যেভাবে লিখবেন মুভি রিভিউ


মোঃ ইমরান | Published: January 20, 2022 13:05:02


  যেভাবে লিখবেন মুভি রিভিউ

কোনো চলচ্চিত্র নিয়ে পর্যালোচনার জন্য চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহের সাথে প্রয়োজন কিছু বিষয়ে বিশেষ দক্ষতা। সংক্ষেপে জেনে নেওয়া যাক এমন কিছু বিষয়, যা কাজে লাগবে একটি উপস্থাপনযোগ্য পর্যালোচনা দাঁড় করাতে।

সার-সংক্ষেপ

চলচ্চিত্রে কি নিয়ে, কে পরিচালনা করেছেন, অভিনেতা কারা, এদের সম্পর্ক পরিচিতি দিয়ে শুরু করা যায়। তাছাড়া সংগীতপরিচালক, সিনেমাটোগ্রাফারও উল্লেখ করতে পারেন।

গল্পের কোনো টুইস্ট খোলাসা না করে কেবল প্রসঙ্গ উল্লেখ করে পর্যালোচনা শুরু করা ভালো।

উদাহরণস্বরূপ, সর্দার উধম সিনেমার কথা বলা যাক। সিনেমাটি ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম বিপ্লবী চরিত্র সর্দার উধম সিংয়ের উপর নির্মিত হয়েছে। সিনেমাটি পরিচলনা করেছেন, সুজিত সরকার, অভিনয়ে ভিকি কৌশল ও শ্রুতি তিওয়ারি। সিনেমায় সঙ্গীত দিয়েছেন শান্তনু মৈত্র আর অজয় অতুল।

গল্প

চলচ্চিত্রে গল্পের মাধ্যমে সারাংশ বোঝা যায়। গল্পের ধরন কীরকম? কীভাবে গল্প এগিয়ে যাচ্ছে? মূলত এই বিষয়টি খেয়াল রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

গল্প যদি বই বা ইতিহাস নির্ভর হয় তবে পর্যালোচনাটি হবে তর্ক সাপেক্ষে। বিশেষ করে ইতিহাসকে কেন্দ্র করে নির্মিত গল্পের ক্ষেত্রে কথাটি বেশি প্রযোজ্য।

নির্মাণ শৈলী ও পরিচালনা

সিনেমা নির্মাণ শৈলী ও পরিচালনার মাধ্যমে ফুটে ওঠে। প্রত্যেক পরিচালকই একজন গল্পকার। তিনিই নির্ধারণ করেন সিনেমাটিতে দর্শকদের কী দেখাবেন। তাই পরিচালনার বিশেষ দিক, নির্মাণ, বিভিন্ন ধরনের শটের ব্যবহার এবং গল্পের সাথে এর তাৎপর্য এসকল বিষয় পর্যালোচনায় উল্লেখ থাকলে লেখাটি পাকাপোক্ত মনে হবে।

তবে এ বিষয়গুলো উল্লেখ করার জন্য অবশ্যই খুঁটিনাটি দিক সম্পর্কে জ্ঞান রাখতে হবে। যত বেশি জানা যায় তত ভালো।

অনেক সময় পরিচালক তার প্রতিটি চলচ্চিত্রে ভিন্নতার ছাপ রেখে যান। এটি তাকে অন্য সব পরিচালক থেকে আলাদা করে তোলে। যেমন, ওয়েস এন্ডারসনের চলচ্চিত্রে রঙ্গের ব্যবহার, মণি রত্নমের সিনেমায় বৃষ্টির দৃশ্য আবার সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে প্রকৃতি ও সংগীতের ব্যবহার কিংবা আলফ্রেড হিচককের সিনেমায় রহস্য এসব উপকরণ তাদের চলচ্চিত্রকে বিশেষ রূপ দেয় যা দেখেই মনে হবে এটি তার কাজ।

তবে পরিচালক নতুন হলে তার কোনো বিশেষ দিক থাকলে চোখে পড়লে অবশ্যই উল্লেখ করা যায়।

সিনেমাটোগ্রাফি

সিনেমেটোগ্রাফি সোজা কথায় ক্যামেরার কাজ। এটি সম্পর্কে ধারনা থাকলে এর খুঁটিনাটি দিক তুলে ধরে যেকোনো সিনেমাকে বিশ্লেষণ করতে পারবেন।

যে বিষয় গুলো ঠিক বা বেঠিক মনে হয়েছে সেটি উল্লেখ করবেন। সিনেমেটোগ্রাফারের নাম সহ ক্রেডিট দিতে ভুলবেন না। এটি লেখা ও পর্যালোচনা উভয়ের জন্যই ইতিবাচক।

