আচ্ছা, আপনাদের সুকুমার রায়ের সেই অবাক জলপানের পথিককে মনে আছে? যে লোকটা চৈত্রের দুপুরের কাঠফাটা রোদে হাঁটতে হাঁটতে তেষ্টায় মৃতপ্রায় হয়ে একটি পাড়ায় ঢুকে এরওর কাছে পানির সন্ধান করছিল, অথচ কেউ তাকে জল দিচ্ছিল না? শেষমেষ ভদ্রলোক তো আর সহ্য করতে না পেরে সেই ভয়ংকর গোবেচারা ছোটমামাকে একরকম বোকা বানিয়েই এক গ্লাস পানি গলায় ঢেলে তেষ্টা মেটালেন।
এখন কথা হচ্ছে, এই যে অনেকক্ষণ পানি না খেলে সেই পথিকের মতোই আমাদেরও যে প্রাণ আইঢাই করে, গলা শুকিয়ে যায়, মাথা ঝিমঝিম করে, এর কারণখানা কী? কারণ আর কিছুই নয়, আমাদের শরীরের শতকরা ষাটভাগই পানি কিনা; বেশিক্ষণ পানি না খেয়ে থাকলে নানা উপায়ে সেই পানির অনেকটুকুই উবে যায়, তখনই শুকনো গলা, প্রাণে আনচান ভাব- এসব হয়। তাই একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি খেয়ে শরীরের মধ্যকার পানির পরিমাণটা ঠিকঠাক রাখতে হয়। অতএব, এ কথা হলফ করে বলে দেয়া যায় যে, পানি পানের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু, পানি পান করাটা ঠিক কীভাবে আমাদের উপকার করে? চলুন, দেখে আসি।
আমাদের শরীরে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে ও মাধ্যমে নানান বিষাক্ত পদার্থ জমা হয়। প্রচুর পানি পান করার প্রথম সুবিধাটা হচ্ছে, পানি এসকল জমে থাকা বিষাক্ত পদার্থকে ঘাম এবং মূত্রের সাহায্যে বের করে দিয়ে শরীরকে সুস্থ রাখে, নচেৎ এসব বিষাক্ত পদার্থ জমতে জমতে প্রাণঘাতী হওয়াটাও বিচিত্র ছিল না।
আমাদের ত্বকের মধ্যবর্তী স্তরে কিছু পানি সবসময়ই মজুদ থাকে। এই পানিই একটা সময় ঘর্মগ্রন্থি দিয়ে ত্বকের বাইরে বেরিয়ে আসে, তাকে তখন আমরা বলি ঘাম। এই ঘাম যখন ত্বকের ওপর থেকে বাষ্পীভূত হয়ে যায়, তখন তার সাথে শরীরের মধ্যে থেকে কিছু তাপও বেরিয়ে যায়। এতে করে শরীরের তাপমাত্রা কমে, শরীর ঠাণ্ডা থাকে। ঠিক এজন্যই খেয়াল করে দেখবেন, প্রচণ্ড ঘর্মাক্ত অবস্থায় ফ্যান বা এসি চালিয়ে বসলে একটু পর শরীরটা বেশ ভালোরকম শীতল হয়ে যায়।
পানি আমাদের বিপাকীয় প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে এবং খাদ্যকণা ভেঙে সরল খাদ্য উপাদানে পরিণত করতে সহায়তা করে। তাছাড়াও, ঈষদুষ্ণ পানি হজমের জন্য খুব ভালো সহায়ক হিসেবে কাজ করে। যদি পরিমাণমতো পানি পান করা না হয়, তবে তা বিপাকে ও হজমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শরীর তখন সেই পানির ঘাটতি পূরণ করে পরিপাক হতে থাকা খাদ্য থেকে পানি শুষে নেয়।, ফলে, সে খাদ্য তখন পানির অভাবে হয়ে ওঠে বেশ কঠিন এবং সহজে সামনে এগোয় না, যার ফলে কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা তৈরি হয়।
