Loading...
The Financial Express

আলোকচিত্রীদের বেগ স্যার

| Updated: July 26, 2021 15:42:49


এম এ বেগ এম এ বেগ

শাটার পড়ল না।

খুট শব্দ করে আটকে গেল। সাথে সাথেই অন্ধকার নেমে এল ভিউ ফাইণ্ডার-এ। নতুন এফএম-২ ক্যামেরা যে এমন বিশ্বাস ঘাতকতা করবে তা ভাবতেও পারেনি মূসা।

১৯৯১ সালের শীত বিকালের একটা ঘটনা। গজারিয়ায় ‘ওসডার’ নামের একটা এনজিও’র ছবি তুলতে যেয়ে এ বিপত্তি। ভাগ্যিস! মূল অনুষ্ঠানের ছবি তোলা হয়ে গিয়েছিল দুপুরের দিকে।

হতভম্ব মূসা দ্রুত রোলটা খুলে নিল। তারপর খানিকক্ষণ ঝাঁকাল এফএম-২ কে। না কাজ হল না। নয়াটোলার বাসায় ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হল। মন খারাপ নিয়ে ঘুমাতে গেল। আশেপাশে কেউ নেই যার সঙ্গে আলাপ করা যাবে। ভোরে অফিসে যেতে হবে। আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানের অফিসটি তখন সেগুন বাগিচায়।

পরদিন অফিসে ঢুকল সাতটার মধ্যেই। তীব্র শীত। ক্যামেরার জন্য মন খারাপ থাকায় মূসার শীতই লাগছে না। হাবেভাবে মনে হচ্ছে দিন-দুনিয়ার প্রতি আর কোনই আর্কষণ নেই। এসময় পথ বাতলে দিতে পারেন একটি মাত্র ব্যক্তিই। তাঁকে কয়েকবার বিপিএস অফিসে দেখেছে মূসা। কথাও হয়েছে। ফটোগ্রাফি নিয়ে কথা বলতে গেলে শোনেন। মূসা তাঁকেই ফোন করল।

কয়েকবার ফোনটি বাজল। তারপর সাড়া দিয়ে তিনি বললেন, 'হ্যালো।' কণ্ঠে তাঁর তখনও লেগে আছে ঘুমের আভাস।

পরিচয় দিয়ে মূসা বলল, ‘স্যার আমি মূসা রেজা।‘ মনে মনে মূসার সংশয় হচ্ছিল, স্যার তাকে চিনতে পারবেন কিনা। কথা বলতে বলতে মূসার চোখের সামনে ভেসে উঠল কালোমত শুকনা একটি মানুষের চেহারা। মানুষটির নাম এম এ বেগ। বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি’র সবাই এ মহান মানুষটিকে ‘স্যার’ বলে ডাকেন। কী গভীর আবেগে এবং শ্রদ্ধায় সবাই ‘স্যার’ বলেন তা যারা শোনেননি তাদের ঝোঝান সম্ভব নয়।

মূসার এফএম-২ এর বিশ্বাসঘাতকতার কথা শুনলেন বেগ স্যার। আশ্বস্ত করলেন, চিন্তিত হওয়ার মতো কিছু ঘটেনি। হকের (ফার্মগেটের ক্যামেরা মেরামতের দোকান) কাছে নিয়ে গেলেই ঠিক হয়ে যাবে। আর ক্যামেরা আগের মতই কাজ করবে- একই সঙ্গে এও নিশ্চিত করলেন বেগ স্যার। কথা শেষ করে মূসার আর কিছু জানার আছে কিনা সে প্রশ্ন করলেন বেগ স্যার। মূসা বলল, 'না।'

কুমিল্লা বোর্ডের মার্কসিটগুলো মাইক্রোফিল্মে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে নেহাৎ কথার ছলে এ কথা জানিয়ে বেগ স্যার বললেন, ‘একটা পুরান যন্ত্র নিয়ে গতরাতে কাজ করতে হয়েছে। তাই শুতে গিয়েছি রাত ৩টায়। একটু ভোরে ফোন করে ফেলেছেন আপনি।‘ অপ্রস্তুত মূসা। সে দেখল, সামান্য বিরক্তির আভাসও নেই বেগ স্যারের স্বরে। বেগ স্যার আরও বললেন, ‘আবার কোনও সমস্যা হলে ফোন করতে দ্বিধা করবেন না।‘

ছোট গর্তের পানিতে সমগ্র আকাশ প্রতিবিম্বিত হয়। অর্থাৎ গোটা আসমানে নজর বুলাতে হয় না। হয়ত এ অতি ছোট ঘটনায় আলোকচিত্রীদের জন্য বেগ স্যারের দরদী হৃদয়-আকাশের পুরো ছবিটা ধরা পড়বে।

আলোকচিত্রীদের চিরকালীন বরাভয় হয়ে বিরাজ করেছেন তিনি। ফটোগ্রাফি নিয়ে যেকোন সমস্যায় তার দরজা ছিল চিরঅবারিত। সময় অসময় ভাবার কোনো প্রয়োজনই ছিল না। এমনকি বেগ স্যারের সঙ্গে পরিচয় থাকারও দরকার ছিল না।

বাংলাদেশের আলোকচিত্রের জগতে বেগ স্যার না জন্মালে কি হতো? বাংলা একটা প্রবাদে নানা ঘাটের পানি খাওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বেগ স্যার না জন্মালে পানি নয় শুধু, সাথে কাদাও খেতে হত আলোকচিত্রে উৎসাহী ব্যক্তিদের। ইন্টারনেটের এ সময়ে দাঁড়িয়ে কথাটায় অতিশয় উক্তির তীব্র গন্ধ পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু তথ্য বিশেষ করে আলোকচিত্র সংক্রান্ত তথ্য যোগাড় করা বেশ কষ্টকর সে সময়টাকে বুঝতে হবে তখনকার প্রেক্ষাপটে। ইউসিস এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলে কিছু বই-পত্র এবং সাময়িকী পাওয়া যেত। ঢাকা কেন্দ্রিক ইংরেজি জানা আলোকচিত্রে উৎসাহী এবং আগ্রহী ব্যক্তিদেরই কেবল তাতে অধিকার ছিল। দেশের বাকি আলোকচিত্রী এবং তাদের সামর্থ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

হ্যাঁ দেশের বাকি আলোকচিত্রী এবং আলোকচিত্রে আগ্রহীদের কথা বিবেচনায় নিয়ে বই রচনা করেছেন বেগ স্যার। পশ্চিমা প্রযুক্তিকে দেশীয়ভাবে গ্রহণ করতে হয় কী করে তা উদাহারণ হতে পারে বেগ স্যারের বই। সরল বাংলায় সহজ ভাষায় তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য রচনা করেছেন তিনি এসব বই। ভারিক্কি চালের ভারি কথায় পীড়িত করেননি। বরং পরিচিত জিনিসের উদাহরণ দিয়ে টেনে নিয়ে গিয়েছেন আলোকচিত্রের অপরিচিত জটিল জগতের দিকে। এই যেমন ফিল্টারের কাজ বোঝাতে যেয়ে দিব্যি আটপৌরে ছাকনির সঙ্গে তুলনা করেছেন বেগ স্যার।

