Loading...
The Financial Express

আবদুল কাদের শাহী হালিম: বারবার খেয়েও আবেদন ফুরোয় না

| Updated: July 14, 2022 17:29:24


আবদুল কাদের শাহী হালিম: বারবার খেয়েও আবেদন ফুরোয় না

মোহাম্মদপুর টাউন হলের সামনে এলেই বিকেলের পর থেকে চোখে পড়তে থাকে সারিবদ্ধ বিভিন্ন দোকান। এখানে থাকা বেশিরভাগ দোকানই বার্গারের। আছে ডাউন টাউন বা নিউ সিঙ্গাপুরের মত ভ্যান দোকান। তবে এসবেরও আগে, সবচেয়ে বামে চোখে পড়ে একটি হালিমের ভ্যান - কালো কালিতে উপরে লেখা আছে - আব্দুল কাদের শাহী হালিম।

স্থানীয়দের কাছে আব্দুল কাদের পরিচিত 'কাদের ভাই/কাদের মামা' নামে। টাউনহলের এই ভ্যানগুলোর ভেতর সবচেয়ে পুরাতনটি তারই। তাই স্থানীয়দের কাউকে আর আলাদা করে এটি চিনিয়ে দিতে হয় না।

প্রতিদিন বিকেলের পর থেকেই শুরু হয়ে যায় ভিড়। টুপি-পাজামা-পাঞ্জাবী পরিহিত দীর্ঘ দাঁড়ির একজন বয়স্ক লোক একের পর এক বাটিতে হালিম তুলছে আর বিক্রি করছে। এই ভদ্রলোকই আবদুল কাদের।

তার সাথে আছেন দুজন সহযোগী। একজন তার ভাগ্নে ও জামাতা সাইফুল ইসলাম৷ আরেকজন মো. আবুল কাশেম।

আবদুল কাদেরের অনুপস্থিতিতে সাইফুল ইসলামই সাধারণত হালিম পরিবেশনার কাজ করেন।  

এখানে হালিম পাওয়া যায় গরুর মাংস দিয়ে ৩০ টাকা, ৫০ টাকার। আর নলি হালিম পাওয়া যায় ৭০ টাকা ও ১২০ টাকার।

তাদের মূল খ্যাতি মূলত এই নলি হালিমের জন্যই।

হালিমের জন্য তারা তিন-চার রকম ডাল ব্যবহার করেন। যেমন - মুগ, মসুর, বুটের ডাল। চড়া জ্বালে দীর্ঘসময় থাকার ফলে ডাল খুব ভালো সিদ্ধ হয়। আর সাথে আছে সুসিদ্ধ গরুর মাংস। ফলে এই হালিম স্থানীয়দের ভেতর লাভ করেছে তুমুল জনপ্রিয়তা।

স্বল্পভাষী সাইফুল ইসলাম ব্যস্ত ছিলেন হালিম পরিবেশন নিয়েই। বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরও দিচ্ছিলেন খুব অল্পকথায়। যেমন - "হালিম প্রতিদিন কত বিক্রি হয়, এটা তো বলতে পারি না। তবে অনেক হয়।"

আসলে প্রতিদিনই বিশাল এক সসপেনের পুরোটাই বিক্রি হয়। সে হিসেবে দৈনিক প্রায় ২৫-৩০ কেজির মত হালিম অনায়াসে বিক্রি হয়ে যায়।

তাদের নলি হালিমের তুমুল জনপ্রিয়তার অন্যতম বড় কারণ হলো, নলির ভেতরে মজ্জা পাওয়া যায়। এছাড়া ৭০ টাকার হালিমে মজ্জা না থাকলেও পায়ের দিকের মাংস বা রগ একেবারে সুসিদ্ধ ও নরম করা হয়। ফলে এটি বেশ তৃপ্তিদায়ক হয়ে ওঠে ভোক্তাদের কাছে।

সহকারী আবুল কাশেমকে মনে হলো বেশ আলাপি মানুষ। উনি বেশ মজাচ্ছ্বলে বললেন, "কাদের মামা তো ওনার (সাইফুল) খালু প্লাস শ্বশুর। এনার বাড়ি হইলো রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ওদিকে - কক্সবাজার। আর কাদের মামা হইলেন নোয়াখালীর।"

দোকানের শুরু নিয়ে তিনি বললেন, "আমরা তো বেশিদিন হলো কাজ করতেছি না। যদ্দুর জানি, টাউন হলের এখানে দোকানটা আছে ২৫ বছরের বেশি। আর এমনিতে দোকান তো ৩৫-৩৬ বছরের হবে। আগে ওই যে খাম্বাটা দেখতেছেন, (সামনে বামদিকের খাম্বা দেখিয়ে) ওখানে দোকান ছিল। পরে এখানে শুরু। তখন তো এই একটা দোকান ছাড়া এদিকে আর কোনো এরকম দোকান ছিলো না। বার্গারের দোকানগুলা বহু পরের।"

তাদের হালিমকে শাহী হালিম বলার কারণ কী? এ নিয়ে দুজনেই বললেন, "আমাদের স্পেশাল মসলা আছে। যেমন - দুইরকম লবণ, শুকনা মরিচ আর লবণ মিলায়ে মসলা, পেঁয়াজ বেরেস্তা, কাঁচা মরিচ কুচি, তেঁতুল টক। তবে টক না চাইলে দেয়া হয় না। হালিমে সব একসাথে মিশালে তখন শাহী একটা ফিলিংস পাওয়া যায়।"

আব্দুল কাদের এখনো নিজেই হালিম বানানোর সবকিছু তদারক করেন। মাংস তারা কেনেন সামনের বাজার থেকে। রান্না করেন সবাই মিলে। প্রতিদিন বিকেল পাঁচটা থেকে রাত সাড়ে দশটার ভেতর হালিম পুরোটাই বিক্রি হয়ে যায়। নলি শেষ হয়ে যায় রাত নয়টার মধ্যেই৷

আব্দুল কাদেরের এই হালিম কোনো চেইন শপ বা বড় ব্র‍্যান্ড না হতে পারে, তবে পঁয়ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্থানীয়দের তৃপ্ত করতে পেরে আনন্দিত তারা। সাম্প্রতিক সময়ে ফুড রিভিউ-ফুড ভ্লগিংয়ের বেশ ভালো সময় চলছে। তাই এখন দূর-দূরান্ত থেকেও লোকেরা স্বাদ নিতে আসেন এই হালিমের।

আব্দুল কাদের আশা রাখেন, জীবদ্দশায় তার হালিমের মান অটুট থাকবে। একবার খেলে আরেকবার খেতে অবশ্যই মন চাইবে।

মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত।

mahmudnewaz939@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic