এক উত্তাল সময়ে জন্ম নিয়েছে দক্ষিণ সুদান। ব্রিটেনের কাছ থেকে ১৯৫৬ সালে স্বাধীনতা লাভের আগেই উত্তর আফ্রিকার দেশ সুদানের উত্তর এবং দক্ষিণের মধ্যে লেগে যায় গোষ্ঠী-সংঘাত। দক্ষিণের একটা বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে দেশটিতে জ্বলে ওঠে এ সংঘাতের আগুন। বিদ্রোহ এবং পরবর্তী দুই গৃহযুদ্ধের সহিংসতায় প্রাণ বলি দেয়া ২০ লাখ মানুষ। অনেকেই ক্ষুধায় ধুঁকে ধুঁকে জীবন হারিয়েছে। ১৯৫৫ থেকে ১৯৭২ এবং ১৯৮৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত চলেছে এই দুই গৃহযুদ্ধ। ২০০৫ সালে শান্তি চুক্তির কল্যাণে সৃষ্টি হয় দক্ষিণ সুদান। উত্তরের আরবপন্থি মুসলমান এবং দক্ষিণের খ্রিস্টানবহুল অঞ্চলের মধ্যে বিরাজমান লড়াইকে আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম দীর্ঘ যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুদানের এই শান্তিচুক্তি তার ইতি টেনে দেয়।
ছয় বছর পর গণভোটে পৃথক হওয়ার পক্ষে ব্যাপক রায় দেওয়া হয়। আর দক্ষিণ সুদান লাভ করে স্বাধীনতা। “জুবার আকাশে উড়ছে একটি গর্বিত পতাকা এবং বিশ্ব মানচিত্রকে নতুন করে আবার আঁকতে হলো।” তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা একটি ঘোষণায় এসব কথা বলেন। দক্ষিণ সুদানের স্বাধীনতা প্রক্রিয়ায় ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্লেষকরা বলেন, সুদানের সাবেক লৌহমানব ওমর আল-বাশিরের সঙ্গে আমেরিকার ছিলো বৈরী সম্পর্ক। দক্ষিণ সুদানের স্বাধীনতা তৎপরতায় নিবিড় ভাবে ওয়াশিংটনের জড়িয়ে পড়ার পেছনে আংশিক কারণ ছিলো এটি।
কিন্তু এখন মার্কিন কর্তারা বলেন ভিন্ন কথা। তাঁরা অভিযোগের সুরেই বলেন, আমেরিকার একটি শক্তিশালী নির্বাচনী অঞ্চল সমর্থন করেছিল দক্ষিণ সুদানের স্বাধীনতা তৎপরতা। এর সাথে যোগ হয় হলিউডের জর্জ ক্লুনিসহ খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টানদের ও ক্যাপিটাল হিলের দ্বিদলীয় তৎপরতার “বিচিত্র জোট।” দক্ষিণ সুদানের স্বাধীনতাপন্থীদের মধ্যে চলমান অন্তঃকলহ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে এই জোট মোটেও আমলে নেয়নি। তবে ওয়াশিংটনে অনেকের কাছেই তাদের এই তৎপরতা আজ আর সুখকর ঠেকছে না, বরং ‘তিক্ত বড়ির আস্বাদে ভরে গেছে তাদের মুখগহ্বর।’
আমেরিকারসহ অন্যান্য শক্তি এখন দক্ষিণ সুদানের অন্তঃকলহের উত্তাপ কমিয়ে আনতে চাইছে। চাইছে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ভেঙ্গে দিতে, নিরস্ত্রীকরণ করতে এবং দেশটিতে সংবিধান রচনার প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করতে।
তালেবানের কাছে আফগানিস্তানের পতনের কথা তুলে ধরে বিশ্লেষকরা বলেন, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির মাত্রাতিরিক্ত নাকগলানোর আরেক জ্বলন্ত উদাহরণ হলো দক্ষিণ সুদান। ‘দেশ-গঠনের অতি সরল বা প্রায় বোকামিভরা মার্কিন তৎপরতার চূড়ান্ত খিঁচুনিই দক্ষিণ সুদান। দেশটিতে গোটা মার্কিন তৎপরতা মর্মান্তিক মহাধসে পড়েছে।’ থিংক ট্যাংক ক্রাইসিস গ্রুপের সুদান বিশেষজ্ঞ অ্যালান বোসওয়েল এ কথা জানান।
