Loading...
The Financial Express

আবার জেগে উঠছে তাইপেই এর ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি?

| Updated: May 22, 2022 16:27:46


আবার জেগে উঠছে তাইপেই এর ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি?

পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে বিশটি পর্বত। একসময় দোর্দণ্ড প্রতাপে লাভা উদগীরণ করতো তারা। তারপর সময়ের পরিক্রমায় হয়ে গেছে নিস্তব্ধ। কিন্তু হাজার বছরের সেই ঘুম যদি হঠাৎ ভেঙে যায়? তারা যদি আবার যদি জেগে ওঠে সেই লেলিহান শিখা নিয়ে?  

তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেই এর 'ইয়াংমিংশান জাতীয় পার্ক' এর ভেতর রয়েছে বেশকিছু পর্বত। অনেক অনেক বছর আগে আগ্নেয়গিরির লাভা উদগীরণ করতে থাকলেও বহু বছর ধরেই তারা শান্ত। ঘুমিয়ে গিয়েছে আগ্নেয়গিরি। পর্বতমালার সব পর্বত পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে পর্যটকদের। প্রায় ১১,০০০ হেক্টর ভূমিজুড়ে অবস্থিত এই হাইকিং ট্রেইলস। এই পার্কের ভেতর দিকে আছে পাহাড় - পর্বতের সারি। মাঝে মাঝে এর ফোকর থেকে বেরিয়ে আসে জলীয় বাষ্পের মেঘ। তবে সেটি আলাদাভাবে আশংকা জাগানিয়া কিছু ছিল না। 

কিন্তু সবাই নড়ে - চড়ে বসতে বাধ্য হন ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে। গবেষক লিন চ্যাঙ - হঙ দাবি করেন, এই আগ্নেয়গিরিগুলো ঘুমিয়ে আছে, তবে মৃত নয়। জোর সম্ভাবনা আছে তাদের জেগে ওঠার!

কিন্তু তিনি এমন মনে করলেন কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তার ভূমিকম্পসংক্রান্ত গবেষণায়।

তিনি দুই দশকের বেশি সময় ধরে ভূমিকম্প নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাইওয়ান বেশ ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। বছরে প্রায় ১০০০ টি ভূমিকম্প তাদের মোকাবেলা করতে হয়। আর এই ভূমিকম্প বিষয়ে গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ করতে গিয়েই তিনি সন্ধান পান ম্যাগমার।

ম্যাগমা মূলত পাহাড়ের গঠনের পূর্বের গলিত-উত্তপ্ত অবস্থা। তিনি জাপানে নমুনা পরীক্ষা করতে পাঠান। নমুনা পরীক্ষায় পাহাড়ের ভেতরের প্রকোষ্ঠে ম্যাগমার অস্তিত্ব ধরা পড়ে। এছাড়া অনেক বেশি পরিমাণে হিলিয়াম - ৩ আইসোটোপের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, যা ম্যাগমার উপস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।

এই সুপ্ত থাকা আগ্নেয়গিরিগুলো 'দাতুন ভলকানো গ্রুপ' এর অংশ। লিন এখানে ভূমিকম্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ১৪৬ টি সিসমোমিটার বসানোর ব্যবস্থা নেন। ব্যবস্থাটি এমনভাবে করা হয়, যেন তাইওয়ানের ভেতরে সবদিকে হওয়া ভূমিকম্পের তীব্রতা এর মাধ্যমে বোঝা যায়। পাশাপাশি জাপানের দিকে ভূমিকম্প হলেও যেন এখানে ধরা পড়ে। এর অন্যতম বড় কারণ ছিলো, ভূমিকম্প হয় ভূগর্ভস্থ প্লেট নড়ে ওঠার ফলে। আর এর ফলে ম্যাগমাটিক বা ফেরাটিক (ভূগর্ভস্থ জলীয় চাপ থেকে সৃষ্ট) ধরনে অগ্ন্যুৎপাত ঘটতে পারে।

এ বিষয়ে জানার পর তাইওয়ান সরকার তাদের আরো ব্যাপক গবেষণা করার আহবান জানান। সর্বাত্মক সহায়তার আশ্বাস দেন। ফলে পরবর্তীতে ম্যাগমার পি - ওয়েভ ও এস - ওয়েভও শনাক্ত করা হয়।

