Loading...

অবসাদ সারবে বিদ্যুৎ-চিকিৎসায়!

| Updated: October 20, 2021 19:30:14


সারাহর মস্তিস্কে বসানো স্পন্দক-যন্ত্র পরীক্ষা করছেন প্রফেসর ক্যাথেরিন    সারাহর মস্তিস্কে বসানো স্পন্দক-যন্ত্র পরীক্ষা করছেন প্রফেসর ক্যাথেরিন  

[চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় রোগটির নাম, ডিপ্রেশন। বাংলা একাডেমির চিকিৎসাবিদ্যা পরিভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে, অবসাদ বা বিষণ্ণতা। মনের অসুখের অবস্থা বোঝাতে অনেকেই ব্যবহার করেন উদ্বেগ এবং হতাশাও। যাই হোক, বিষণ্ণতা একটি রোগ সে কথা আমরা অনেক আগেই জেনেছি একটি বিতর্কিত বিজ্ঞাপনের গুণে। কিন্তু রোগের চিকিৎসা সহজ নয়। অনেক সময় আদৌ কোনো চিকিৎসাও নেই।]

এক.

সম্প্রতি বিষণ্ণতা বা অবসাদ রোগের চিকিৎসায় যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। রোগীর মস্তিষ্কে ইলেকট্রোড বা বিদ্যুৎদ্বাহক কিংবা বিজলী-তারের প্রান্তভাগ বসিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে পাওয়া গেছে সুফল। প্রায় চিকিৎসাহীন এ রোগকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার পদ্ধতিটি স্বস্তির সুবাতাস বইয়ে দিয়েছে মানসিক চিকিৎসার জগতে।   এ প্রকল্পে জড়িত স্নায়ুবিজ্ঞানীদেরকে অবশ্য এখনি ব্যাপক আশাবাদের পাল না তুলতে বললেন অনেক বিশেষজ্ঞজন।

দুই.

পাঁচ পাঁচটি বছর প্রতিদিন চিকিৎসাহীন এবং মারাত্মক অবসাদ বা বিষণ্ণতা রোগের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন সারাহ। ৩৬ বছর বয়সী ক্যালিফোর্নিয়ার এই মেয়ে জানান, “ঘণ্টায় কয়েকবার করেই আত্মহত্যার বদ মন্ত্রণা মনের মধ্যে চাগিয়ে উঠত। সেই মন্ত্রণাকে দমন করতে হতো আমাকে।”

এ সময়ে সান ফ্রানসিকোর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (ইউসিএসএফ)’এর একটি অস্ত্রোপচার দল এগিয়ে এলো। পাতলা বিজলী-তারের এক প্রান্ত মগজের গভীরে বসিয়ে দিল তারা। তারপর হালকা বিদ্যুৎ তরঙ্গ বইয়ে দেওয়া হলো। “প্রথম যখন বিদ্যুৎ-উদ্দীপনন বা উত্তেজনা বইয়ে দেওয়া হলো তখন ‘আহা!’ বলার সুখানুভূতির সময় এসে গেল।” নিজের প্রথম নামেই পরিচিত হতে ইচ্ছুক সারাহ আরো বলেন, “গভীর আনন্দ-আবেশের স্পর্শ-সুখে অবসাদকে মনে হলো এক দূরবাসী দুঃস্বপ্নের দানব। মুহূর্তের জন্য এমন অনুভূতি উপভোগ করলাম।”

সারাহর মস্তিষ্কের কোনো অংশ নেতিবাচক অনুভূতিকে উস্কানি দেয় খতিয়ে সেটি বের করলেন ইউসিএসএফের চিকিৎসা-বিজ্ঞানীর দলটি। একই সাথে উপশমকারী উদ্দীপনার সাড়া কোথা থেকে আসবে তাও বের করলেন তাঁরা। সারাহর মগজে বসিয়ে দিলেন স্থায়ী স্পন্দক-যন্ত্র। এটি নিউরাল পেসমেকারের দায়িত্বে রইল। এক বছর এ যন্ত্র বহন করার পর সারাহ জানালেন, “অবসাদকে দমিয়ে রেখেছে এটি, আর জীবন-যাপনের উপযোগী জীবন-ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ফিরে এলাম নিজের সব সেরা পর্যায়ে।” 

