আবর্জনা থেকে বিদ্যালয়: কম্বোডিয়ার কোকোনাট স্কুল


কৌরিত্র তীর্থ | Published: March 22, 2022 21:01:08 | Updated: March 23, 2022 21:59:49


কোকোনাট স্কুলের শ্রেণিকক্ষ। ছবি - ডয়চে ভেলে

দশ বছর আগে আমি একদিন মগবাজার থেকে হেঁটে আসছি, দেখি রাস্তার কাছে স্তূপ হয়ে আছে আবর্জনা, দুর্গন্ধে নাড়ি উলটে আসে! আমি ভাবলাম এই যদি আবর্জনার নমুনা হয় একদিন এই দেশ আবর্জনায় তলিয়ে যাবে। দেশের জন্য যদি কিছু করতে হয় এই আবর্জনার একটা গতি করতে হবে। সেই থেকে আমি আবর্জনা নিয়ে গবেষণা করছি...দশ বছরের গবেষণার ফল এই প্লাস্টিজনা- প্লাস্টিক এবং আবর্জনা...আমি আমার প্লাস্টিজনা দিয়ে আপনার পুরো স্কুল তৈরি করে দেব।

বাংলাদেশের অধ্যাপক ও লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল রচিত স্কুলের নাম পথচারী উপন্যাসের পাগলাটে হারুন ইঞ্জিনিয়ার যে সুদূর কম্বোডিয়ায় অউক ভ্যান্ডে নাম নিয়ে বাস্তবেও আবির্ভূত হবেন, আগে থেকে তা কে আঁচ করতে পেরেছিল?

দৃশ্যপটে মগবাজারের জায়গায় আগমন ঘটেছে কম্বোডিয়ার কিরিরম ন্যাশনাল পার্কের। পাহাড়ঘেরা দর্শনীয় এ স্থানটির একসময় মৃতপ্রায় দশাই হয়েছিল দর্শনার্থীদের ফেলে যাওয়া আবর্জনার কবলে পড়ে। সেখানকার শিশুদের অবস্থাও পড়ে থাকা আবর্জনার মতই। দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলটিতে পরিবারগুলোর আয়ের বড় উৎস শিশুদের দিয়ে স্যুভেনির বিক্রি অথবা ভিক্ষাবৃত্তি।

বেড়াতে এসে পার্কটির এহেন অবস্থা দেখে তাই হোটেল ম্যানেজার অউকের মাথায় আসে আবর্জনা স্কুল বানাবার পরিকল্পনা। শুভস্য শীঘ্রমের সূত্র মেনে প্রথমেই রাজধানী পেনম পেনে একটি পাইলট প্রজেক্ট দাঁড় করান তিনি, পরবর্তীতে যার শাখা ন্যাশনাল পার্কটিতেও বিস্তৃত হয়। বলে রাখা ভালো, এই কাজ করতে গিয়ে চাকরিতে ইস্তফা পর্যন্ত দিয়েছেন ৩৮ বছর বয়সী এই কম্বোডিয়ান।

কোকোনাট স্কুলে ক্লাস নিচ্ছেন অউক ভ্যান্ডে। ছবি: আর্টে টিভির ডকুমেন্টারি

কোকোনাট স্কুল - বিদ্যালয়টি যখন তার কার্যক্রম শুরু করে, চেয়ার-টেবিলের পরিবর্তে নারকেল গাছ ব্যবহৃত হতো শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার কাজে - সেই থেকেই এই নাম।

ক্রমেই গাছের জায়গা দখল করে নেয় আবর্জনা। কী নেই সেই আবর্জনার তালিকায়? কাচের বোতল, প্লাস্টিকের বোতল, গাড়ির পুরনো টায়ার, নারকেলের ভাঙা অংশ, প্লাস্টিকের ব্যাগ, ফেলে দেয়া চামচ, টাইলসের ভাঙা টুকরো, বোতলের ছিপি। মোটকথা, দৈনন্দিন জীবনে বাতিলের খাতায় ফেলে দেয়া সকল জিনিসের দেখা মিলবে এখানে।