ব্রেকিং সুদান বইয়ের লেখক জো মাদুত বলেন, ‘দেশ গঠনের প্রক্রিয়ায় অতিসরল ভাবে নিয়েছিল খোদ দক্ষিণ সুদান।’ তিনি আরো বলেন, ‘স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য তাদের ত্যাগ, তিতিক্ষা বা সংকল্পকে কোনো ভাবেই খাটো না করেও বলা যায়… তারা প্রত্যাশা এবং নতুন দেশ পাওয়ার ফুর্তি বজায় রাখতে দুঃখজনক ভাবে ব্যর্থ হয়েছে।’
তিনি বলেন, নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারণেই মোটা দাগে তাঁরা ব্যর্থ হয়েছে। জনগণের আকাঙ্ক্ষা ব্যর্থ করে দিয়ে একটি রাষ্ট্র গঠনে তাঁরা ব্যর্থ, তাঁরা ব্যর্থ এমন একটি রাষ্ট্র গঠনে সেখানে ব্যক্তি-মর্জি নয়, শাসন পরিচালনা করবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ।
২০১১ সালে স্বাধীনতার লাভের দিনে দক্ষিণ সুদানের সব মানুষকে যারপরনাই আনন্দে আপ্লুত হতে দেখা গেছে। তাদের সামনে সুদিন অপেক্ষা করছে। আসছে সুখী হওয়ার সময়। কিন্তু তাদের সে স্বপ্ন এখন দুঃ স্বপ্ন হয়ে তাড়া করছে। জুবার ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আর অন্তঃকলহ, বিরোধ ও সংঘাতের করাল ছায়ায় নিচে পড়েছে গোটা দেশ। শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, বেসামরিক শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার বদলে সরকার এখন গড়ছে আফ্রিকার সর্ববৃহৎ সশস্ত্র বাহিনী।
সম্পদশালী হওয়ার বদলে দেশের মানুষ পড়েছে অন্তহীন দুর্ভোগে। জাতিসংঘ বলছে, চলতি বছর দক্ষিণ সুদানে ৮৩ লাখ মানুষের মানবিক সহায়তা লাগবে। গত বছরের তুলনায় চলতি বছর এ সংখ্যা বেড়েছে ৮ লাখ। এ ছাড়া, চলতি বছর ১৪ লাখ শিশু ভয়াবহ অপুষ্টিতে ভুগবে। আর দেশটির ৬০ শতাংশ মানুষ ‘খাদ্য নিরাপত্তাহীন ভয়াবহ’ অবস্থায় জীবন-যাপন করছে। সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, মারাত্মক বন্যা এবং অর্থনীতিতে কোভিড-১৯’এর ধকল এবং ক্রমবর্ধমান দারিদ্রের মোট যোগফলই এমন একটি পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি বলছে, সুদানের ১০ রাজ্যের মধ্যে নয়টিই ২০২০ সালে ৫০ শতাংশ কম খাদ্যশস্য এবং শাক-সবজি উৎপাদন করেছে। দেশটির কেবল ৪০ ভাগ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র কাজ করতে পারছে বলেও মনে করে এই আন্তর্জাতিক সংস্থা। সংস্থাটি আরো বলেছে, গত আট বছরে নিজ ঘরবাড়ি ছেড়ে ৪০ লাখ হতভাগ্য মানুষ দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে।
দুর্নীতিও সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। দক্ষিণ সুদানের অনেকেই এমন অভিযোগ করেন। ২০২০ সালে ট্রান্সপেরিন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতিপরায়ণ দেশের তালিকার নিচে স্থান করে নিয়েছে দক্ষিণ সুদান।
দক্ষিণ সুদানে মানবিক তৎপরতায় জড়িত এক কর্মী বলেন, ‘দেশটির বিপর্যয়ের তালিকা যেন বাইবেলে বর্ণিত ১০ প্লেগের চেয়েও দীর্ঘ!’
[ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলা রূপান্তর সৈয়দ মূসা রেজা]
আরো পড়ুন
স্বাদহীন স্বাধীনতা: দক্ষিণ সুদানের ‘নষ্ট’ দশক
