বাংলাদেশের সকল নৃগোষ্ঠীর ভাষা নিয়ে গবেষণায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের শুরু করা একমাত্র মৌলিক কাজটির মাঠ পর্যায়ের সমীক্ষা শেষ হওয়ার ছয় বছর পরও আলোর মুখ দেখেনি। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
সমীক্ষার কাজ শুরু হওয়ার এক বছরের মাথায় দুই বছরের এ কর্মসূচির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হয়। মাঠ পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহের কাজও শেষ হয় ছয় বছর আগে।
পরিকল্পনা ছিল, এ সমীক্ষার ১০ খণ্ড বাংলা এবং ১০ খণ্ড ইংরেজি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। তার অংশ হিসেবে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটিমাত্র খণ্ড বাংলায় ছাপানোও হয়। তবে এখন পর্যন্ত সেটি বাজারে আসেনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালকের রুটিন দায়িত্বে থাকা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব বেলায়েত হোসেন তালুকদার বলেন, কাজটি চলছে ভাষা, গবেষণা ও পরিকল্পনা বিভাগের তদারকিতে।
ওই বিভাগের পরিচালক মো. শাফীউল মুজ নবীনকে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, মুজিববর্ষেই প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল নৃতাত্ত্বিক ভাষা বিষয়ক বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার কাজ। তবে ‘নানা জটিলতায়’ সেটা মানুষের কাছে এখনও পৌঁছায়নি।
কেন সেটা সম্ভব হয়নি জানতে চাইলে ‘কিছু কাজ বাকি রয়েছে’ জানিয়ে বিস্তারিত গবেষণার কথা বলেন তিনি।
শাফীউল মুজ নবীন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সমীক্ষার অংশ হিসেবে একটি খণ্ড প্রকাশিত হলেও চূড়ান্তভাবে সেটি বাজারে আসেনি। আরও কিছু কাজ বাকি আছে। শিগগিরই আবার কাজ শুরু হবে। তখন আরও বিস্তারিতভাবে গবেষণা করা হবে।”
এক যুগ আগে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার পর একমাত্র মৌলিক কাজ হিসেবে ২০১৪ সালে শুরু হয় ‘বাংলাদেশের নৃভাষাবৈজ্ঞানিক সমীক্ষা’। এর দুটি অংশ, একটি ভাষা অংশ, অন্যটি সংস্কৃতি।
বাংলাদেশের আদিবাসীদের ভাষা গবেষণার জন্য ২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি ইনস্টিটিটিউটের পরিচালনা বোর্ডের প্রথম সভায় ‘বাংলাদেশের নৃভাষা-বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা’ সম্পাদনার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
তৎকালীন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের সভাপতিত্বে দুটি সভায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানী ও ভাষাবিজ্ঞানীদের উপস্থিতিতে এ সমীক্ষা পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা এবং কীভাবে তা করা যায়, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
২০১৩-২০১৪ ও ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ টাকার বাজেট চূড়ান্ত হওয়ার পর ২০১৪ সালের ২১ এপ্রিল প্রশাসনিক অনুমোদন পায় এ সমীক্ষা। পরে সেবছরের ১ জুন বাস্তবায়ন শুরু হয়।
কিন্তু ২০১৫ সালের ৩০ জুনের মধ্যে সব কাজ শেষ না হওয়ায় ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত এ প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হয়। এরপর ২০১৫ সালের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে এ কর্মসূচির মাঠ পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহের কাজ শেষ হয়।
বাংলা, উর্দু, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ৪১টি মাতৃভাষা এবং চারটি ভাষা পরিবারের বর্ণনা নিয়ে তিনটি খণ্ডের কাজ শেষ করেছেন ভাষাবিজ্ঞানী ড. সৌরভ সিকদার। এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে আছেন ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। এছাড়া বাকি সাত খণ্ডে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিচয় ও সংস্কৃতি তুলে ধরতে গবেষণা কাজ শেষ করেছেন একজন নৃবিজ্ঞানী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সৌরভ সিকদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ভাষার অংশের যে তিনটি খণ্ড ছিল, তার সবগুলোর কাজ শেষ করেই ২০১৭ সালে জমা দিয়েছি। তার মধ্যে প্রথম খণ্ডটা ছাপা হয়েছে, বাজারে যায়নি। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয়নি। যতদূর জানি এ দুটি প্রুফ রিডিংয়ের পর্যায়ে আছে।”
