২০১৭ সালে আমি কংগ্রেস কর্মীদের প্রতিনিধিদলের অংশ হিসেবে কাবুলের রাজধানী হামিদ কারজাই বিমানবন্দরে পৌঁছাই। বিমানবন্দর থেকে মার্কিন দূতাবাস মাত্র চার মাইল দূরে হওয়া সত্ত্বেও নিরাপত্তার কারণে আমাদেরকে হেলিকপ্টারে করে সেখানে নিয়ে যাওয়া হলো। নিরাপত্তার কারণেই কোটি কোটি ডলার ব্যয়ে সড়কের পরিবর্তে সম্প্রতি এই যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। হেলিকপ্টারে চেপে যাওয়ার পথে বুঝতে পারলাম, হাজার হাজার মার্কিন সেনার মদদপুষ্ট আফগান নিরাপত্তাবাহিনী আফগানিস্তানের রাজধানীর কেন্দ্রস্থলকেও নিরাপদ করে তুলতে পারেনি।
গতকাল (১৫ আগস্ট কাবুল পতনের পরদিন লেখা ) কাবুলের পতন ঘটেনি। আমেরিকা এবং তার আফগান অংশীদাররা সত্যিকার অর্থে কখনোই গোটা আফগানিস্তান বা এর রাজধানী পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। জো বাইডেনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করার আগেই আমেরিকার সাথে তালেবানের চুক্তি হয়। এতে বলা হয়, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেনা সরিয়ে নেবে এবং সেখানকার সেনা সংখ্যা সবচেয়ে কমে নামিয়ে আনবে। এরপর তালেবানকে ওতপেতে কেবল অপেক্ষা করতে হয়ছে।
ক্যাপিটল হিলে কাজ করার অংশ হিসেবে গত ১৪ বছরে আমি কংগ্রেসিয় ভুরি ভুরি বৈঠকে যোগ দিয়েছি। তাতে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসার বিষয়কেই জোর দেয়া হয়েছে। প্রতি ব্রিফিং-এর শুরুতেই আফগানিস্তানের বিরাজমান ঠুনকো ও নাজুক পরিস্থিতি তুলে ধরে কঠোর মূল্যায়ন করে মার্কিন গোয়েন্দা সম্প্রদায়। প্রবীণ এবং জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা নেতারা তারপর ব্যাপক আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তাতে মনে হয়েছে, আফগানিস্তানে মার্কিনবাহিনীর দায়িত্ব পালনে অগ্রগতি হচ্ছে। তাদের সামনে বাধার বিন্ধ্যাচল রয়েছে জেনেও তাদেরকে এ দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হয়েছে।
কাবুল পতনের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অনেক সমালোচক নানা জল্পনা-কল্পনা বা রূপকথা নিয়ে হাজির হচ্ছেন। তাদের কেউ কেউ বলছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র আরো শক্তি প্রয়োগ করতো, আরো দৃঢ় ইচ্ছা শক্তি দেখাতো, আরো কয়েক মাস আফগানিস্তানে থাকতো তাহলে তালেবান ভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নিতে বাধ্য হতো। সাবেক মেরিন জেনারেল এবং আফগানিস্তানে মোতায়েন বাহিনীর অধিনায়ক জন অ্যালেন গত সপ্তাহে তর্ক করেছিলেন যে বাইডেনের প্রকাশ্য একটি রেডলাইন বা লালরেখা ঘোষণা করা দরকার ছিল। কেবল এমন একটি ঘোষণা দিলেই আফগান সরকারকে সহায়তা করা হবে এবং তালেবানের অগ্রাভিযান থামবে। অন্যদিকে, আফগানিস্তানে মার্কিন সাবেক রাষ্ট্রদূত রেয়ান ক্রোকার দেশটি থেকে সাড়ে তিন হাজার মার্কিন সেনা সরিয়ে আনার সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেন। আর আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইন্সটিটিউটের ফ্রেড কাগান দাবি করেন, আফগানিস্তানে অনির্দিষ্টকালের জন্য আমেরিকার সেনাবাহিনী মোতায়েন রাখা হলে তা যথাযথ হতো।
গত এক দশকে আফগানিস্তানে যেসব ঘটনা ঘটেছে এবং মে মাসের ঘোষণার প্রভাবকে এসব সমালোচনা পুরোই উপেক্ষা করছে। তাছাড়া, বাইডেনের কট্টর সমালোচকরা স্বীকার করতে বাধ্য হন যে আফগানিস্তান থেকে শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সরে আসতে হতো। আমেরিকার সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালের চেয়ে চলতি বছর তালেবান অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে আফগান প্রতিরক্ষাবাহিনী ব্যাপকভাবে নেতিয়ে পড়েছে। একপর্যায়ে আফগান সরকারের ওপর তালেবানের হামলা অনিবার্য ছিল। মার্কিন সেনাবাহিনী সে সময় লড়াইরত দুপক্ষের মধ্যে গিয়ে পড়ত। এ অবস্থায় আফগানিস্তানে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করা বা সেখান থেকে সরে আসার বিষয়ে মার্কিন সরকারকে ভাবতে হতো।