অন্যদিকে ফলিত প্রযুক্তি জ্ঞান বিতরণে কার্পণ্যের প্রবণতা রয়েছে বাংলাদেশে। নিজে যা কষ্ট করে অর্জন করেছি তা নিজেরই। অন্যের কোনও ভাগ নেই। এমন মনোভাবের জোরালো উপস্থিতি রয়েছে সবখানে। আলোকচিত্রের জগতও এর ছোঁয়াচ থেকে রক্ষা পায়নি। নেগেটিভ ডেভলপ করার ফর্মূলা নিয়ে বেগ স্যারের ডার্ক রুম সহকারির ভেগে যাওয়ার কাহিনীর মধ্য দিয়ে তাই ফুটে উঠছে। ভেগে যাওয়ার বহুদিন পর হঠাৎ করে তার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর বেগ স্যার যখন জানতে চাইলেন, 'ওই ফর্মূলা নিয়ে কেন তুমি চলে এলে?' তখন সে ব্যক্তি জবাব দিয়েছিল, 'এমন বিদ্যা কি কেউ কাউকে শেখায়?' বাংলাদেশের আলোকচিত্রের জগতের সবারই জানা আছে এ কাহিনী। অথচ বেগ স্যার এমন বিদ্যা শেখানোরই স্কুল খুলেছিলেন। আলোকচিত্রের জগতের এমন অন্ধকার দূর করতে সরকারি উদ্যোগের ভরসা না করেই মাঠে নামেন তিনি। তার সাহসী এ কাজের একটি রূপ বেগার্ট ইন্সটিটিউট অফ ফটোগ্রাফি। অপরটি বাংলাদেশে ফটোগ্রাফিক সোসাইটি বা বিপিএস। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর কথা আমরা জানি বাংলা প্রবাদের গুনে। নিজের জীবিকা দিয়ে একটি সংস্থাকে বাঁচিয়ে রাখার এবং বিকশিত করার কাজটি করেছেন বেগ স্যার। শতফুল ফুটতে দাও বলে কোনো শ্লোগান দেননি তিনি। বরং শতফুল ফোটার আয়োজন করেছেন। বীজ সংগ্রহ থেকে বীজতলা তৈরি এবং ফুলবাগান নির্মাণ পর্যন্ত সকল কাজ করেছেন। স্যারের এ বৃহৎ কর্মযোগ নিয়ে কোনও প্রবাদ রচনা হয়নি।

আর সে ইতিহাসই বা জানেন ক’জন! বেগার্টে থেমে না থেকে বিপিএস ভিত্তিক শিক্ষা সংগঠন বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক ইন্সটিটিউট গড়ে তুলতে সহায়তা করলেন তিনি। বের্গাটে ছাত্র ভর্তি না করে সে ছাত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন বিপিআইয়ে! অর্থাৎ নিজের আয় ভাগ করে দিয়েছেন বিপিআইকে। ব্যান্সডকের চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন বেগ স্যার। তেমনই একটা সময়ে একাজ করেছেন তিনি।

গামাল আবদেল নাসের মিশরবাসীর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘সম্পদ নেই তো কি হয়েছে আসুন আমরা দরিদ্রতা ভাগ করে নেই।‘ কিন্তু নিজের আয় অন্যকে তুলে দেয়ার ডাক দিতে সাহস পাননি বিপ্লবী নাসের। অথচ বেগ স্যার সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার মানুষের উদ্দেশ্যে কখনও কোনও আহ্বান জানাননি। বরং নিজে করে দেখিয়েছেন। সেটাও ঝোঁকের মাথার কোনও কাজ ছিল না। বরং ঢাকে বাড়ি না দিয়ে, আত্মপ্রচারের মহান সুযোগ কাজে না লাগিয়ে, বাণিজ্য বুদ্ধিকে নির্বাসনে দিয়ে এমন কর্ম করে গেছেন।

আজকের বাংলাদেশের আলোকচিত্রের মহীরূহকে প্রাণশক্তি দিয়ে বিকশিত করেছেন এবং সারাদেশে বিস্তার ঘটিয়েছেন তিনি। কথাটা মানতে কষ্ট হতে পারে। কারও হয়ত ভালও না লাগতে পারে। তবে আজকের দিনে বাংলাদেশের আলোকচিত্র পরিমণ্ডলের শীর্ষ ব্যক্তিত্বগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখুন। তাদের বেশিরভাগই বেগ স্যারের ছাত্র এবং তাদেরকে কখনো না কখনো আসতে হয়েছে বেগ স্যারের সান্নিধ্যে। তারাই কিন্তু বেগার্ট, বাংলাদেশে ফটোগ্রাফিক সোসাইটি, বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক ইন্সটিটিউট সব মিলিয়ে বৃহৎ পরিবারের অংশ। যদিও এখন অনেকেরই চলার পথ এবং মত আলাদা। কিন্তু তাদের চলার বেগ সৃষ্টির আদিতে বেগ স্যারের বেগবান উপস্থিতি অস্বীকার করার জো নেই।  