আপনি কি নিজের ওজন বৃদ্ধি নিয়ে চিন্তিত? চিন্তার কোনো কারণ নেই, প্রত্যেকবেলা খাওয়ার আগে যদি আপনি দু’গ্লাস পানি পান করতে পারেন, তবে কিছুদিনের মধ্যেই হাতেনাতে ফল পেতে শুরু করবেন। পানি খাওয়ার ফলে আপনার ক্ষুধা অনেকটাই প্রশমিত হবে, আপনি চাইলেও খুব বেশি খেতে পারবেন না। তাছাড়া, পানি শরীরের চর্বিকোষ বা ফ্যাট সেল ভাঙনের হার অনেকটুকু বাড়িয়ে দেয়। ফলে, এভাবেও ওজন কমানোর জন্য পানি যথেষ্ট সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
পানি পানেরর ফলে আমাদের শরীর যখন যথেষ্ট আর্দ্র থাকে, তখন ত্বকস্থিত কৈশিক নালীগুলোতে রক্তপ্রবাহের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এতে করে ত্বক সুস্থ ও সুন্দর দেখায়। তাছাড়া, পানি ত্বকের নমনীয়তাও বৃদ্ধি করে।
পরিশ্রম করার পর ক্লান্ত অবস্থায় শরীরে পানির পরিমাণ কমে গেলে রক্তের ঘনত্বও কমে যায়, এতে করে আমাদের হৃৎপিণ্ডকে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত পাম্প করার জন্য অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। এতে করে অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে পড়ে। তাই, এসময় পানি পান করলে রক্ত তার ঠিকঠাক ঘনত্ব ফিরে পায় এবং একইসাথে ক্লান্তিও দূর হয়।
মুখে দুর্গন্ধ? রবারের মতো মাউথ রিফ্রেশিং চুইংগাম না চিবিয়ে পানি পান করুন। মুখের মধ্যে থাকা যেসব ব্যাকটেরিয়া এবং পঁচে যাওয়া খাদ্যকণা দুর্গন্ধের সৃষ্টি করে, পানি সেগুলোকে ধুয়ে নিয়ে যায় ও মুখকে আর্দ্র রাখে। ফলে দুর্গন্ধ অনেকাংশেই কমে আসে।
তাছাড়া আপনার যদি মাথাব্যথা এবং মাইগ্রেনের সমস্যা থাকে, তাহলে বেশি বেশি করে পানি পান করুন, কারণ শরীর পানিশূন্য থাকা অবস্থাতেই মূলত এসব সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। ইউরোপিয়ান জার্নাল অব নিউরোলজির একটি গবেষণা থেকে জানা যায়, আপনি যদি আপনার দৈনিক পানি পানের পরিমাণ বৃদ্ধি করেন, তাহলে মাথাব্যথার স্থায়িত্ব এবং তীব্রতা আস্তে আস্তে কমে আসবে।
তাছাড়া অনেকগুলো গবেষণায় এটাও পাওয়া গেছে, আমাদের শরীর যদি মাত্র এক থেকে দুই শতাংশও পানিশূন্য হয়, তবে তা আমাদের মেজাজ ও চিন্তাশক্তিতেও অনেক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অতএব, মন-মেজাজ ঠিক রাখতে অবশ্যই বেশি বেশি পানি পান করুন।
তবে, পানি পান করা ভালো বলেই যে যখন তখন যত ইচ্ছা তত পানি পান করে ফেলা যাবে, তা কিন্তু নয়। অতিরিক্ত পানি পান নানাভাবে আমাদের শরীরে কুপ্রভাবও ফেলতে পারে। অতিরিক্ত পানি পান করলে প্রচণ্ড ঘাম হতে পারে, এমনকি এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী রোগেও পরিণত হতে পারে। একটা পর্যায়ে এমনও হয় যে, এ সমস্যা থেকে বাঁচার জন্য রোগীরা এমনকি তাদের ঘর্মগ্রন্থিও সার্জারির মাধ্যমে বাদ দিয়ে দিতে চান। অবশ্যই এটি একটি বিব্রতকর সমস্যা, এবং এ সমস্যা এড়াতে চাইলে অবশ্যই অতিরিক্ত পানি পান করা যাবে না।
