বয়স মাত্র ২৫ বছর। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভাষায়, ছেলেরা তখন সবে লোক হতে শুরু করে। কর্তব্যের দায়টা এতোদিন এড়িয়ে গেলেও এখন থেকে ঠিকঠাক একজন দায়িত্ববান পুরুষ হয়ে উঠতে হয়। এদিকে যে বয়সে অন্যরা কেবল ক্যারিয়ার শুরু করে, সেই বয়সে আলেক্সান্ডার ওয়াং নিজেকে একজন তরুণ এবং বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ বিলিয়নিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন। আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স জগতে ডাটা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নিজের প্রতিষ্ঠান স্কেল- কে একটি সুপরিচিত এবং ভরসার নাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
বর্তমানে স্কেল -এ তার ১৫% শেয়ার রয়েছে যার অর্থমূল্য প্রায় ১.১২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ। আর তার প্রতিষ্ঠান স্কেলের মোট অর্থের পরিমাণ প্রায় ৭.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (গ্যাজেটস রাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী)।
মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিলে বাবা - মা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগাটা স্বাভাবিক। তবে ২৫ বছর বয়সী ওয়াং তার প্রবল মেধা আর কিছু একটা করে দেখানোর তীব্র ইচ্ছা নিয়ে শুধু তার বাবা - মা নয়, বরং বিশ্বের প্রতিটি তরুণের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন। তাই তো তিনি যখন সফলতার কাছে পৌঁছানোর আগের সিঁড়িগুলো ধাপে ধাপে পেরোচ্ছিলেন একদিন বাবা-মাকে বলেছিলেন, এই গ্রীষ্মের সময়ের জন্য আমি কিছু কাজ করেছি যা থেকে নিশ্চয় একটা কিছু হতে চলেছে (ফোবর্সে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী)।
ছোটবেলা থেকেই ওয়াং গণিতে বেশ দক্ষ ছিলেন। তার বাবা - মা দুজনেই পদার্থবিদ হওয়ায় তার বেড়ে উঠার এবং আগ্রহের পরিসীমায় পরিবেশটা অনেকটাই অনুকূল ছিল।
তিনি স্কুলে পড়াকালীন সময় থেকেই জাতীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন গণিত এবং কোডিং প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশ নিতেন। ইউএসএ ম্যাথ ট্যালেন্ট সার্চ প্রতিযোগিতায় তিনি একবার পঞ্চম স্থান অধিকার করেছিলেন। এছাড়াও ওয়াং ইউএসএ ফিজিক্স টিমের একজন নিয়মিত সদস্যও ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের লস আলামোস হাই স্কুলে তার শিক্ষাজীবনের শুরু হয়। স্কুলের গন্ডী পেরিয়ে তিনি ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে ভর্তি হন এবং সেখানে ম্যাথমেটিক্স অ্যান্ড কম্পিউটার সায়েন্স বিষয়ে আন্ডার গ্রাজুয়েট কোর্সে নিবন্ধিত হন। তবে ১৯ বছর বয়সে তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরিভাবে একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু কেন?
দ্য বিজনেস অফ বিজনেসে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে ওয়াং বলেন, স্কুলে পড়ার সময় থেকে নানা রকম মেশিন এবং আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স এ দুটো বিষয় আমার কাছে খুব রোমাঞ্চকর লাগতো। আমি কেবলই ভাবতাম এ দুয়ের সমন্বয় পৃথিবীকে কীভাবে বদলে দিতে পারে। তবে খানিকটা আফসোসও হতো এই ভেবে যে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স সেই অর্থে এখনো বিশ্বে সাড়া ফেলতে পারেনি।
ওয়াং পড়াশোনার পাশাপাশি পেশাগতভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করতেন যা অবশ্যই তার সৃষ্টিশীল মনকে উৎসাহী করে তুলছিল। তিনি ২০১৪ সালে অ্যাডেপার নামের একটি সফটওয়্যার কোম্পানীতে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখানে তিনি কোর প্রোডাক্ট টিমে কাজ করতেন। বিভিন্ন ধরনের ফিন্যান্সিয়াল মডেল ও অ্যাপে নতুন নতুন ফিচার তৈরি এবং সেগুলো কীভাবে মেইনটেইন করতে হয়; তিনি সেখানে এইকাজগুলো করতেন।
তিনি কোরা - তে টেক লিড হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়াও হাডসন রিভার ট্রেডিং - এ (বিভিন্ন ধরনের ফিন্যান্সিয়াল প্রোডাক্ট নিয়ে এই প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে। এটি মূলত গণিত ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে অন্যতম একটি প্রতিষ্ঠান) ওয়াং একজন অ্যালগোরিদম ডেভেলপার হিসেবে কাজ করেছেন।
এই কাজ করার সময় বিশেষত কোরাতে যখন তিনি ছিলেন; সেসময় কাজের সূত্রে স্কেলের সহপ্রতিষ্ঠাতা লুসি গুওয়ের সাথে তার পরিচয় হয়। এই পরিচয়ের সূত্রপাতের সাথে তিনি তার শিক্ষাজীবনের ইতি টানেন এবং কলেজের পড়াশোনাকে পেছনে ফেলে লুসির সাথে স্কেল - এ পথচলা শুরু করেন। বেশকিছু অর্থ বিনিয়োগে তিনি এবার একজন পুরোদস্তুর পেশাজীবী হয়ে উঠেন। সেসময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর। ওয়াং এর জীবনে এটি ছিল একটি টার্নিং পয়েন্ট।
২০১৬ সাল থেকে তিনি স্কেলে তার মেধা, শ্রম, নিরলস প্রচেষ্টা আর অফুরন্ত সময় বিনিয়োগ করেছেন। বর্তমানে তিনি স্কেলের সহপ্রতিষ্ঠাতারা পাশাপাশি সেখানকার সিইও হিসেবে কর্মরত আছেন।
৩ জন কর্মীর ছোট্ট প্রতিষ্ঠানে আজ প্রায় ৩০০ এর কাছাকাছি কর্মী কাজ করছেন। বিশ্বজুড়ে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স জগতে স্কেল একটি বিশ্বস্ততা ও ভরসার নাম। টয়োটা, ভয়েজ, স্যামসাং, পিন্টারেস্ট, সি মেশিন, ব্রেক্স, ফ্লেক্সপোর্ট, স্যাপ, এয়ারবিএনবি, ভ্যালোডাইন লিডার, টিম্বার আই, স্ট্যান্ডার্ড কগনিশন ও স্কাইডিও এর মতো প্রায় ৩০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান গ্রাহক হিসেবে তার প্রতিষ্ঠানের সেবা নিচ্ছে।
এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের এয়ারফোর্স এবং আর্মিতে সামরিক কাজে সহায়তার জন্য স্কেল সম্প্রতি প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে।
এতো প্রতিষ্ঠান থাকতে ওয়াং এর স্কেলই কেন?
স্কেলের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে এআই (আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) অ্যাপ্লিকেশনের উত্তরোত্তর উন্নতিকে ত্বরান্বিত করা।
সঠিক এবং উপযুক্ত ডাটা > অধিক সক্রিয় মডেল > দ্রুত কার্যকারিতা -এই মূলমন্ত্র নিয়ে কাজ করার ফলে স্কেল অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনেকটা বেশি ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে।
ফোবর্সে প্রকাশিত সংবাদে ওয়াং বলেছেন, প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানই অসংখ্য তথ্যের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সহায়তায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের সঠিক ডাটার উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করে সর্বোচ্চ কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন।
স্কেলের ব্যবহৃত প্রযুক্তি গবেষক বা বিশ্লেষকদের তুলনায় অনেক দ্রুত স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করতে পারে। এর ফলে রাশিয়ার বোমা হামলায় ইউক্রেনে ক্ষতির নিরূপণ করা যাচ্ছে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই।
আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে একদম রডাটার উপর ভিত্তি করে নদীর তলদেশ থেকে স্বর্ণ উত্তোলনের কাজ করা হচ্ছে।
শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
zabin860@gmail.com