ইউক্রেইন যুদ্ধ: অর্ধেকের বেশি পথ একাই ছুটেছেন বাংলাদেশি নারী রাবেয়া


এফই অনলাইন ডেস্ক | Published: February 26, 2022 10:29:17 | Updated: February 26, 2022 11:50:55


ইউক্রেনীয় সৈন্যের সঙ্গে রাবেয়া ইসলাম।

কিয়েভ শহরেই ছিলাম। ভোকজালনা স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছেছিলাম সিটি মেট্রোতে করে। এত ভিড় আর ঠেলাঠেলি ব্যাগ-ট্যাগ সব হারিয়ে ফেললাম। কেবল পাসপোর্ট আর টাকা রক্ষা করতে পেরেছি।

বাংলাদেশের টঙ্গীর মেয়ে রাবেয়া ইসলাম বাংকার থেকে বেরিয়ে প্রায় ১৬ ঘণ্টা পর শনিবার ভোররাতে (বাংলাদেশ সময়) যখন কিয়েভের ৫৪০ কিলোমিটার দূরের লিভিভ স্টেশনে, তখন শোনালেন তার যুদ্ধের মধ্যে পালানোর অভিজ্ঞতা। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।

তিনি বলেন, স্টেশনে সব হারিয়ে ফেলেছি, এমনকি একমাত্র সঙ্গী টিনাকে হারিয়ে প্রায় একাই পুরোটা পথ পাড়ি দিয়েছি। ইউক্রেইনের স্থানীয় সময় শনিবার কিয়েভের সময় সকাল পৌনে ১২টায় (বাংলাদেশ সময় দুপুর পৌনে ৪টা) ট্রেন ছাড়ে। লিবিব স্টেশনে পৌঁছাই রাত সাড়ে ৮টায় (বাংলাদেশ সময় মধ্যরাত সাড়ে ১২টায়)।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেইনে সামরিক অভিযান শুরুর পর কষ্টের যাত্রা শুরু হয় রাবেয়ার।

যে কোম্পানিতে কাজ করি, ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতেই তাদের বাংকারে ঢুকে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে ২৫ তারিখ সকালে ইথিওপিয়ান বান্ধবী টিনা মার্কের সঙ্গে বের হয়ে কিয়েভ ছাড়ি। যদিও বা ট্রেনে উঠেছিলাম একসাথেই, কিন্তু ভিড়ভাট্টায় টিনাকে হারিয়ে ফেলি।

এখানে এখন প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, ৩ ডিগ্রি। লাগেজ হারিয়ে শীতে কাঁপছিলাম। বাইরে দাঁড়িয়েছিলাম একজন ভারতীয় বন্ধুর জন্য, যে এসে আমাকে নিয়ে যাবে ওদের কয়েকজনের সঙ্গে। তখনই ইউক্রেনের একজন সেনা অফিসার আমাকে জ্যাকেট এগিয়ে দিলেন পরার জন্য। তারপর তারা আমাকে ডিনার করালেন নিজেদের শেল্টারে নিয়ে গিয়ে।

ইউক্রেইনে কয়েক হাজার বাংলাদেশি থাকলেও সেখানে বাংলাদেশের কোনো দূতাবাস নেই। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশিদের নিজ দায়িত্বে পোল্যান্ড যেতে বলা হয়েছে, সেখানে থাকার এবং সেখান থেকে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

রাবেয়া বলেন, আমি এখনও জানি না, কোথায় যাচ্ছি। ভারতীয় বন্ধুরা ট্যাক্সি নিয়ে আসছেন। ওরা সম্ভবত পোল্যান্ডে যাবে। ওদের সঙ্গেই যাওয়ার পরিকল্পনা। টিনাও নাকি এক ঘণ্টার দূরত্বে আছে।

কথায় কথায় রাবেয়া জানালেন, তার বাবা হাউজ বিল্ডিং ফাইনান্স করপোরেশনের একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। মা অসুস্থ, দুটো কিডনিই অকেজো। তারা ৪ ভাই-বোন। তিনি মেজ। টঙ্গীর কলেজ রোডে তাদের বাড়ি।

রাবেয়া জানালেন, বাড়ির লোকজনের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের বন্ধুদের সঙ্গেও কথা হচ্ছে।

আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি নেওয়ার পর ২০১৮ সালের নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে রাবেয়া ইউক্রেইন যান। সেখানে লাইফ আ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সে পড়াশোনা করেছেন।

পাশাপাশি মাইচিপ ডট আইও নামের একটি আইটি কোম্পানিতেও চাকরি করেন। এখন পর্যন্ত সেই কোম্পানি থেকেই সার্বক্ষণিক তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।

রাবেয়া বলেন, কোম্পানির বাংকারে যখন ছিলাম তখন ওরাই আমাকে খাবার ও পানীয় সরবরাহ করেছে। আর হ্যাঁ, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর স্যালারিও দিয়ে দিয়েছে, যাতে আমাদের এমপ্লয়িদের কোনো সমস্যা না হয়।

কিয়েভে এখনও ১৫-২০ দিনের খাবার মজুদ আছে জানিয়ে তিনি বলেন, রাশিয়ার আক্রমণের পর খাবারের দাম বাড়েনি। পারলে ফ্রি দেয়। ট্রেনে আমার টিকেটও লাগেনি।

দীর্ঘ রাস্তা পাড়ি দেওয়ার পথে রাশিয়ান গোলায় ভবন ধস রাবেয়ার চোখে পড়েনি। এমনকি ইউক্রেইনের রাজধানী কিয়েভ ছাড়ার আগেও শহরের কেন্দ্রে ধ্বংসযজ্ঞও দেখেননি তিনি।

তবে কিয়েভের বাইরে বোমা বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির শব্দ শুনেছেন বলে জানান রাবেয়া।

আলাপের শেষ পর্যায়ে রাবেয়া জানান, তার ইথিওপিয়ান বন্ধু টিনা মার্ককে আবার পেয়েছেন। ভারতীয় বন্ধুরাও সড়কের দীর্ঘ জট পাড়ি দিয়ে তাকে নিতে এসেছে।

তড়িঘড়ি করে মেসেঞ্জার থেকে বের হওয়ার আগে জানালেন, আবার যোগাযোগ করবেন। আর বন্ধু টিনা মার্ক ও একজন ইউক্রেইনের সেনার সঙ্গে ছবিও পাঠালেন।

লিবিব থেকে পোল্যান্ডের সবচেয়ে কাছের সীমান্তের দূরত্ব ৭০ কিলোমিটার বা ৪৩ মাইল।

Share if you like