ইউসিএসএফ গবেষক-দলটি মস্তিষ্কের গভীরে এমন বিদ্যুৎ-চিকিৎসা বা নিউরাল ইলেকট্রনিক্সের সফলতায় তাদের কৃতিত্বে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। এ বছর ৪ অক্টোবর, সোমবার নেচার মেডিসিনে তাদের সফলতার গাঁথা প্রকাশিত হয়। অবসাদে আক্রান্তের চিকিৎসায় রোগীর জন্য ব্যক্তিগত-পর্যায়ে চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে বিদ্যুৎ-চিকিৎসার বিকাশ ঘটানোকে চিকিৎসা শাস্ত্রের জগতে উল্লেখযোগ্য সফলতা বলে ধরে নেওয়া হয়। এই প্রথম চিকিৎসক দল এমনটি একটি বিদ্যুৎ-যন্ত্র তৈরিতে সফল হয়েছেন যা একান্তভাবেই রোগীর উপসর্গ-ভিত্তিক চিকিৎসা দেবে। এর আগে এ জাতীয় চিকিৎসার বিদ্যুৎ-যন্ত্র ব্যক্তিরোগীর উপসর্গ কেন্দ্রিক হয়নি। বরং এক দিয়ে যন্ত্রে সবার চিকিৎসার প্রয়াসই কেবল চালানো হয়েছিল।

নতুন চিকিৎসা পদ্ধতিটি যে উল্লেখযোগ্য সে কথা মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেন সারাহর চিকিৎসা-প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত নন এমন সব স্নায়ুচিকিৎসকও। তবে সতর্কবার্তাও শোনা যায় তাঁদের মুখে। তারা জানান, সামনে বাকি অনেক পথ। সময় এবং টাকাকড়ি- দুই দিক থেকেই ব্যয়বহুল রোগটির নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি। একে সহজে ব্যাপক প্রয়োগের উপযোগী করে তুলতে গবেষণা-কাজ করতে হবে বহু বছর। 

মানসিক অন্যান্য রোগাক্রান্ত ব্যক্তিরাও এই ব্যক্তিনির্ভর গভীর মস্তিষ্ক উদ্দীপন বা ডিপ ব্রেইন স্টিমুলেশন( ডিবিএস)-এর সুফলের ভাগীদার হবেন। একই সাথে পারকিনসন্স’স ব্যাধি বা মৃগীরোগের চিকিৎসায়ও ব্যবহার হচ্ছে ডিবিএস। 

টেক্সাসের বেইলর কলেজ অব মেডিসিনের স্নায়ুশল্যবিদ বা নিউরোসার্জন সমীর শেঠ বলেন, ইউসিএসএফের কাজে তিনি “যারপরনাই উত্তেজনা বোধ” করছেন। তিনি আরো জানান, বেয়াড়া অবসাদ রোগের চিকিৎসায় একই স্নায়ুপ্রযুক্তি বা নিউরোটেকনোলজি ব্যবহার করেছেন তাঁরাও। তাতে প্রথমরোগীর ক্ষেত্রে একই রকম  উৎসাহব্যঞ্জক সুফল পাওয়া গেছে। তবে এ ফলাফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তিনি বলেন, “অনেক রোগীরই ব্যক্তিনির্ভর চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে, এটি আমরা সবাই স্বীকার করি।”

তিন.

