গত কয়েক মাসে কোভিড-১৯ সংক্রমণের সংখ্যা ও মৃত্যুর হারে উল্লম্ফনের ফলে ব্যবসায়-বাণিজ্যে সাম্প্রতিক সময়ের পুনর্গঠনমূলক প্রচেষ্টাগুলো মুখ থুবড়ে পড়বে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। বেশ কজন ব্যবসায়ী ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের কাছে এ-নিয়ে তাদের গভীর উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।
এমনিতেই বছরজুড়ে চলমান সংকটে দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্য বিরাট ক্ষতির শিকার হয়েছে। যদিও দ্রুত গৃহীত পাল্টা ব্যবস্থাগুলো ব্যবসায়িক কার্যক্রম আবার চালু করতে সহযোগিতা করেছিল। ২০২০ সালের ৩১ মে-এর পর সরকারের তরফ থেকে আর কোনো সাধারণ ছুটির ঘোষণা আসেনি বলে জুন মাস থেকে পুনর্গঠনের কাজে গতি আসে।
এখন প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ কোভিড পরীক্ষার জন্য হাসপাতাল ও সেবাকেন্দ্রগুলোতে ভিড় জমাচ্ছেন। এ-বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে মোট দৈনিক পরীক্ষার ৩ থেকে ৪ শতাংশ কোভিড পজিটিভ শনাক্ত হতেন, সম্প্রতি সেটি পৌঁছেছে ১৪ শতাংশে। ২৩ মার্চ সকাল পর্যন্ত চব্বিশ ঘণ্টায় কোভিড শনাক্তের সংখ্যা ছিল ৩,৫৫৪ জন। গত আট মাসের বেশি সময়ের মধ্যে এটিই একদিনে সর্বোচ্চ আক্রান্তের হিসাব।
গত বছরের ধাক্কা সামলে নেবার জন্য দেশের ব্যবসায়ী মহল ‘নয়া নরমাল বিজনেস পলিসি’ গ্রহণ করে আগামী রমজান ও ঈদ-উল-ফিতরে যাবতীয় ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। এ দুটো মৌসুমই দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে রমরমা সময়। কিন্তু কোভিড মহামারী আবারও তাদের আশা চুরমার করে দেবে ভেবে তাঁরা আতঙ্কিত। এমনকি কোনো ধরনের লকডাউনের ঘোষণা না হলেও মহামারীতে আক্রান্তের সংখ্যা-বৃদ্ধি মুসলিম জনগোষ্ঠীর বৃহত্তম এই উৎসবের আমেজ নষ্ট করে দিতে পারে।
ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদকরা রাজধানীর বেশ কয়েকটি মার্কেটে ঘুরে বিবর্ণ একটি চিত্র দেখতে পেয়েছেন। গত কয়েক দিনে ক্রেতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমতে থাকায় বিক্রেতারা হতাশা প্রকাশ করেছেন। ঢাকা নিউ সুপার মার্কেটের দোকানমালিক শাসসুর রহমান জানালেন, মহামারীর কারণে গত বছর তাঁরা প্রধান সবক’টি কেনাকাটার মৌসুম হারিয়েছেন। সংক্রমণের নিম্নগতি দেখে তিনি গত বছর ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসায়ে খাটিয়ে ক্ষতি পূরণের আশা করছিলেন্।
তিনি বললেন, “কিন্তু এখন আবার দ্রুত পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে। এমনটা চলতে থাকলে আমাদের উপর মহাদুর্যোগ নেমে আসবে।”
গত বছর ব্যবসায় না করতে পারলেও, এবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দিলে সামনে বিক্রির ভালো মৌসুম আসবে এবং পরিস্থিতি বদলে যাবে বলে প্রকাশকরা আশাবাদী ছিলেন। ইউনিভার্সাল পাবলিকেশনের প্রকাশক কাজী শাহ আলম বলেন, দুর্ভাগ্যবশত দ্রুতগতিতে বাড়ছে কোভিড সংক্রমণের হার।
তিনি বলেন, “তাই এখন জানি না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে স্বাভাবিক শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হবে কিনা। ভবিষ্যতে এই ব্যবসায় টিকে থাকা নিয়ে আমরা সত্যিই অনিশ্চয়তায় রয়েছি।”
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হেলালউদ্দিন জানালেন, গত বছর মহামারীর কারণে পহেলা বৈশাখ, ঈদ-উল-ফিতর, ইদ-উল-আযহা ও দুর্গাপূজার মতো প্রধান উৎসবগুলোতে ব্যবসা করতে না পারায় দোকান মালিকরা বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন।
সামনের পহেলা বৈশাখ ও ঈদ-উল-ফিতরে ভালো ব্যবসা করার জন্য সারাদেশের ব্যবসায়ীরা মুখিয়ে ছিলেন। তিনি আরও বললেন, “এবারের ব্যবসা মৌসুমগুলো হারালে ভয়ানক দুর্যোগ নেমে আসবে আমাদের উপর। ঋণ শোধ করতে পারবেন না অনেকেই, তাই ব্যবসা একদম পুরোপুরি গুটিয়ে ফেলতে হতে পারে।”
হেলালউদ্দিন এ-ও জানালেন যে, সমিতির তরফ থেকে ইতোমধ্যে সবগুলো শপিং মল ও দোকানে স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত নির্দেশনা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে ভাইরাস ছড়াতে না পারে।
অত্যন্ত সংক্রামক নতুন করোনাভাইরাসের সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বমুখীনতা নিয়ে ব্যবসায়ী মহল চিন্তিত হয়ে পড়েছেন, একথা জানালেন এফবিসিসি্আই-এর সহ-সভাপতি হাসিনা নেওয়াজ। এক বছর কঠিন লড়াইয়ের পর মূলত এ-বছরের শুরুতে ‘নয়া নরমাল বিজনেস পলিসি’ নিয়ে ব্যবসায়গুলো চালু হচ্ছিল। হাসিনা নেওয়াজ মনে করেন, সে উদ্যোগও এখন হুমকির মুখে।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমানও কোভিড সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখীনতায় গভীর উদ্বেগের কথা জানালেন। তিনি মনে করেন, সংক্রমণের গতি নিস্নমুখী রাখতে হলে জনগণকে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।
তিনি আরও বলেন, “লকডাউন দিলে ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষতি হবে এবং বেকারত্ব থেকে দেশে দারিদ্র বাড়বে, এটা কোনো সমাধান নয়।”
ভাইরাসের নতুন ধরনটির ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে হলে বিদেশফেরতদের জন্য অভ্যন্তরীনভাবে সুবিধাজনক কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা কঠোরভাবে অনুসরণ করা দরকার বলেও মনে করছেন বিজিএমই-এর এই নেতা।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বললেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে জনগণের উদাসীনতা বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি করেছে। আরও বললেন, “জনগণকে অবশ্যই এসব মানতে হবে, নইলে কোভিড নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।”
সরকার লকডাউন ঘোষণার বিষয়ে ভাবছে না বলেও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
