'গৃহ-কর্ম' বা 'দূর-কাজ': নতুন কালের কর্মভাবনা


সৈয়দ মূসা রেজা | Published: January 01, 2022 15:41:10 | Updated: January 02, 2022 09:18:58


ছবিঃ লেখক

করোনা আমাদের বিচিত্র শিক্ষা দিয়েছে। নিজের হাত থেকেও সাবধান থাকতে হয় - কোভিডকালের ঠেলায় সে প্রক্রিয়া ভালোভাবেই শিখেছি। মুখোশ পরে ব্যাংকে থেকে টাকা তোলার কথা স্বপ্নেও ভাবিনি, কিন্তু এ কাজটিও করেছি। একইভাবে বাসায় বসে দিনের পর দিনে দফতরের কাজ করতে শিখেছি। রিমোট ওয়ার্কিং বা হোম অফিস এর বাংলা করতে যেয়ে পুরানো শব্দকে নতুন ব্যঞ্জনা নিয়ে এসেছে। গৃহ-কর্ম শব্দটিকে এ অর্থে প্রয়োগ করা যায় বলে কেউ কেউ মনে করেন। আবার কেউ কেউ দূর-কাজ বলেছেন। বাংলা ভাষার শব্দ সম্ভারকে নতুন অর্থে প্রয়োগের বিশাল সম্ভাবনার কথাও বলেন অনেকে। তাদের কারো কারো ভাষ্য অনুযায়ী পড়া-শোনা দিয়ে অডিও বই পড়তে পড়তে শোনা বা শুনতে শুনতে পড়া বোঝানো যেতে পারে। একইভাবে কথা-বার্তার মানে দাঁড়াতে পারে অডিও বার্তা অর্থাৎ কথার মাধ্যমে যে বার্তা পাঠানো হয়। মুখোশ যখন মাস্ক হয়ে টেকসই হওয়ার পথে কিংবা কক্ষ হটিয়ে রুম ঢুকে পড়ছে, ডুবোজাহাজে জ্বালা ধরে সাবমেরিনে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন কেউ কেউ, তখন বাংলা শব্দের এমন নতুন ব্যবহার উৎসাহের সৃষ্টিই করবে।

শুঁয়া(করোনা) ভাইরাসের মহাপ্রকোপের দিনগুলোতে বিশ্বের কোটি মানুষ ঘরে বসে দফতরের প্রতিদিনের কাজ নিপুণ নিষ্ঠার সঙ্গে চালিয়ে গেছেন, যাচ্ছেন। অজান্তেই, বাধ্য হয়ে আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় সামাজিক এক পরীক্ষার লব-কুশী হয়েছেন তারা। ব্রিটিশ বিজ্ঞান সাময়িকী নিউ সায়েন্টিস্টের ১৮-২৫ ডিসেম্বর সংখ্যায় এ নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন করেন অ্যালিস ক্লেইন

লাখো লাখো কর্মী একযোগে দফতর ছেড়ে গৃহ-কর্ম বা দূর-কাজ শুরু করলে পরিণামে কি ঘটবে? হ্যাঁ, এমন পরীক্ষা কোভিড-১৯এর সূচনার দিনগুলোতে হয়ে গেছে। এবারে এটি খতিয়ে দেখার পালা। এই দূর-কাজের প্রথম সুফলই হলো, যতো বেশি লোক ঘরে বসে কাজ করবে পরিবেশের ওপর ততই অহেতুক চাপ কমবে। সকালে উঠে দফতরমুখো প্রাণপণে ছোটার এবং বিকালে বাড়িমুখো দৌড় দেওয়ার প্রাণান্ত কসরতে যেতে হবে না। বিশেষ করে ঢাকা শহরের মতো জান মারা সড়কজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থেকে হা-হুতাশ করার দিনগুলোর ঘটবে স্বস্তির সমাপ্তি। বিশেষ করে নারী কর্মীর জন্য এটা বড় বর হয়েই দেখা দেবে।

জন চাপে সেখানে সবুজের সমারোহ বা কাঠবেড়ালির ভিড় জমতে পারেনি। মানুষের আনাগোনা কমে গেলে কেবল কাঠবেড়ালিই আসবে না। আসবে সব পাখপাখালি বনের সাধারণ।

প্রকৃতির লাভ হলো। লাভ কামালো পরিবেশ। কিন্তু এমন গৃহ-কর্মে মানুষের ফয়দা কী হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, সবচেয়ে বড় লাভ হলো নিজ পরিবার, অবসর এবং বিনোদনের সঙ্গে তাল রেখে কাজকে ঢেলে সাজাতে পারবে কর্মী। সন্তান বা পরিবারের অনেক তান্না মিটিয়েও নির্বিবাদে ফুরফুরে মন-মেজাজে কাজ সামাল দিয়ে চলেতে পারবে একজন কর্মী। ঘর থেকে কাজ করার সময় তাকে কাপড়-চোপড় পরা, চৌকস হয়ে ওঠা নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না। কাজের জায়গার আলো, বাতাস বা কাজে বসার জায়গা নিজের সুবিধামতো বেছে নিতে পারছে। দফতরে এমনটি হওয়া সত্যিই কষ্টকর।

পশ্চিমী এক জরিপে দেখা গেছে, কর্মীরা গণপরিবহনে কর্মস্থলে যাতায়াতকে দিনের সবচেয়ে বাজে সময় হিসেবে মনে করে। ঢাকার মতো যানজটে জটিলতম নগরীর কর্মীরা যাতায়াতকে এক ধরণের যুদ্ধ বলেই মনে করে। অন্তহীন এ যুদ্ধে অসহায় যাত্রীরা আজীবন হারুদার তকমাতেই ভূষিত হয়।

ঘরে থেকে, নিজ পরিবেশে কম্পিউটারে বসে কাজ করার ফলে দেখা গেছে বহু কর্মরাই অনেক বেশি কাজ করতে পারছেন। উৎকণ্ঠা নেই। নেই বাস বা গাড়ি ধরার ধকল। কিংবা জটে আটকে থাকার কষ্ট। তাই কাজে মন দিতে বেগ পেতে হয় না। ইউরোপের বৃহৎ কোম্পানিগুলোতে কর্মরত ১,৫০০ ব্যবস্থাপকের ওপর ঘরে কাজ নিয়ে জরিপ চালায় বোস্টন কনসালটিং গ্রুপ। তাতে দেখা গেছে, দূর-কাজে পাঠিয়ে দেওয়ায় এদের কর্মী বাহিনীর মধ্যে অর্ধেকেরই উৎপাদনের মাত্রা বেড়েছে।

অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবারাস্থ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের সু উইলিয়ামসন বলেন, ঘর থেকে কাজ করার কথা বললে প্রাণপণে বাধা দিতেন ব্যবস্থাপকেরা। তারা ধরে নিতেন, কর্মীরা বাসায় বসে আলসেমীতে দিনাতিপাত করবে, নেটফ্লিক্সে রগরগে ছবি দেখবে কিংবা চ্যাটে আড্ডা মারবে। তবে বিশ্বমারির ঠেলায় কর্মীদেরকে গৃহ-কর্মে পাঠাতে বাধ্য হওয়ার পর ব্যবস্থাপকরা টের পেয়েছেন কত ধানে কতো চাল নিয়ে আশঙ্কার কিছু নেই। এতোকাল দূর দূর করলেও তাদের এখন আস্থা এসেছে এমন দূর ব্যবস্থায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকার এক বিশেষজ্ঞ মেসেঞ্জারে দেওয়া বার্তায় ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে জানান, অফিসে যাতায়াতে রাস্তায় যানজটে প্রচুর কর্মঘন্টা নষ্ট হয়, ঘরে বসে কাজের সুবিধা দিলে এটা বাঁচাতে পারবে অফিসগুলো। চাকুরীজীবীদের জন্যও এটা ভালো। আরেকজন বলেন, ঘর থেকে কাজ করতে পারলে অফিসের বিদ্যুৎ-এসিসহ ওভার হেড খরচ কমবে। কোনো কোনো অফিসের বিশাল বিশাল ভবন ভাড়া করার বা তৈরি করার প্রয়োজন থাকবে না।

মানিকগঞ্জের কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজের হেমটোলজি বা রক্তবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক কামরুল হাসান বলেন, করোনাকালে টেলিফোনে এবং ভিডিও কলে দেশ-বিদেশ থেকে অনেকেই চিকিৎসা পরামর্শ নিয়েছেন। সাধারণভাবে নিজ রোগী বা পরিচিতজনদের চিকিৎসকরা এ জাতীয় পরামর্শ ফোনে দিতে কার্পণ্য করেন না উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, করোনার জেরে এ ধরণের পরামর্শ বেড়েছে। বিশেষ করে করোনার উপসর্গ সন্দেহ করে অনেকেই ব্যাকুল হয়ে দূর থেকে তার পরামর্শ চেয়েছেন। তিনিও উপসর্গের বিস্তারিত বিবরণ শুনেই বুঝতে পেরেছেন ভয় পাওয়ার মতো কিছু নয়। রোগীকে বা নিকটজনকে আশ্বস্ত করতে পেরেছেন।

কিন্তু দূর-কাজ সবার জন্যেই আশীর্বাদ হয়ে আসেনি। কাজের শেষ কখন করতে হবে আর ঘরের জীবনে কখন ফিরতে হবে সেটা অনেকেই ঠিক মতো ঠাহর করতে পারেন না। চামে চামে কর্তৃপক্ষ অনেক বেশি কাজ করিয়ে নেয়। এমন মন্তব্য করেন অনেকেই।

এদিকে, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নস্থ সুইনবার্ন প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যান বারডোয়েল জানান, অনেক ব্যবস্থাপক অভিযোগ করেন, আড্ডা নেই, তাই তর্কাতর্কি, আলোচনা বা গাল-গপ্পের সূত্র ধরে ঘটনাক্রমে উদ্ভাবনী চিন্তা বের হওয়ার সুযোগও নেই। এতে অসুবিধাই হচ্ছে।

জুমালাপেও অভক্তি দেখা দিচ্ছে অনেকের। জুমে আলাপের সময় অনেকেই খুব চাপ অনুভব করেন। এ কথা জানান অ্যারিজোয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালিসন গ্যাব্রিয়েল।

অঙ্গবিহীন আলিঙ্গনে সকল অঙ্গ ভরের কথা কবিতার খাতিরে জানি আমরা। এবারে করোনা হাতে ধরে শিখিয়ে গেল দফতরহীন, কোনো কোনো সময় দেশের সীমান্তহীন, কাজের কথা, চাকরির কথা। বহুকাল ধরেই এমন কর্মপরিবেশ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলেছে। করোনা শুধু সে কাজকে দ্রুত গণহারে বাস্তব করে তুলেছে। ভবিষ্যতে এ নিয়ে আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলবে। বারডোয়েল বলেন, আমরা কী ভাবে কাজ করি তা নিয়ে নতুন করে ভাবার এবং নতুন করে ব্যবস্থা নেওয়ার অবারিত সুযোগ দেখা দিয়েছে। অনুকূল প্রবণতা হিসেবে দূর-কাজকে স্বাগত জানাতে দ্বিধা নেই আমাদের।

syed.musareza@gmail.com

Share if you like