামুদ্রিক সার্বভৌমত্ব ও জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা সীমিত করে তাদের অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য জাহাজ চলাচলে বাধা দিয়েছে।”

রাশিয়ার মহড়ার দিনেই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের দ্রুত ইউক্রেইনকে থেকে সরে যেতে বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তিনি বলেছেন, পরিস্থিতি ‘খুব দ্রুত খারাপ হতে পারে’। আর মস্কো যদি ইউক্রেইন আক্রমণ করে, আমেরিকানদের উদ্ধারে তিনি সেনা পাঠাতে পারবেন না।

মার্কিন টেলিভিশন চ্যানেল এনবিসি নিউজকে বাইডেন বলেন, “আমেরিকানদের এখনই চলে যাওয়া উচিত। আমরা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সেনাবাহিনীর সঙ্গে মোকাবিলা করছি। এটি একটি খুব ভিন্ন পরিস্থিতি এবং পরিস্থিতি শিগগিরই খারাপ হয়ে যেতে পারে।”

যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক মাক্সার টেকনোলজিসের প্রকাশিত স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, ইউক্রেইনের কাছে বেশ কয়েকটি এলাকায় নতুন করে সেনা মোতায়েন করেছে রাশিয়া।

মাক্সার বলেছে, ক্রিমিয়ার সিমফারোপোল শহরের উত্তরে অকতায়েবরোস্কয়ে বিমানঘাঁটিতে বিপুলসংখ্যক নতুন সেনা ও সরঞ্জাম মোতায়েন হতে দেখা গেছে। সেখানে ৫০০ সেনা তাঁবুসহ শত শত গাড়িও উপস্থিতিও দেখা গেছে।

আর বেলারুশের যে জায়গায় রাশিয়া যৌথ মহড়া চালাচ্ছে, সেখানেও নতুন সেনা ও সামরিক যানের গতিবিধি দেখা গেছে। ইউক্রেইন সীমান্ত থেকে ২৫ কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে গোমেলের কাছে জিয়াব্রোভকা বিমানঘাঁটিতে হেলিকপ্টারের আনাগোনাও বেড়েছে।

এক বিবৃতিতে মাক্সার বলেছে, পশ্চিম রাশিয়ায় কুর্সক প্রশিক্ষণ এলাকায় সম্প্রতি বিপুল সংখ্যক রুশ সেনা পৌঁছেছে। ওই এলাকাটি ইউক্রেইন সীমান্ত থেকে ১১০ কিলোমিটার দূরে।

তবে এখন পর্যন্ত কতসংখ্যক সেনা মোতায়েন হয়েছে, তা প্রকাশ করেনি রাশিয়া। তারা বলেছে, নিজ ভূখণ্ডে যেখানে ঠিক মনে হবে সেখানেই সেনা মোতায়েনের অধিকার রাশিয়ার আছে।

এই পরিস্থিতিতে শুক্রবার অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন বলেছেন, “আমরা আগে যেমনটি বলেছি… যে কোনো সময় আগ্রাসন শুরু হয়ে যেতে পারে। আর স্পষ্ট করে বললে, বেইজিংয়ে শীতকালীন অলিম্পিকস চলার এই সময়েও তা হতে পারে।”

চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে অলিম্পিকস এর আসর চলবে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এই আয়োজনের উদ্বোধনী দিনে গত সপ্তাহে একে অপরকে সমর্থন দিয়েছে দুই মিত্র চীন ও রাশিয়া। পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে একাট্টা থাকার অঙ্গীকারও তারা করেছে।

সমরসজ্জায় অন্য পক্ষও থেমে নেই। ইউক্রেইন প্রায় দুই লাখ সৈন্যকে প্রস্তুত করেছে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার চালান তাদের হাতে পৌঁছেছে।

আশপাশের মিত্র দেশগুলোতে গত কিছুদিন ধরেই শক্তি বাড়াচ্ছে নেটো। পোল্যান্ডের লাস্ক শহরের বিমানঘাঁটিতে পৌঁছেছে মার্কিন এফ-১৫ ফাইটার জেট।  তবে ওই বহরে কতগুলো ফাইটার আছে তা প্রকাশ করা হয়নি।

ইউক্রেইন-রাশিয়া উত্তেজনায় ইউরোপ গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা সংকটের মুখোমুখি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন।

বৃহস্পতিবার ব্রাসেলসে এক সংবাদ সম্মেলনে নেটো মহাসচিব ইয়েন্স স্টলটেনবার্গকে সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী জনসন বলেন, “সত্যিকার অর্থে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এখনও ইউক্রেইনে হামলার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছেন বলে আমি মনে করি না। কিন্তু তার মানে এই না যে, খুব শিগগিরই পুরোপুরি বিপর্যয়কর কিছু ঘটা অসম্ভব।

“এই সময়টা সম্ভবত সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত। আমি বলব, আগামী কয়েকটি দিন... ইউরোপ কয়েক দশকের মধ্যে নিরাপত্তায় সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে পড়েছে। আমাদের এ পরিস্থিতিকে সঠিক পথে আনতে হবে। আমি মনে করি নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক ব্যবস্থার সমন্বয়, আর এর পাশাপাশি কূটনীতি- এসবই বিকল্প হিসাবে হাতে আছে।”

Share if you like

Filter By Topic