বিশ্বজুড়ে অবসাদের রোগীর সংখ্যা বিশাল। এর মধ্যে চিকিৎসার আওতায় এসেছে খুবই কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু-র হিসাবে দুনিয়াতে ২৮ কোটি মানুষ মারাত্মক অবসাদে ভুগছেন। এদের মধ্যে ৩০ শতাংশ প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি যেমন মনোচিকিৎসা, এন্টিডিপ্রেসেন্ট ড্রাগ বা হতাশারোধী ওষুধ এবং ইলেক্ট্রকনভালসিভ নামে পরিচিত বৈদ্যুতিক শকের মাধ্যমে চিকিৎসায় তেমন সাড়া দেয় না। এ দিকে কোভিড ১৯-এর কারণে পৃথিবীতে শিশুসহ সব বয়সের মানুষের মধ্যে অবসাদ বেড়েছে বলে পাওয়া গেছে প্রমাণ।

বিদ্যুৎ শক্তির মাধ্যমে মানসিক রোগ চিকিৎসার প্রথম পদক্ষেপই হলো ইলেক্টোকনভালসিভ চিকিৎসা (ইসিটি) পদ্ধতি। ইউসিএসএফ এবং বেইলরের যে ব্যক্তিনির্ভর ডিবিএস ব্যবহার করা হয়েছে তার সাথে ইসিটি-র মিল নেই।

চিকিৎসা জগতে ইসিটি-কে নিয়ে রয়েছে অনেক কুখ্যাতি। প্রচণ্ড শক দেওয়া হতো বলে এটিকে কখনো কখনো ‘মগজ পোড়ানো’ নামে ডাকা হয়। ইসিটি দেওয়ার সময় রোগীকে অজ্ঞান করার ধার ধারা হতো না। এতে স্মৃতি হারানো, হাড় ভাঙ্গাসহ আরো অনেক পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা যেত। তবে আজকের দিনে ইসিটির আগে রোগীকে অজ্ঞান করে নেওয়া হয়। তারপর মাথায় লাগান ইলেকট্রোডের মাধ্যমে মগজে হালকা বিদ্যুৎ প্রবাহ দেওয়া হয়। এতে অল্প মাত্রায় খিঁচুনি দেখা দিলেও মগজের স্নায়ু বর্তনী বা নিউরাল সার্কিট এবং রাসায়নিক ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজিয়ে দেয়া কাজটি হয়ে যায়। কিন্তু ইসিটি ঠিক কি করে কাজ করে তা সঠিক ভাবে কেউ জানে না। এ চিকিৎসায় সবাই সেরেও ওঠে না। এরপরও একমাত্র আমেরিকায় প্রতিবছর এক লাখ রোগী ইসিটি করে।

চার.

ইউসিএসএফ এবং বেইলরের দলই কেবল প্রথম ডিবিএস নিয়ে সমীক্ষা বা গবেষণা করেনি। এর আগেও সরল যন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে এবং তা দিয়ে রোগীর মস্তিষ্কে বিদ্যুতের মাধ্যমে অব্যাহত উদ্দীপনন যোগান হয়েছে। এ সব গবেষণায় মিলেছে মিশ্রফল। তবে চিকিৎসা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর উদ্যোগে চালানো ডিবিএসের দুই পরীক্ষায় পরিষ্কার ফলাফল পাওয়া যায়নি। তাই পরে ওই পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এ ধরণের একটি পরীক্ষার নেতৃত্ব দেন ম্যাসাচুসেট জেনারেল হাসপাতালের স্নায়ুচিকিৎসা বা নিউরোথেরাপিউটিকস পরিচালক ড. ড্যারিন ডগের্থি। তিনি বলেন, “অবসাদের কারণে ভিন্ন ভিন্ন রোগীর ভিন্ন ভিন্ন অবস্থা হতে পারে এবং সব রোগীকে হরেদরে একই ছাঁচে ফেলে চিকিৎসা করা যাবে- এমন চিন্তাকে সরল বা নির্বোধের ভাবনা বলা যেতে পারে।”

[ফাইনান্সিয়াল টাইমস অবলম্বনে]

Share if you like

Filter By Topic