অভিনয়

অভিনয়ের বিভিন্ন দিক রয়েছে। তাই এটি বিশ্লেষণে আনা একটু জটিল। তবে একটি সহজ সমীকরণ হলো চরিত্রটি যেরকম অভিনেতা কি ঠিক তেমনই ভাব প্রকাশ করতে পেরেছে কিনা সেটি উল্লেখ করা।

উদাহরণস্বরূপ, কোনো চরিত্র একটি জাতিকে প্রতিনিধিত্ব করে যাদের নিজস্ব ভাষা, উচ্চারণ, আচরণ রয়েছে। এক্ষেত্রে অভিনেতা চরিত্রের সাথে কতটুকু খাপ খাওয়াতে পেরেছে তা অভিনেতার অভিনয় শিল্পকে তুলে ধরবে।

কান্নার অভিনয়, মাতাল হওয়ার অভিনয় ঠিক ভাবে করতে পেরেছে কিনা এটি পর্যালোচনার মূল বিষয় হতে পারে না। বরং সমগ্র চরিত্রটি অভিনেতা কিভাবে ধারন করেছে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

সঙ্গীত

সঙ্গীত সিনেমায় প্রাণ দেয়। অনেক চলচ্চিত্রে সংলাপের তুলায় সঙ্গীতে ব্যবহার বেশি দেখা যায়।

তাই চলচ্চিত্র পর্যালোচনার ক্ষেত্রে সঙ্গীত পর্যালোচনা জরুরি। কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে কীরকম সাউন্ড ট্র্যাক ব্যবহার করা হয়েছে,গল্পের পরিস্থিতির সাথে এটি কতটা সঙ্গতিপূর্ণ এসব কিছু আলোচনায় আসবে।

সিনেমা যদি উপমহাদেশের প্রথাগত ধারার হয় তাহলে গান থাকা স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে গানের সুর, কথা ও প্রাসঙ্গিকতা এখানে উল্লেখযোগ্য। নাচ থাকলে এটিও পর্যালোচনার অন্তর্ভুক্ত হবে।

নিজস্ব অভিমত

খুঁটিনাটি দিক নিয়ে কথা বললে সমালোচক নিজের মতামত দিতে পারবেন না এমনটি ভাবার প্রয়োজন নেই।

চলচ্চিত্র পর্যালোচনার ক্ষেত্রটি বিস্তৃত। তাই সমালোচক চাইলে খুঁটিনাটি দিক ছাড়াও নিজের অভিমত তুলে ধরতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রে তিনি কোন দৃষ্টিকোণ থেকে সিনেমাটি সমালোচনা করছেন সেটি পরিস্কার করা জরুরি।

যেমন, সিনেমায় কেমন বার্তা দেওয়া হয়েছে, পরিচালক বার্তা প্রদানে কতটুকু সফল হয়েছেন বা প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক দিক গুলো কি কি এসকল বিষয়ে আলোচক নিজস্ব মতামত দিতে পারেন। এই মতামতের জন্যে খুঁটিনাটি পরিমাণ মতো কথার বাধ্যবাধকতা নেই। এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তি নির্ভর।

যা এড়াতে হবে

অতিরঞ্জিত মতামত দেয়া

ভালো-মন্দ যেকোনো ক্ষেত্রেই সিনেমার অহেতুক প্রশংসা করা কিংবা জোরপূর্বক নেতিবাচক দিকগুলো প্রকাশ করা ঠিক নয়। এতে করে সমালোচনাটি গুরুত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা দুটোই হারায়। তাই এটি এড়িয়ে যাওয়া ভালো।

স্ক্রিনপ্লে বা চিত্রনাট্য উল্লেখ করা

চিত্রনাট্য পর্যালোচনার অংশ না করার প্রধান কারণ হলো এটি পাওয়া দুর্লভ। চিত্রনাট্যে স্ক্রিপ্টের সংলাপ লেখা থাকে। কিছু কিছু সিনেমা ছাড়া বেশিরভাগ সিনেমারই চিত্রনাট্য মানুষের নাগালের বাইরে। তাই চিত্রনাট্য ভালো কিনা মন্দ এটি চিত্রনাট্যটি হাতে পাওয়ার পর বললেই ভালো।

চলচ্চিত্র পর্যালোচনা একই সাথে মজার ও কষ্টসাধ্য একটি কাজ। এটিতে যেমন অনেক কিছু শেখার ও জানার থাকে ঠিক তেমনই ভক্তদের রোষানলে পড়ার সুযোগ থাকে শতভাগ। তবে নাসিরুদ্দিন শাহের উক্তির সাথে মিলিয়ে বলা যায় যে, অভিনয় শৈলীর মতো চলচ্চিত্র পর্যালোচনার ক্ষেত্রেও পর্যালোচক, তার কাজের প্রতি সৎ থাকা জরুরি। এতে পর্যালোচনা আরো গ্রহনযোগ্য হয়ে ওঠে।

মোঃ ইমরান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ এবং সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।

mohd.imranasifkhan@gmail.com

Share if you like