কোনো কোনো সমালোচক বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো আফগানিস্তানেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু সেনা মোতায়েন রাখা উচিত ছিল। বর্তমান বিশ্বে অনেকগুলো অশাসিত এলাকা আছে, এসব এলাকা আফগানিস্তানের মতোই আমেরিকার জন্য মহা-হুমকি না হলেও অন্তত হুমকি হয়ে দেখা দিচ্ছে। কিন্তু সেসব এলাকায় মার্কিন সেনা মোতায়েনের মতো আহ্বান তেমন কেউ করছেন না। যে প্রকল্প ব্যর্থ হতে বাধ্য সেখানে সেনা মোতায়েন রাখার চেষ্টা করা হলে তার আর্থিক ও সামরিক একটা খরচ গুণতে হয়।
কোনো দেশ বা এলাকা থেকে সরে আসায় মার্কিন বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়েছে বলে সাধারণত যে জিগির তোলা হয়, শেষ পর্যন্ত, তাই তুলছেন সমালোচকরা। নিউইয়র্ক টাইমসের এক শিরোনামে বলা হলো, আফগানিস্তানের ঘটনা প্রবাহ হয়ত মার্কিন বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর আরেকটি আঘাত হানবে। ওয়াশিংটন পোস্টেরও একই সুর শোনা গেল, আফগানিস্তানের পতনে অন্যান্য ফ্রন্টে মার্কিন প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলবে মিত্ররা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছরের বেশি সময় ধরে লড়াই চালিয়ে গেছে। এ যুদ্ধে মার্কিন করদাতাদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে এবং হাজার হাজার মার্কিন সেনা হতাহত হয়েছে। এ ধরণের প্রতিশ্রুতির পরও যদি বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি থাকে, তবে ওয়াশিংটন যথাসাধ্য চেষ্টা করছে সে কথা মার্কিন মিত্ররা কখনোই আর বিশ্বাস করবে না। সমালোচকরা একইভাবে বলেছিলেন যে ভিয়েতনাম থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়া হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষতি হবে। কিন্তু বাস্তবে, ভিয়েতনাম থেকে সরে আসার কারণে নয় বরং সামরিক দিক থেকে সাধ্যাতিরিক্ত মোতায়েনকে কেন্দ্র করেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে জাপান ও অন্যান্য মিত্র। সেনা সরিয়ে নেওয়া হলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষতি হয় না; তৎপরতা সংহত করা হলে বরং এটি আরো বাড়ে।
আফগানিস্তানে অবস্থানের ইতি টানার বহু সুযোগ গত ২০ বছরে যুক্তরাষ্ট্র পেয়েছে। আফগানিস্তানে অভিযান চালানোর পরপরই তালেবান আত্মসমর্পণ করার প্রস্তাব নাকি দিয়েছিল কিন্তু তা নাকচ করে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ২০১১ সালের আলোচনাকে আঁতুড়েই গলা টিপে মারে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং উদ্বিগ্ন পেন্টাগন। প্রেসিডেন্ট বাইডেন সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে বের করার সাহস দেখিয়েছেন। কিন্তু অন্যেরা শুধু স্থিতাবস্থা বজায় রাখার জন্য প্রাণপণে যুদ্ধ করেছে।
আফগান বিপর্যয়ের ক্ষয়-ক্ষতিকে সীমিত রাখার লক্ষ্যকে কেন্দ্রবিন্দু করে এবারে নীতিনির্ধারকের সচেষ্ট হওয়া উচিত। প্রথমেই আসে কংগ্রেসের কথা। জেসন ক্রো এবং সেথ মোল্টনের মতো সমর্থক প্রতিনিধিদের নেতৃত্বে বিপদগ্রস্ত আফগানদের আমেরিকায় অভিবাসনের অনুমিত দেওয়ার প্রক্রিয়া দ্বিগুণ করা উচিত।