পি - ওয়েভ (প্রাইমারি) এর উপস্থিতি বেশ ভালোভাবেই পাওয়া যায়, যদিও এস - ওয়েভের উপস্থিতি এখনো তেমন মেলেনি। লিন মনে করেন, তাদের জীবদ্দশায় এখানে অগ্ন্যুৎপাত ঘটবেনা। বিশেষ করে ম্যাগমার মাধ্যমে ঘটার সম্ভাবনা নেই৷ তবে জলীয় চাপের মাধ্যমে অর্থাৎ, ফেরাটিক অগ্নুৎপাত ঘটার ১০ – ২০ শতাংশ সম্ভাবনা আছে।

এছাড়া ৪০ টির বেশি স্টেশন বসানো হয়েছে খুব কাছে কাছে। যাতে যেকোনো রকম পরিবর্তন সহজেই সেখানে ধরা পড়ে। বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত ভূমিকম্পগুলোর ধারাবাহিকতা ও তীব্রতা এসব স্টেশনে নিয়মিত ধরা পড়বে। এর ফলে বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন তথ্য - উপাত্তের সমন্বয়ে সামগ্রিক একটি চিত্র পাওয়া যাবে বলে মনে করেন লিন।

স্থানীয় অধিবাসীদের সতর্ক করার জন্য সরকারের তরফ থেকে তিন রকম সিগনালের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পর্যায় - ১ কে বোঝানো হয় সবুজ রং দিয়ে, এর মানে হলো ঝুঁকি নেই। পর্যায় - ২ কে বোঝানো হয় হলুদ রং দিয়ে, এর মানে ঝুঁকি কিছুটা আছে, তবে তা শীঘ্রই নয়। পর্যায় - ৩ এর নির্দেশক লাল রং। এর মানে হলো, লাভা উদগীরণ শুরু হতে পারে যেকোনো সময়ে।

তাইপেই এর বাতাসে মিশে আছে পাহাড়ের প্রকোষ্ঠ থেকে বেরোতে থাকা ধোঁয়ার মেঘ, যাতে বেশ ভালো উপস্থিতি আছে সালফারের। এটিও আগ্নেয়গিরির জেগে ওঠার সম্ভাবনা জানান দেয়। লিন পরীক্ষা করে দেখেছিলেন, যে প্রকোষ্ঠ থেকে ম্যাগমার নিঃসরণ হচ্ছে, সেটি তার ধারণার চেয়েও আকৃতিতে বড়। একইসঙ্গে বেধের দিক থেকে কম৷ সিলিন্ডার আকৃতির সেই প্রকোষ্ঠটির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ১২ কিলোমিটার, বেধ ৮ কিলোমিটার। ফলে কোন কারণে ম্যাগমাটিক বা ফেরাটিক লাভা প্রবাহ শুরু হলে চাপ সৃষ্টি হবে বেশি, আবার প্রবাহের গতিও হবে দ্রুততর।

এক্ষেত্রে গবেষক ক্যারোলিন হোয়াইটহল অবশ্য ভীত নন। তিনি মনে করেন, যেহেতু সিসমোগ্রাফ এর মাধ্যমে ভূমিকম্পের তীব্রতা মাপা সম্ভব, কাজেই ঘন ঘন ভূমিকম্পের প্রবণতা দেখলে এর তীব্রতা অনুসারে পদক্ষেপ নেয়া যাবে। প্রয়োজনে আশেপাশের ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে থাকা মানুষকে সরিয়ে নেয়া হবে আশ্রয়কেন্দ্রে।

আরেকজন বিশেষজ্ঞ কোস্টাস কন্সটান্টিনোউ মনে করেন, প্রকৃতি মানুষের কথায় চলে না। সে চলবে তার মত করে। কখনো ওরকম বড় দুর্যোগ এলে তা একেবারে মোকাবেলা করা কঠিন হবে। সে কারণে আগে থেকেই দেখে রাখতে হবে কীভাবে বিকল্প ব্যবস্থা করা যায়৷

মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত।

mahmudnewaz939@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic