“মোবাইল টিপতে টিপতে একেবারে ভেতরে ঢুকে পড়”-বর্তমান প্রায় মায়েদের মুখে সন্তানের উদ্দেশে এমন কথা নিতান্তই স্বাভাবিক একটি ঘটনা। তবে, কথাটাকে যতখানি স্বাভাবিক বলে ধরা হয়, আদতে কি তা কেবলই ‘কথার কথা’? সবুজ ক্রীড়া ময়দানে হই-হট্টগোল, পুকুরে ঝাঁপাঝাঁপি কিংবা ঘন বরষায় সরিষা তেলমাখা মুড়ি টুক টুক করে মুখে পুরে পারিবারিক লুডু আসর; রোজ এক টেবিলে বসে খুব সুন্দর আড্ডায় ভোজন সমাপনের সময়গুলো সত্যিই কি আর আমাদের আছে?
প্রযুক্তিতে অতিমাত্রায় বিরামহীন সময় খরচা, আমাদের প্রাকৃতিক আনন্দ কিংবা নিজেকে পৃথিবীর সম্মুখে দুর্দান্ত উপস্থাপনের ফুরসতটুকু প্রতিনিয়ত ভঙ্গুর করে তুলছে। ইন্টারনেট বা প্রযুক্তি আসক্তি যেন রীতিমতো মহামারি আকার ধারণ করেছে গোটা বিশ্বে।
খুব অল্প বয়সে নেতিয়ে পড়া, তীব্র হতাশাগ্রস্ত কিংবা জীবনের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ বর্তমান প্রজন্মের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। পরিত্রাণ নিকটতম না হলে, এ প্রজন্মের ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি দেখা ছাড়া আর দ্বিতীয় কিছু থাকবে না। আমরা আমাদের আজকের লেখায়, ইন্টারনেট আসক্তির প্রভাব এবং এর থেকে বাঁচার কিছু পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করব।
প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক, এই দেখতে সাধারণ, প্রতিদিনের নিত্যসঙ্গী আসক্তি আমাদের ঠিক কী কী এবং কতটুকু ক্ষতি করতে পারে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি
খুব খাচ্ছি, ঘুমোচ্ছি। কিন্তু, শারীরিক উন্নতি প্রতিনিয়ত বিপরীতমুখী আচরণে মগ্ন। কেন? এমন প্রশ্ন প্রায় মুখে শোনা যায়। খোঁজ নিলে অবশ্য দেখা যাবে, রাতভর অনলাইনে সময় অতিবাহিত করা এবং দুপুরকে সকাল বানিয়ে ঘুম থেকে জাগা-তাদের রোজকার বিশৃঙ্খল রুটিন। বেশিমাত্রায় অনলাইনে থাকা ব্যক্তি কখনোই তার শরীরের সঙ্গে সঠিক বিচার করতে পারে না। যার ফলে ধীরে ধীরে তার স্বাস্থ্যজনিত ক্ষতি বাড়তে থাকে। আর মনে রাখা ভালো, ক্ষুধা ছাড়া খাদ্যগ্রহণ যেমন কষ্টসাধ্য বিষয়, তদ্রূপ, খিদে পেলে না খেয়ে অন্যমনস্ক আচরণ কেবল খারাপের পাল্লাকেই ভারী করতে পারে। একইভাবে, সময়মতো না ঘুমিয়ে অথবা না জেগে; অন্য কিছু পরিকল্পনা করলে, দিন শেষে ফলাফল বিরাট শূন্য।
স্বপ্নধ্বস
প্রতিটি মানুষেরই এক বা একাধিক স্বপ্ন থাকে। স্বপ্ন দেখা এবং বাস্তবায়নে হাত লাগানো ছাড়া; একজন মানুষ কখনোই সামনে এগোতে পারে না। কিন্তু, বর্তমান সময়ে অনলাইন আসক্তি যেন স্বপ্ন উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বিশাল এক ধাক্কা।
কেননা, যে সময়টা একজন স্বপ্নবাজ মানুষ তার স্বপ্নের পেছনে ব্যয় করার কথা, ঠিক তখন সে আসক্তির জেরে শুধু শুধু অনলাইন গেইমস, অকারণ আলাপচারিতা বা নিছক নিউজফিড স্ক্রলিংয়ে মহামূল্যবান ‘আজ’টাকে অপচয় করে মাত্র। এর ফলে, তুমুল সম্ভাবনাময় স্বপ্নগুলোও মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়।
সম্পর্কে অবনতি
ব্যক্তির মানসিক প্রফুল্লতা অনেকটাই নির্ভর করে সুন্দর সম্পর্কের কল্যাণে। কিন্তু, খুব বেশি প্রযুক্তি নির্ভর হতে হতে অনেক কাছের সম্পর্কগুলো দিনকে দিন দূরত্বে ঠাঁই নিচ্ছে।
একাকিত্ব
নিষ্প্রয়োজনে নেট দুনিয়ায় ঢুকে পড়া, ব্যক্তিকে ধীরে ধীরে একা করে তোলে। ভার্চুয়াল জগতে যত বন্ধু থাকুক না কেন, বাস্তব জীবনের বন্ধুর সংখ্যা কমতে থাকে। এবং একটা সময় ব্যক্তি এতটাই ভেঙে পড়ে যে, জীবন নিয়ে অতিমাত্রায় বিপ্রতীপ ভাবনা তার মনে চরমভাবে জোরালো হয়।
খিটখিটে মেজাজ
তীব্র মাত্রায় ইন্টারনেট আসক্তির ফলে, সহজ স্বাভাবিক কথাগুলোকেও বিষের মতো অগ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়। এমনকি, পরিবেশ-পরিস্থিতির তোয়াক্কা ভুলে হঠাৎ বিগড়ে যায় কারও কারও মেজাজ।
আসক্তি থেকে মুক্তি লাভের উপায় কী? চলুন এক নজরে দেখে নেওয়া যাক।
মেডিটেশন
নিয়মিত শরীরচর্চা কিংবা মেডিটেশন সব ধরনের খারাপ আসক্তি থেকে মুক্তি পেতে বেশ ভালো সহায়ক। দিনের নির্দিষ্ট কিছুটা সময় শুধু নিজেকে কিছুটা সময় দিলে মনে স্থিরতা আসে।
হিসেব রাখা
আপনি ঠিক কোন কাজে কী পরিমাণ সময় ব্যবহার করছেন, তার হিসেব রাখা দরকার। যখন আপনি হিসাবের খাতায় খেয়াল করবেন, জীবন অংশের বড় ভাগ কেবলমাত্র অনলাইনের পেছনে ক্ষয় হচ্ছে, তখন আপনার বোধের জায়গায় বাস্তবিক পরিবর্তন আসতে পারে।
রুটিন
ইন্টারনেট আসক্তি থেকে পরিত্রাণ পেতে চাইলে, একটি দিনপঞ্জি তৈরি করা উচিত। যার ফলে, ধীরে ধীরে নিজেকে শৃঙ্খলায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
লক্ষ্য সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা
আপনি যা হতে চান, তা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকলে, নানাবিধ খারাপ আসক্তি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া খুব কঠিন হবে না। কারণ, তখন আপনি আপনার লক্ষ্য হাসিলে সঠিক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পারবেন।
নেতিবাচক আসক্তি এমন এক ব্যাপার, যা ব্যক্তির বোধগম্যের তীক্ষ্ণতাকে ভোঁতা করে ফেলে। আসক্তি চর্চার সময় ব্যক্তি কখনোই বুঝতে পারেন না যে, তিনি নিজের সঙ্গে ঠিক কী করে চলেছেন। আবার এমন সময় বুঝেও লাভ নেই, যখন আর কোনো কিছুতেই কিছু করার থাকে না। তাই, প্রত্যেকের সময়টুকু যেন খারাপ কোনো অভ্যস্ততায় বিলীন না হয়, সেদিকে দৃষ্টি রাখার এখনই সময়।
লেখক বর্তমানে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে পড়াশোনা করছেন।
ই-মেইল-sanjoydatta 0001 @gmail. com