তথ্য বিশ্লেষণ ও পাণ্ডুলিপি লেখার কাজের অগ্রগতি জানিয়ে ভাষাবিজ্ঞানের এই শিক্ষক বলেন, “কমিটির সদস্য হিসেবে আমরা যারা কাজ করেছি, তারা প্রত্যেকেই নিজেদের কাজটুকু শেষ করেছি। এরপর এগুলো প্রুফ রিডিং করে ছাপানোর দায়িত্ব সম্পূর্ণ মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের। এই খাতে পর্যাপ্ত টাকাও ছিল।
“প্রথম খণ্ড প্রকাশের পর দ্বিতীয় এবং তৃতীয় খণ্ড তারা কী করেছে, এ ব্যাপারে আমরা কিছুই জানি না। আর যে খণ্ডটি প্রকাশিত হয়েছে, সেটি বাজারে কেন আসেনি, সেটাও তারা বলছে না।”
সমীক্ষা প্রতিবদেনটি দ্রুত প্রকাশ করার তাগিদ দিয়েছেন আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মেজবাহ কামাল।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের নৃভাষাবৈজ্ঞানিক সমীক্ষার কাজটি দ্রুতই প্রকাশ হওয়া দরকার। এত বছর ধরেও একটা কাজ সফল না হওয়াটা মোটেও গ্রহণযোগ্য না।
“আদিবাসী ভাষাভিত্তিক একটি গবেষণায় বাংলা ছাড়াও ৪৩টি ভাষার অস্তিত্ত্ব রয়েছে বলে আমরা পেয়েছি। কাজেই সেখানে তাদের এই গবেষণা এখনও অসম্পূর্ণ। এ বিষয়ে কাজ করার জন্য আরও উদ্যোগ দরকার।”
মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের এ সমীক্ষার বিষয়ে নিজের মতামত তুলে ধরে ইতিহাস বিভাগের এই অধ্যাপক বলেন, “তাদের মতে বিপন্ন ভাষা ১৪টি। তবে আমার মতে আদিবাসীদের প্রায় সবগুলো ভাষাই বিপন্ন।”
ভাষাগুলো বাঁচিয়ে রাখা জরুরি কেন?
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউটের চেষ্টাকে আমি স্বাগত জানাই। তারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করার চেষ্টা করেছে। ১৪টি ভাষাকে তারা বিপন্ন ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করলেও একজন আদিবাসী হিসেবে এবং আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি, বিপন্ন ভাষার সংখ্যা কমপক্ষে ২৫টি।”
ইনস্টিটিউটের তালিকায় বেশ কিছু ভাষার উল্লেখ নেই এবং সেগুলো ‘প্রায় হারিয়ে গেছে’ বলে জানান তিনি।
সঞ্জীব দ্রং বলেন, “এমন কিছু ভাষা রয়েছে, যেগুলো কিছু সংখ্যক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ছাড়া তরুণ কিংবা ছাত্রছাত্রীরাও বলতে পারবে না। সেই বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা মারা যাওয়ার পর সেই ভাষাও হারিয়ে যাবে। আদিবাসী ভাষার রয়েছে গল্প, রয়েছে অনেক ইতিহাস। এই ভাষার গল্পে আছে প্রকৃতিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোর কথা, পাহাড়-পর্বত রক্ষা করার কথা, মূল্যবোধের কথা।”
আদিবাসী ভাষা হারিয়ে গেলে এসবও হারিয়ে যাবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আদিবাসীদের ভাষা বিলুপ্ত হলে সাংস্কৃতিকভাবে যেমন ক্ষতি হবে, তেমন ক্ষতি হবে প্রাকৃতিকভাবেও।”
আদিবাসী সংগঠনের এই নেতা বলেন, পৃথিবীতে আদিবাসীদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ছয় থেকে সাত শতাংশ। আদিবাসীরাই পৃথিবীর ৮০ ভাগ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ভূমিকা পালন করে।
“বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যদি ধরি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে ময়মনসিংহের গারো পাহাড়, মাধবকুণ্ড, খাসিয়াপাহাড়- সবকিছুই রক্ষা করে আদিবাসীরা। আদিবাসীদের ভাষা হারিয়ে গেলে তাদের জ্ঞান-গল্প-ইতিহাস-মূল্যবোধ সবকিছুই হারাতে বসবে।”
বাংলা ভাষার অধিকারের জন্য লড়াইয়ের ইতিহাস মনে করিয়ে দিয়ে সঞ্জীব দ্রং বলেন, “ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া জাতি আমরা। যে ৪১টি মাতৃভাষা আমাদের রয়েছে তার মধ্যে ৩৯টিই আদিবাসীদের ভাষা।”
২০১৯ সালকে ইউনেস্কো ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী মাতৃভাষাবর্ষ’ ঘোষণা করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশে তখন এ নিয়ে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে মন্তব্য করেনি তিনি।
“এছাড়া ২০২২ থেকে ২০৩২ সাল পর্যন্ত দশ বছরকে ঘোষণা করা হয়েছে আন্তর্জাতিক আদিবাসী মাতৃভাষা দশক হিসেবে। কিন্তু দুঃখজনক হল, এগুলো নিয়ে কারো মধ্যে কোনো সচেতনতা নেই।”