এছাড়া, অতিরিক্ত পানি পান করলে ঘুমের সমস্যাও হতে পারে। আমরা যখন ঘুমোই, আমাদের মস্তিষ্ক ADH নামের একটি হরমোন নিঃসরণ করে, যা মূলত ঘুমের সময়টুকুর জন্য আমাদের বৃক্কের কার্যক্ষমতা অনেকটুকু কমিয়ে দেয়। এতে করে ঘুমের মধ্যে আমাদের প্রস্রাবের বেগ অনুভূত হয় না। কিন্তু অতিরিক্ত পানি পানের পর ঘুমোতে গেলে কিছুক্ষণ পরই মূত্রথলী পূর্ণ হয়ে প্রস্রাবের বেগ সৃষ্টি হয়। এজন্য ডাক্তাররা ঘুমের অন্তত দু-তিন ঘণ্টা আগে দিনের শেষবারের মতো এবং পরিমিত পরিমাণে পানি পান করার নির্দেশ দিয়ে থাকেন।
অনেক পরিশ্রম করে আসার পর সাথে সাথেই পানি পান করা কিন্তু একদম উচিত নয়, প্রচণ্ড তেষ্টা পেলেও নয়। কারণ এই কাজটি হতে পারে প্রাণঘাতী, অতি মাত্রার পরিশ্রমের পর অতিরিক্ত পানি পান করে ফেলায় ২০১৫ সাল থেকে আজ পর্যন্ত অন্তত ১৪ জন মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন! মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন যোগব্যায়াম কিংবা অন্যান্য খেলাধুলা করে আসা কয়েকজন ব্যক্তি, এমনকি একজন ম্যারাথন দৌড়বিদও। সুতরাং, নিজেকে যদি একজন ম্যারাথন রানারের থেকেও শক্ত মনে না করেন, অবশ্যই ব্যায়াম কিংবা অন্য যেকোনো পরিশ্রমের পরই ঢকঢক করে পানি পান করতে যাবেন না।
এখন কথা হচ্ছে, এই যে বারবার পরিমিত পানি পান করার কথা বলা হচ্ছে, এই পরিমিত পরিমাণ ঠিক কতটুকু? তা জানার জন্য, আপনার ওজনকে পাউন্ডে পরিমাপ করে দুই দিয়ে ভাগ করতে হবে। ভাগফল যে সংখ্যাটি আসবে, রোজ ঠিক তত আউন্স পানিই আপনার পান করা সমীচীন। যেহেতু প্রাপ্তবয়স্ক মানুষদের গড় ওজন ১৩০ পাউন্ডের কাছাকাছি, আর একটি গ্লাস মোটামুটি আট আউন্স পানি ধারণ করতে পারে, অতএব, আপনি মোটামুটি একদিনে আট গ্লাসের মতো পানি অক্লেশে পান করতে পারেন।
ছোটবেলা থেকে বইপত্রে নানানভাবে, নানান ভাষায় আমরা এটিই জেনে আসছি যে, পানির অপর নাম জীবন। যে পদার্থটি দ্বারা শরীরের মোটামুটি ষাট শতাংশ পূর্ণ হয়ে আছে, তাকে উপেক্ষা করা খুব একটা জ্ঞানীব্যক্তির কাজ নয় কিন্তু। কাজেই অতিরিক্ত পানি পানের কুফলগুলো মাথায় রেখে সঠিক পরিমাণে, সঠিক নিয়মে পানি পান করুন, সুস্থ থাকুন!
শুভদীপ বিশ্বাস তূর্য শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগ, তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।
shuvodipbiswasturja1999@gmail.com
