বিশ্ব জুড়ে কর্তৃত্ববাদী সরকারের নেতা এবং তাদের মিত্ররা জনগণকে ছিনতাই করছে। এ সব নেতারা হলো তস্করতন্ত্রের রাঘব-বোয়াল। বিস্ময়কর পরিমাণে নগদ অর্থ-কড়ি তারা ভরছে নিজেদের অতল পকেটে। এ ভাবে কামানো অর্থ-সম্পদ বিশ্বের বিরাজমান আর্থিক ব্যবস্থার সুযোগে পশ্চিমা ধনী দেশগুলোতে বিনিয়োগের লক্ষ্যে স্থানান্তর করছে তারা। সম্প্রতি প্রকাশিত এনাবেলার্স বইয়ে এ কথাগুলো লিখেছেন ফ্রাঙ্ক ভোগল।
আমেরিকা এবং ব্রিটেন কী ভাবে তস্করতন্ত্রের অর্থের সেবাদাতা হয়ে উঠেছে সম্প্রতি প্রকাশিত তিন বইয়ে তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এনাবেলার্স সে তিন বইয়ের অন্যতম। এর আগে কথা হয়েছে অলিভার বুলফের বাটলার টু দ্যা ওয়ার্ল্ড নিয়ে। এবারে তাকাবো এনাবেলার্স এবং ক্যাসি মিশেলের আমেরিকান ক্লেপ্টোক্রেসির দিকে।
বাটলার টু দ্যা ওয়ার্ল্ডে’ অলিভার বুলফ তুলে ধরেছেন কী করে তস্করতন্ত্রের বিত্তশালীদের ‘খানসামা’য় পরিণত হয়েছে ব্রিটেন। দূর্নীতি গবেষক ক্যাসি মিশেলও আমেরিকার একই চিত্র তুলে ধরেন আমেরিকা ক্লেপ্টোক্রেসিতে। ব্রিটেন কী করে বিত্তশালীদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছে, নোংরা অর্থের তাবেদারি করতে যেয়ে নীতি এবং নৈতিকতার সামান্য দংশনও অনুভব করেনি বুলফ তা বিশদ ভাবেই বাটলার টু দ্যা ওয়ার্ল্ডে ফুটিয়ে তোলেন। বই দুটো একযোগে পড়লে বুলগেফর এ তত্ত্বের প্রতি যৎকিঞ্চিত সন্দেহের বাষ্পও থাকবে না। অন্যদিকে মিশেল তুলে ধরেন, বিশ্বে কর না দেওয়ার সোনায় সোহাগা সুযোগ রয়েছে যে সব অঞ্চলে তাদের অনেকগুলোই হলো মার্কিন অঙ্গরাজ্য। এর মধ্যে (লেখকের মতে কর ফাঁকি দেওয়ার মতলবে নাম সর্বস্ব কোম্পানির উদ্ভাবক) ডেলাওয়ারই কেবল নয় আরো রয়েছে নেভাডা, সাউথ ড্যাকোটা এবং ওয়াইয়মিং।

বুলফের মতোই দক্ষতায় মিশেলও লিপিবদ্ধ করেন সেবাদানে উন্মুখ আর্থিক এবং আইনি ব্যবস্থার সাথে স্বৈরাচারীদের শুভ মিলনের ফলাফল। উদাহরণ হিসেবে একুয়াটোরিয়াল গিনির ঘৃণ্য প্রেসিডেন্ট পুত্র ‘গয়না স্বৈরশাসক’ তেওডোরো এনগুয়েমা ওবিয়াং ম্যাঙ্গুর সাক্ষাতের বিষয় তিনি তুলে ধরেন। হালি হালি বিলাসবহুল গাড়ি এবং প্রমোদ তরী, মার্কিন পপ তারকাদের গলায় গলায় ভাব বা বন্ধুত্ব সাথে মাইকেল জ্যাকসনের স্মৃতিচিহ্নের সাথে জড়িত যা কিছু সম্ভব সংগ্রহ করার বাতিকগ্রস্তের জন্য কুখ্যাতি লাভ করেন তিনি।
এরপরও অঙ্গরাজ্যগুলোর সরকার ব্যবস্থার তুলনায় ওয়াশিংটনের সরকার ব্যবস্থার টক-মিষ্টি বা মিশ্র সমালোচনা করেন মিশেল। বইটির প্রেক্ষাপটে বিচারে এমন সমালোচনাকে বরং এক ধরণের প্রশংসা গাঁথা হিসেবেই বিবেচনা করা যায়। তারপরও তিনি স্বীকার করেন, ওয়াশিংটনের হুন্ডি বিরোধী চমৎকার আইন রয়েছে। কিন্তু অনেক ধরনের অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে এ এমন আইনেও নানা ফাঁক-ফোকর রয়েছে। বিশেষ করে জমি-জিরাত এবং আবাসনের ব্যবসার বেলায় এ আইনে বিশ্রী রকমের ফাঁকিবাজির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মিশেল তার বইতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সোহোকে উদারণ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “ট্রাম্প সোহো… গোটা ট্রাম্প পরিবারের সাথে জড়িতদের নির্মাণ কাজের সাথে নিবিড় সম্পর্কযুক্ত…৭৭ শতাংশ ইউনিটই এমন সব বিক্রেতার কাছে বিক্রয় করা হয়েছে যাদের তৎপরতা হুন্ডি ব্যবসায়ীদের সাথে খাপ খায়।”