নতুন ভবন স্থাপনে ব্যস্ত ভ্যান্ডে ও তার সহযোগীরা। ছবি: আর্টে টিভির ডকুমেন্টারি



ফুল পাত্র বিচার করে ফোটে না। ছবি - ডয়চে ভেলে

অউক ভ্যান্ডে নিজেই বিচিত্ররকম আবর্জনা সংগ্রহ করেন। এই কাজে তার সহযোগী বিদ্যালয়ের দুই শতাধিক শিক্ষার্থী। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যুগলবন্ধনে সংগৃহীত আবর্জনা দিয়ে বিদ্যালয়টির মেঝে থেকে শুরু করে ছাদ- কোনকিছু বানানোই আর বাকি নেই। টায়ারের চেয়ার, কাচের বোতলের দেয়াল, পেট্রলের ক্যানের লকার কিংবা ছিপির তৈরি পতাকা তারই সাক্ষ্য দেয়। দেখেশুনে বোধ হয়, সৌন্দর্যবর্ধনে আবর্জনার জুড়ি মেলা ভার।


পানীয়ের ক্যানের তৈরি হাতি। ছবি: আর্টে টিভির ডকুমেন্টারি



প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে বানানো কম্বোডিয়ার জাতীয় পতাকা। ছবি - ডয়চে ভেলে


নতুন ধারার এই বিদ্যালয়টির মাসিক ফি কিন্তু টাকায় নয়, দিতে হয় আবর্জনায়। দরিদ্র এই শিক্ষার্থীদের পক্ষে বিদ্যালয়ের খরচ জোগানো সম্ভব নয়, অউক তা জানেন। তাই মাস শেষে শিক্ষার্থীরা আবর্জনার স্তূপ এনে জমা করেন যা ব্যবহৃত হয় বিদ্যালয়ের নতুন স্থাপনা তৈরির কাজে।

সাধারণ শিক্ষার বাইরে গিয়ে কোকোনাট স্কুলে কম্পিউটার, ইংরেজি এবং পরিবেশের মতো বিষয়গুলো শেখানো হয়। আর সেগুলো শেখান স্বেচ্ছাসেবী কিছু শিক্ষক। পেশায় অ্যাপার্টমেন্ট ম্যানেজার তেমনই এক স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক স্যামনর্প আর্ট টিভিকে জানান, আমি চাই আমার জ্ঞান সেসব জায়গায় ছড়িয়ে যাক যেখানে জ্ঞানার্জনের সুযোগের বড় অভাব।

লিঙ্গ সমতার মতো বিষয়গুলোও এই বিদ্যালয়ে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে শেখানো হয়। পরিবেশ এবং সেটি রক্ষার্থে দৈনন্দিন সামগ্রীর পুনর্ব্যবহার কেবল পড়ানো নয়, রীতিমতো হাতেকলমে চর্চা করা হয় কোকোনাট স্কুলে। শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন একবেলা খাবার সরবরাহ এবং তাদের নিয়ে নিয়মিত ক্যাম্পিং শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি বিদ্যালয়টির সুবিবেচনার পরিচায়ক।

কোকোনাট স্কুল মূলত পরিচালিত হয় গণঅর্থায়নে। ফেসবুকের একটি পোস্টই এর জন্য যথেষ্ট। শুধু অর্থ কেন, শিক্ষক থেকে শুরু করে দেয়াল তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৫০টি টায়ার, সবই জোগাড় করা হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্যে।

তবে এর বাইরেও বিদ্যালয়টি একটি জাদুঘরে রূপ নিয়েছে, যা দেখবার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে এবং এক ডলার খরচায় বিদ্যালয়টি ঘুরে দেখতে পারে। প্রতিষ্ঠাতা অউক ভ্যান্ডে পুরো বিষয়টায় বেশ মজাই পেয়েছেন। আর্ট টিভির ডকুমেন্টারিতে তাকে বলতে দেখা যায়, কী অদ্ভুত, তাই না! যে আবর্জনা আপনি ফেলে দিয়েছেন, তা দেখবার জন্যই আবার এক ডলার খরচ করছেন!

যাদের নিয়ে এত আয়োজন, কিরিরমের সেই শিশুরা কোকোনাট স্কুল নিয়ে কী বলছে? এএফপিকে বানথন নামের এক শিশু জানাচ্ছে, ভিক্ষা করা ছেড়ে দিয়েছি। মনে হচ্ছে, আমার জীবনে আরেকটি সুযোগ এসেছে।

অউক ভ্যান্ডে স্বপ্ন দেখেন আজ থেকে ৫-১০ বছর পর যখন এই শিক্ষার্থীরা কোকোনাট স্কুল ছেড়ে যাবে, তখন সচেতন এক প্রজন্মের তৈরি হবে যারা পরিবেশ-প্রকৃতি নিয়ে ভাববে। কেননা তার ভাষ্য, যখন আপনি প্রকৃতি ধ্বংস করছেন, আপনি একটি প্রজন্ম ধ্বংস করছেন।

কৌরিত্র তীর্থ বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২য় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।

kouritra001tirtha@gmail.com

Share if you like