দ্বিতীয়ত, আফগানিস্তানের ক্ষতিকে সীমিত রাখতে পাকিস্তান এবং আমেরিকার আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে তৎপরতা পুনরায় চাঙ্গা করতে হবে। সন্ত্রাসবাদ দমনে সহযোগিতার জন্য বুশ এবং ওবামা উভয় সরকারের প্রচেষ্টাকে পাকিস্তানের নেতারা এড়িয়ে যান। তার বদলে পাকিস্তানী নেতারা বরের ঘরের মাসি ও কনের ঘরের পিসি সেজে বিপজ্জনক দ্বৈত খেলায় মেতে ওঠেন। হাক্কানিচক্রের মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর দিকে সহায়তার হাত বাড়ান। অন্যদিকে সন্ত্রাসবাদ দমন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে হাতিয়ে নেন। এবারে মার্কিন কর্মকর্তাদের জন্য উচিত হবে পাকিস্তানের সাথে নিছক লেনদেনেরভিত্তিতে কাজ করা। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো আশ্রয় নিয়ে পাকসীমান্তকে যেন ব্যবহার করতে না পারে সে কাজ করতে গেলে খরচ কী হবে তাই পাকিস্তানি নেতাদের কাছে আমেরিকার জিজ্ঞাসা করা উচিত।
আবার, আফগানিস্তানে রণ-তৎপরতা চালাতে যে আন্তর্জাতিক-জোট কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে, এবারে নবউদ্দেশ্য ও তৎপরতাকে সামনে রেখে সে কাঠামো নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে। একে টেকসই কূটনৈতিক মিশনের রূপ দিতে হবে। আফগানিস্তানের ভূমিতে এ মিশন নজরদারিতে সক্রিয় থাকবে এবং প্রয়োজ নেতালেবান কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করবে। কাজটা সহজ হবে না, সেনাবাহিনী ছাড়া এমন কাজ করতে গেলে বড়সড়ো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বত হবে। তবে কাজটা মোটেও অসম্ভব নয়। এদিকে ১৯৯৫ সালের পর আফগানিস্তানে নজরদারি বজায় রাখার কাজে যে গাফলতি হয়েছে, এখন নু্ন্যতম নজরদারি বজায় রাখা সম্ভব হলে তার থেকেও ভালো ফল পাওয়া যাবে।আর সবশেষে, তালেবানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া জাতিসংঘভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটকে বজায় রাখতে হবে।নারী ও হাজারা শিয়া-মুসলমান জনগোষ্ঠীসহ সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর অধিকার রক্ষায় কাবুলের নতুন সরকারকে চাপে রাখতে এ নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখতে হবে।
অনেকগুলো খারাপ সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুখোমুখি হতে হয়েছে বাইডেনকে। কিন্তু শেষ অব ধিতিনি আমেরিকানদের জীবন রক্ষার জন্য অতি দরকারি কিন্তু বেশ কঠিন সিদ্ধান্তকে বেছে নেন।তাঁর এই সিদ্ধান্ত আফগানিস্তানের জন্য বিপর্যয়কর প্রতিক্রিয়া হয়ে দেখা দেবে। মার্কিন সরকার কী করে আরো ভালোভাবে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারত সে বিষয়ে ভবিষ্যতে জানতে পারব। কিন্তু ২০১৭ সালে আমি নিজেই দেখেছি, এবং আরো অনেকেই চাক্ষুষ করেছেন, আফগানিস্তানে আমেরিকাসমর্থিত সরকার সত্যিকার অর্থে গোটা দেশকে কখনোই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। বাইডেন আফগানিস্তান থেকে কেবল সেনা সরিয়ে আনার সিদ্ধান্তই নেননি তিনি দীর্ঘদিনের এ বাজে বাস্তবতাকেও স্বীকার করেছেন। পূর্ববর্তী অর্থাৎ সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকারের সেনা সরিয়ে আনার ঘোষণা বাইডেনের তৎপরতাকে কেবল দ্রুততর করেছে।
[ড্যানিয়েল সিলভারবার্গ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা এবং কিছুদিন আগে পর্যন্ত হাউসসংখ্যাগরিষ্ঠনেতার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্বপালন করেন। দ্য আটলান্টিকে প্রকাশিত নিবন্ধের বাংলা রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]