এই দুই বই পড়ার পর পাঠকের সন্দেহের লেশমাত্র থাকবে না যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য একযোগে নোংরা অর্থকে নিরাপত্তা দেওয়ার সেবার জন্য সদা প্রস্তুত রয়েছে অনেক “করিৎকর্মা।” এ দলে রয়েছে সেবাদানে সদা উন্মুখ ব্যাংক, আইনজীবী, জমির দালাল, হিসাব রক্ষক এবং জনসংযোগ কর্মকর্তাদের বিশাল এক শ্রেণি। এ ঘরানার আরেকটি বইয়ের নামও রাখা হয়েছে এনাবেলার্স। আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্সিয়ার শ্রেণিকে এক হাত নিয়েছেন ফ্রাংক ভোগল। তিনি নিজেও সাবেক অর্থনৈতিক সাংবাদিক, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাবেক যোগাযোগ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি যে পেশায় গোটা জীবনের প্রায় পুরোটাই ব্যয় করেছেন তার অধঃপতনে সত্যিই গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন।
আমেরিকার ‘করিৎকর্মা’ শ্রেণি হয়ত সবচেয়ে বিপজ্জনক। খুবই শক্তিশালী একটি দেশের রাজনীতিতে এ শ্রেণির যারপরনাই প্রভাব রয়েছে। নোংরা অর্থ বিরোধী লড়াইয়ে তারপরও আমেরিকার বীরোচিত কাজ করছে বলেই মনে করেন মিশেল। ৯/১১’এর ঘটনার পর দেশটিতে প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট গ্রহণ করা হয়। এতে হুন্ডি বিরোধী অর্থ সংক্রান্ত বিধি যুক্ত করার কাজটি করেন পরলোকগত সিনেটর কার্ল লেভিন। গয়না স্বৈরশাসক’ তেওডোরো এনগুয়েমা ওবিয়াং ম্যাঙ্গুর কালো অর্থ খুঁজে বের করেন একদল অনুসন্ধানী এবং বিচার বিভাগের একটি ইউনিট সে তস্করতন্ত্রের সম্পদকে বাজেয়াপ্ত করে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে দুই দলের সদস্যদের ভোটে নাম সর্বস্ব, বেনামে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোর তৎপরতাকে নিষিদ্ধ করা হয়। এ ছাড়া, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন নিজ কর্মসূচিতে দুর্নীতি দমন অভিযানের প্রতি প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।
বুলফের নায়করা মিশেলের তুলনায় বিরল এবং হীনবল। মার্কিন আইনপ্রণেতাদের যে কর্মী বাহিনী আছে এ সব হীনবল নায়কদের তাও নেই। বা দুর্বল আইনের বিধিমালার সহায়তাও জোটে না। এ ছাড়া ক্ষমতাসীন বা বিরোধী দলে কোনো পদের দায়িত্বও তাদের নেই। সংসদে তারা পেছনের সারির সদস্য। পদ মর্যাদাহীন সদস্যদের জন্য নির্ধারিত এ সব আসন। ব্রিটেনের আইনি ব্যবস্থায় অদ্ভুতভাবে তস্করতন্ত্রের অর্থের “খানসামাগিরি” করার সুবন্দোবস্তর বিষয়গুলো চমৎকার ভাবে তুলে ধরেন বুলগফ। দেশটির অলিখিত সামাজিক নীতিমালা; এর উচ্চ শ্রেণির বাসিন্দাদের মধ্যে একচেটিয়া সংহতি এবং অর্থের প্রতি অব্যক্ত আবেশ; সাধারণ আইনের ঐতিহ্য এবং স্বচ্ছ ও বিধিবদ্ধ আইন-কানুকে প্রতিরোধ করার প্রবণতা সব মিলিয়ে তস্করতন্ত্রের অর্থ বিরোধী অভিযানকে প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে। এমনকি এ ধরণের অভিযানের কামনাকেও নামিয়ে আনে হতাশার অন্ধকারে।
ব্রিটেনের অর্থনৈতিক অভিজাতদের কথা বলতে যেয়ে বুলফ লিখেছেন, “কী ভাবে চলাফেরা করতে হবে সে কথা এক দোস্ত আরেক দোস্তকে বলে না।” অন্যদিকে স্কটল্যান্ডের সীমিত অংশিদারিত্ব থেকে ব্যক্তিগত ফৌজদারি দণ্ডবিধি পর্যন্ত ব্রিটিশ পুরানো আইনের ফাঁক-ফোকর দুর্বৃত্ত-অর্থ গোপন করার অব্যর্থ হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এর মাধ্যমে কেবল অর্থ-বিত্ত নিরাপদে গোপন লুকিয়ে রাখাই যায় না বরং সমালোচকদের মুখে কুলুপ সেটে দেওয়া যায়।
বুলফ এবং মিশেল উভয়েই বিশুদ্ধ নৈতিকতার নীতি কথায় আটকে থাকেননি। একটি শিল্প কিভাবে দুর্নীতিবাজদের উসকে দিতে পারে তাও প্রশংসনীয় ভাবে তুলে ধরেছেন। তাদের বক্তব্য স্বস্তি দেবে না কিন্তু এ সব তৎপরতা কী ভাবে একটি দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে ঘায়েল করতে পারে তাও তুলে ধরতে দ্বিধা করেননি এ দুই লেখক। কী ভাবে আমেরিকার ‘রাস্ট বেল্ট’ (মিশিগান, উইসকনসিন, ইন্ডিয়ানা, ইলিনয়, ওহিও এবং পেনসিলভেনিয়া) নামে পরিচিত অঙ্গরাজ্যগুলোর পরিত্যক্ত সব কারখানা নোংরা অর্থ পাচারের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। মিয়ামিতে গোঁড়া ইহুদি সম্প্রদায়ের কুড়িজন বা তারচেয়ে কিছু বেশি বিনিয়োগকারীর আগমন ঘটল। শিল্প বা কর্পোরেট অভিজ্ঞতার কোনো বালাই তাদের নেই। তবে তাদের কাছে ছিল নগদ অর্থ-কড়ি। মার্কিন কর্তৃপক্ষ বলছে, ইউক্রেনে দুর্নীতি তৎপরতার মধ্য দিয়ে এ অর্থের মালিক বনেছেন তারা। এখন কেবল অর্থের জোরেই ধাতব কারখানা এবং দালানকোঠা খাতে প্রত্যন্ত সম্প্রদায়ে বিনিয়োগের সুযোগ করে নেয় তারা। উন্নয়ন নিয়ে নতুন মালিকদের কোনো গরজই ছিল না। ছন্নছাড়া মার্কিন জমি এবং সম্পত্তির জন্য নিরাপত্তা এবং সুযোগ-সুবিধা পাওয়াই ছিল মূল আকাঙ্ক্ষা। সব মিলে প্রত্যন্ত সম্প্রদায়গুলো সমস্যায় পড়ে।
ইউক্রেনের উপর হামলা এ কথাই স্পষ্ট করে তুলেছে যে আমেরিকা এবং ব্রিটেনের এমন সব চালিয়াতি শিল্প-কারখানা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। তবে তারা একক ভাবে হুমকি হয়ে দেখা দেয়নি – এটাও সত্য। ভাবতে গেলেও মাথা বিগড়ে যায় যে, রাজনীতিবিদদের এ সব বিষয়ে সচেতন করার লক্ষ্যে ইউরোপকে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে। সত্যি বলতে কী, এ তিন বইয়ের তিন লেখক আর্থিক সেবা-শিল্পের অপ্রীতিকর অংশের ওপর থেকে ঘোমটা খুলে ফেলেছেন। একই সাথে এ দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে না নেওয়ার আহ্বান জানান সবার প্রতি। একই সাথে এসব বই থেকে আভাস পাওয়া যাচ্ছে যে, নোংরা অর্থ প্রবাহের সরকারগুলো আসক্তির অবসান ঘটানোর তৎপরতা চলছে।
তিন বই পড়ার পর উপলব্ধি করা যাবে যে, বর্তমান নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা সত্ত্বেও এ খাতে প্রয়োজনের থেকে এখনো অনেক কম ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি বদলে গেছে এমন কথা বললেই তা মেনে নিবেন না পাঠকবর্গ। বরং তারা বদলের প্রমাণ দেখতে চাইবেন।
[ফাইনান্সিয়াল টাইমস অবলম্বনে]
আরো পড়ুন: লন্ডন যেভাবে কালো টাকার অভয়ারণ্য হয়ে উঠল
