Loading...

অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার সংস্কৃতি ও আমরা

| Updated: September 22, 2021 15:41:16


ছবিঃ ইন্টারনেট ছবিঃ ইন্টারনেট

জীবন মানেই কাজের মাঝে নিত্যনিবাস, নাগরিক সকল ব্যস্ততার চাকা ঘোরে এভাবেই। একটা কাজ সারতেই দিন সারা কারো, আবার সমান্তরালে বহু কাজ করে চলা মানুষের সংখ্যাটাও কিন্তু নেহায়েত কম নয়। বর্তমান জীবনযাত্রা ও সমাজের দিকে খানিক তাকালেই চোখে পড়বে, আমাদের সবার মধ্যেই কমবেশি একসঙ্গে একাধিক কাজ করার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।

কে কতটা এগিয়ে গেল, তা মাপার বাটখারাই যেন কে একসাথে কতটা বেশি কাজের চাপ নিয়ে এগোচ্ছে। একটু থামলেই বুঝি আরেকজন এগিয়ে গেল! তাই কাজের যতটা না চাপ আছে, তার চেয়ে আরো বেশি নিয়ে ঐচ্ছিক এক হাঁসফাঁসের বেড়াজালে জড়িয়ে পড়ছে অনেকেই। এই তালিকায় শুধু ব্যস্তবাগীশ কর্পোরেটরাই নন, আছেন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও।

মানুষের নিজেকে প্রমাণ করতে চাওয়ার, অনেকের মাঝে নিজের স্থান বানিয়ে নেওয়ার প্রবণতা চিরন্তন। বর্তমানের প্রতিযোগিতামূলক এই সময়ে এই প্রবণতা যেন আকাশ্চুম্বী হয়ে উঠছে ক্রমান্বয়ে। তাই অতিরিক্ত কাজের চাপ নিয়ে নিজেকে আরো তৎপর ও জনপ্রিয় করে তোলার চেষ্টায় ডুবে যান অনেকে। এরই সাথে প্রতিষ্ঠানগুলোয় গড়ে উঠছে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার এক সংস্কৃতি, যা আপাতদৃষ্টিতে বেশ কার্যকর মনে হলেও বাস্তবে একধরনের বাড়তি চাপ হিসেবে যোগ হয়ে কাজের পরিবেশকে জটিল করে তুলতে পারে।

আধুনিক জীবনযাত্রার ধরণে সারাক্ষণ অন্তর্জালের দুনিয়ায় চোখ রাখছে সবাই। সেখানে কারো প্রোডাকটিভ বা কোনো উৎপাদনশীল-সৃজনশীল কাজ দেখে নিজের মাঝে হতাশা তৈরি হওয়া এখন হরহামেশাই ঘটছে। এই জটিল জীবনধারা, যেখানে কাজের চাপকে সম্মান ও সাফল্য অর্জনের সমানুপাতিক ধরে নেওয়ার প্রবণতা প্রমিত হয়ে উঠছে, সেখানে খুব দ্রুতই মানসিক অবসাদের আবাস গড়ার সম্ভাবনাও প্রবল। জটিল এই কর্মব্যস্ততার সংস্কৃতি গড়ে উঠছে দ্রুত, যার ফলপ্রসূতা আসলে কতটা তার উত্তর খোঁজা যাক।

তাড়াহুড়োপূর্ণ কর্মব্যস্ততার পরিবেশে সবধরনের কাজকে এতটাই বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় ও করা হয়, যার অধিকাংশই অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই অপ্রয়োজনীয় প্রাধান্য কাজের পরিবশে সাধারণের চেয়ে দ্রুত অবসাদ নিয়ে আসে, নির্জীবতার জন্ম দেয়। যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য এমন পরিবেশে আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া যায় না। উল্টো প্রতিষ্ঠানে সহকর্মীদের মাঝে এর ফলে সৃষ্টি হতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত দ্বন্দ্ব, বাড়তে পারে অসুস্থ প্রতিযোগিতাও।

শুধু অফিস কর্পোরেটদের নয়, এমনটা দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝেও। দ্রুত সাফল্য লাভের জন্য অভিজ্ঞতা বাড়াতে অনেকেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হন। পড়ালেখার পাশাপাশি এই প্রচেষ্টা বেশ প্রশংসিত হলেও অতিরিক্ত কাজের চাপে অনেকেই হাঁপিয়ে ওঠেন, প্রতিদিনের জীবনাচরণে সময় থাকে না নিজের জন্যও।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী নওশিনের কাছে এই প্রবণতা বেশ নেতিবাচক, জানান তিনি। তিনি বলেন, “কাজের মাঝে ডুবে থেকে বিভিন্ন সমস্যা থেকে নিজেকে আলাদা রাখা যায়, এ কথার সাথে দ্বিমত নেই। তবে একসময় তীব্র অবসাদের সৃষ্টি হতে পারে সাধ্যের চেয়ে বেশি কাজে সারাটা সময় দিয়েও, যাতে হিতে বিপরীত হয় প্রায় সময়ই।

পড়ালেখার চাপের মাঝেই অভিজ্ঞতার পাল্লা ভারি করার চেষ্টায় বেশ কয়েক জায়গায় অনলাইনে খণ্ডকালীন কাজ শুরু করি একসময়। তবে একটা সময় পর অতিরিক্ত এই চাপ মানসিকভাবে অবসাদে ঠেলে দেয়, নেতিবাচকতা ও কাজের প্রতি অনীহা অনুভব করতে শুরু করি। ধীরে ধীরে এই অতিরিক্ত কর্মব্যস্ত থাকার প্রবণতা কমিয়ে আনার চেষ্টা শুরু করি”।

মানসিকভাবে দীর্ঘস্থায়ী অবসাদ ও শ্রান্তি, কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পেলে গভীর হতাশা ও বিষণ্ণতা সৃষ্টির সাথে সাথে শারীরিক অসুস্থতাও দেখা দিতে পারে এমন প্রবণতা থেকে। অনিদ্রা, ডায়বেটিস, স্থূলতা, হাইপারটেনশন, হৃদপিণ্ডের জটিলতাসহ মাংসপেশীর বিভিন্ন অসুস্থতা দেখা দিতে পারে।

এভারকেয়ার হাসপাতালের মনোবিজ্ঞানী তারানা আনিস অতিরিক্ত কর্মপ্রবণতার শারীরিক ও মানসিক প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, “একটানা কাজ করে গেলেই যে কাজ ভালোভাবে শেষ করা যাবে, এমনটা ঠিক নয়। কাজের ফাঁকে ফাঁকে সংক্ষিপ্ত বিরতি নিয়ে কর্মশক্তির উদ্যতকরণ জরুরি, এতে কাজের প্রতি অনীহা জন্মায় না এবং কাজের মানও তুলনামূলক ভালো হয়।

অতিরিক্ত কাজের চাপ নিয়ে নেওয়ার ফলে দেখা যায় বেশিরভাগ মানুষই নিজেদের কর্মক্ষেত্র ও ব্যক্তিগত জীবনের মাঝে ভারসাম্য রাখতে পারেন না, সীমানা মেনে চলতে পারেন না। আবার যেভাবে কাজের প্রতি প্রাধান্য দেন, তার পুরোটা যদি কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না দেয় তাতে হতাশার পরিমাণও বহুগুণে বেড়ে যায়। কাজের জন্য ব্যক্তিগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কগুলোকে পর্যাপ্ত প্রাধান্য বা সময় না দেওয়ায় ব্যক্তিগত বা সামাজিকভাবে ভরসা যোগানো বন্ধনগুলোর চাহিদাও পূরণ হয় না, এতে সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হতে পারে।”

সমাধান কী?

তাহলে বের হয়ে আসার উপায় কী? এই প্রশ্নেরও কিছু সমাধান দেন এই মনোবিজ্ঞানী। তিনি বলেন, “প্রথমেই নিজেকে নির্দিষ্ট সময় কাজের পর ‘আনপ্লাগ’ করা শিখতে হবে অর্থাৎ ধারণক্ষমতার মাঝে থেকে নিজেকে সেই কাজের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে অন্যান্য সম্পর্কের এবং দায়িত্বের দিকে মন দিতে হবে। সম্পর্কের মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলে মানসিক শক্তির সঞ্চার হয়, যা যেকোনো কাজেই মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে।

যেকোনো কাজ এবং তার ফলাফল লাভের ক্ষেত্রে বাস্তবমুখী হতে হবে। অতিরিক্ত কাজ মানেই সবসময় অতিরিক্ত সাফল্য নয় এবং অতিরিক্ত প্রত্যাশা থেকেই তীব্রতর হতাশার সৃষ্টি হতে পারে, তা মনে রাখা প্রয়োজন।”

নিজের ধারণক্ষমতা ও কর্মক্ষমতার বাইরে গিয়ে বা কাজের জন্য নির্ধারিত সময়ের বাইরে কাজ করাকে নিরুৎসাহিত করেন তিনিঃ “কাজের সময়ের বাইরে পারিবারিক বা সামাজিক জীবনে কাজকে প্রাধান্য দিলে যে ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়, তা এক পর্যায়ে একাকীত্ব ও অবসাদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই সব সম্পর্কের ও দায়িত্বের মাঝে ভারসাম্য রাখা জরুরি। নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হতে হবে এবং নিজের জন্য প্রতিদিনই কিছু সময় রাখতে হবে। ইতিবাচকতার সাথে অতিরিক্ত কাজকে ‘না’ বলতে শেখা সবার জন্যই দরকারি”।

তাহসীন নাওয়ার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২য় বর্ষে অধ্যয়নরত।

amipurbo@gmail.com

 

 

Share if you like

Filter By Topic