ঘটনাটা ঘটেছিল ২০১৫ সালের দিকে। যুক্তরাষ্ট্রে ৩৫ বছর বয়সী একজন স্কুলশিক্ষিকাকে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর দায়ে গ্রেফতার করা হয়। মদ্যপানের বিষয়টি সেই শিক্ষিকা সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করেন এবং এ নিয়ে কর্তব্যরত পুলিশের সাথে বেশ বাকবিতন্ডাও হয়। কিন্তু কোনো লাভ হয় না।
গ্রেফতারের পর তার বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলে রক্তে অ্যালকোহলের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়। কিন্তু সেই সাথে চিকিৎসকরা অবাক করা একটি রিপোর্ট প্রদান করেন এবং সেই রিপোর্টের প্রেক্ষিতে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। সেসময় এ নিয়ে বিবিসিতে বেশ কিছু সংবাদও ছাপা হয়।
কি ছিল সেই রিপোর্টে? রক্তে অ্যালকোহলের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও কেন তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ খারিজ করে দেওয়া হলো?
মানুষের শরীর এক আজব কারখানা। সামান্য নিয়মের হের-ফের হলে বিপত্তি বাঁধে। কলকব্জাগুলো রীতিমতো গন্ডগোল বাঁধিয়ে ফেলে। অদ্ভুত নতুন সব সমস্যার সৃষ্টি হয়। এমনই এক সমস্যার নাম অটো ব্রিউয়ারি সিনড্রোম। এক ফোঁটা অ্যালকোহল সেবন না করেও একজন ব্যক্তি মাতালের মতই ঠিক মাতলামি করতে থাকে।
গ্লোবাল অ্যাডভান্সেস ইন হেলথ অ্যান্ড মেডিসিনে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র অনুযায়ী, ১৯৫০ সালের দিকে সর্বপ্রথম এই রোগটি চিহ্নিত হয় এবং চিকিৎসা শাস্ত্রে এই অসুখের সংযুক্তি হয়।
এটি একটি খুবই বিরল শারীরিক জটিলতা। এর ফলে শরীর আপনা থেকেই চিনি ও শর্করা জাতীয় খাবারকে অ্যালকোহলে পরিণত করে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তে উচ্চমাত্রায় অ্যালকোহল থাকে ফলে একজন ব্যক্তি মাতালের মত আচরণ করতে থাকে।
মাতলামির পাশাপাশি আরো বেশকিছু লক্ষণ থাকে এই রোগের, যেমন - বমি, ঘন ঘন ঢেকুর তোলা, দীর্ঘদিনযাবত ক্লান্তি বোধ করা, ঘুম ঘুম ভাব, মনসংযোগের অভাব, উদ্রান্তের ন্যায় আচরণ।
বেশকিছু কারণে এই অসুখ হতে পারে তবে ৩৫ বছর বয়সী সেই স্কুল শিক্ষিকার মেডিকেল রিপোর্টে কারণ হিসেবে উল্লেখ ছিল যে তার অন্ত্রে প্রচুর পরিমাণে ইষ্ট রয়েছে যা উচ্চমাত্রার কার্বোহাইডেট সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণের ফলে শরীরে গাঁজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেগুলো থেকে অ্যালকোহল তৈরি করে।
বৃটিশ সোসাইটি অফ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজীর তথ্যমতে এর অন্যান্য কারণসমূহের মধ্যে রয়েছে,
ঘনঘন বা দীর্ঘদিন যাবত অ্যান্টিবায়োটিক সেবন। কারণ এর ফলে অন্ত্রে উপস্থিত উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো ধ্বংস হয়ে যায় এবং ছত্রাকের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়।
গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল অসুখ
ক্রনস ডিজিজ
ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম
শর্ট বাওয়েল সিনড্রোম
ডায়াবেটিস
স্থূলতা
ক্ষুদ্রান্ত্রে ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা অধিক বেড়ে গেলে
এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে
যেকোনো অসুখের ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন প্রাসঙ্গিকভাবে এসেই যায়। এটি কোনো জন্মগত রোগ নাকি দৈনন্দিন জীবনযাত্রার প্রভাবে সৃষ্ট কোনো রোগ? না, এটি জন্মগত কোনো রোগ নয়। বিশেষত যাদের অতিরিক্ত চিনি এবং শর্করা জাতীয় খাবার খাওয়ার প্রবণতা রয়েছে তাদের অটো ব্রিউয়ারি সিনড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এক্ষেত্রে বাচ্চা বা বয়স্ক যে কেউ আক্রান্ত হতে পারে।
২০১৯ সালে বিএমজে ওপেন গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজী নামক একটি জার্নালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আফ্রিকা, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং যুক্তরাজ্যে এই রোগের সন্ধান পাওয়া গেছে।
নিঃসন্দেহে অটো ব্রিউয়ারি সিনড্রোম বিরল অসুখের পাশাপাশি একটি বিব্রতকর অসুখও বটে। তাই আক্রান্ত ব্যক্তি মনেপ্রাণে এই অসুখের কবল থেকে মুক্তি চাইবেন। চিকিৎসকদের মতে অনেক রোগীর ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন বন্ধ করে দিলে বা চিনি মুক্ত খাবার বা শর্করার পরিমাণ অল্প রয়েছে এমন খাবার গ্রহণ করলে পরিত্রাণ পাওয়া যেতে পারে। আবার অনেকের ক্ষেত্রে অ্যান্টিফাঙ্গাল বা প্রোবায়োটিক সেবনেরও পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
zabin860@gmail.com