বাংলাদেশের ‘ছবিগুরু’ বেগ স্যার সাধারণভাবে সবাইকেই আপনি বলে সম্বোধন করতেন। তিনি সবার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করার জন্যেই এমনটি করতেন? তাহলে আলোকচিত্র সংক্রান্ত যে কোনও সমস্যার সমাধানে যে কোনও সময়ে এগিয়ে আসতেন কী করে? বেগ স্যারকে কখনও বিষয়টি জিজ্ঞাসা করা হয়নি মূসার। আব্বার কাছ থেকে শোনা একটি গল্প মনে পড়ায় এ প্রশ্নের উত্তর বোধহয় খুঁজে পেল মূসা।

ব্রিটেনের ইটন স্কুলের এক প্রিন্সিপাল সবসময় ছাত্রদের আগেই সৌজন্য সম্ভাষন জানাতেন। ছাত্ররা কখনও তাকে আগে সালাম দেয়ার সুযোগ পেত না। একবার এক ছাত্র এর কারণ জানতে চাইলে, সে মহান শিক্ষক বলেছিলেন, 'আমি তোমাদেরকে সালাম দেই না। তোমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আগামী দিনের ব্যাপক সম্ভাবনা। তোমাদের এ সম্ভাবনা যখন বিকশিত হবে তখন আমি থাকব না। তাই আগেই আগামী দিনের ওই ব্যক্তিত্বকে সালাম জানিয়ে রাখছি।'

বেগ স্যার তার কাছে আসা প্রতিটি আলোকচিত্রী এবং প্রতিটি মানুষের মধ্যের অপ্রকাশিত অপার সম্ভাবনাকে দেখতে পেতেন। হয়ত তাই সবাইকে আপনি বলে অনাগতকালের সে সম্ভাবনাকেই সম্মান দেখাতেন!

‘ছবিগুরু’কে নিয়ে কথা বলতে গেলে তার সৃষ্টি বের্গাট নিয়েও আলোচনা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, বেগার্ট ষাট বছর অতিক্রম করেছে! পলিমাটির দেশটিতে একক প্রচেষ্টায় পরিচালিত বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য এটা শ্লাঘার বিষয়। ভাবতেই অবাক লাগে- আলোকচিত্র শিক্ষা দানের প্রতিষ্ঠান বেগার্ট টানা ৬০ বছর ধরে অবিরাম তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে!

বেগ এবং আর্ট এই দুই শব্দকে যুক্ত করে এ প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছে। এখানে বেগ মানে গতিও হতে পারে। হতে পারে এম এ বেগের নামের অংশ। কারণ আলোকচিত্র শিক্ষার নজিরবিহীন বেগবান এ প্রতিষ্ঠান এককভাবে গড়ে তুলেছিলেন তিনি।

এছাড়া, বেগ স্যারের কথা উঠলেই স্যারের তোলা ছবির কথা উঠবে। অসংখ্য ছবি তুলেছেন স্যার। তুলেছেন অনেক ঐতিহাসিক ছবিও। স্যারের সেসব ছবির স্থায়ী এবং মৌসুমি মেলা হওয়া দরকার। দরকার কিছু ছবিকে যাদুঘরে ঠাঁই দেয়ার। এমন কাজের জন্য কেউ এগিয়ে আসবেন - তেমনই একটা আশাবাদ স্যারের ২৩তম মৃত্যুবার্ষিকীর দিনটিতেও জেগে আছে মনে।

syed.musareza@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic