তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন পণ্য পরিবহন ধর্মঘটের কারণে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার সমমূল্যের পণ্য রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, আমদানি করা অনেক কাঁচামাল বন্দরে পড়ে আছে।
চলতি মাসে দৈনিক দেড়শ কোটি ডলার পণ্য রপ্তানির ক্রয়াদেশ রয়েছে জানিয়ে এই ব্যবসায়ী নেতা জানান, ধর্মঘট শুরুর পর প্রতিদিনই পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, রপ্তানিমুখী পোশাক খাত অনেকটা আমদানি নির্ভরও। এ কারণে আমদানির পণ্যগুলোও কারখানায় আসছে না।
প্রতিদিন এক হাজার ৬০০ ট্রাক-কভার্ড ভ্যান পোশাক খাতের আমদানি- রপ্তানি পণ্য পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত উল্লেখ করে তিনি জানান, কিছু কোম্পানির নিজস্ব ট্রাক-কভার্ড ভ্যান রয়েছে। এর বাইরে বাণিজ্যিক ট্রাক-কভার্ড ভ্যাননির্ভর কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
রপ্তানি ও আমদানিকারক, চট্টগ্রাম বন্দর, বেনাপোল, ভোমরা, সোনা মসজিদ ও চিরিরবন্দর থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম সোমবার এক প্রতিবেদনে জানায়, ধর্মঘটে পণ্যবাহী যান চলাচল বন্ধ থাকায় ধর্মঘটের দিন গড়ানোর সঙ্গে দেশের বন্দরগুলোতে পণ্যজট বাড়তে দেখা গেছে।
ডিজেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে পণ্য পরিবহন ধর্মঘটের প্রভাবে সোমবার দেশের সমুদ্র ও স্থলবন্দরগুলোতে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের পুরো চক্র একপ্রকার স্থবির হয়ে পড়েছে।
দেশে ডিজেল-কেরোসিনের দাম বুধবার মধ্যরাত থেকে ২৩ শতাংশ বাড়িয়ে প্রতি লিটার ৮০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এরপর গত শুক্রবার থেকে ধর্মঘট ডাকে যাত্রী ও পণ্যবাহী পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত মালিক-শ্রমিকরা।
আন্দোলনের মুখে সড়কপথে যাত্রী পরিবহনের ভাড়া ২৭ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে বাস চলাচল শুরু হয়।
তবে ট্রাক-কভার্ডভ্যানসহ পণ্যবাহী পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ট্রাক, কভার্ড ভ্যান, ট্যাংকলরি, প্রাইম মুভার মালিক শ্রমিক সমন্বয় পরিষদ ডিজেলের দাম কমানোর দাবিতে তাদের ডাকা ধর্মঘটে অনড় রয়েছে। টোল কমানো এবং সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার নামে চাঁদাবাজি বন্ধের দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
বন্দরে জট
পরিবহন ধর্মঘটের কারণে পণ্য আনা-নেওয়া একেবারে থেমে না গেলেও প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামে কনটেইনারের জট বাড়ছে। বিশেষ করে রপ্তানি পণ্য নিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা কনটেইনারের সংখ্যা বাড়ছে।
ট্রাক চলাচল না করায় বন্দর থেকেও পণ্যবাহী কনটেইনার খালাস হচ্ছে না। এতে প্রতিটি ইয়ার্ডে কনটেইনার জট বেড়েছে আগের তুলনায়।
ব্ন্দরের সচিব ওমর ফারুক জানান, সাধারণ সময়ে কনটেইনার ডেলিভারি হয় সাড়ে তিন থেকে চার হাজারের মতো। কিন্তু ধর্মঘটের কারণে দৈনিক ডেলিভারির পরিমাণ এক হাজার থেকে দেড় হাজারে নেমে এসেছে। ফলে দিনে দিনে কনটেইনারের জট বাড়ছে।
“সোমবার বিকাল পর্যন্ত আমদানি-রপ্তানি মিলিয়ে কন্টেইনার ছিল ৩৮ হাজারের মতো। যদিও বন্দরে কনটেইনারের ধারণক্ষমতা গড়ে ৪৯ হাজার টিইইউএস (প্রতিটি ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের কন্টেইনারকে একক ধরে) কনটেইনার।“
পণ্য ডেলিভারি সীমিত হলেও জাহাজে কনটেইনার ওঠানামা স্বাভাবিক আছে বলে জানান ওমর ফারুক।
“রোববার এক হাজার কনটেইনার ডেলিভারি হয়েছে। সোমবার দেড় হাজার কনটেইনার ডেলিভারি হওয়ার কথা।”
দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর বেনাপোল বন্দর কর্তৃপক্ষের উপ পরিচালক মামুন কবির তরফদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, বন্দরে লোড-আনলোড প্রক্রিয়া স্বাভাবিক থাকলেও ধর্মঘটের কারণে কোনো পণ্যবাহী ট্রাক বন্দরের বাইরে যাচ্ছে না। ফলে এখানে প্রচুর পরিমাণে পণ্যজটের সৃষ্টি হয়েছে।
এ বন্দর দিয়ে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ ট্রাকে পণ্য আনা নেওয়া করা হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত কয়েকদিনের অচলাবস্থার কারণে এসব পণ্য এখন বন্দরে জমা হয়ে আছে।
এ বন্দর দিয়ে যন্ত্রপাতি, তৈরি পোশাকের কাঁচামালই বেশি আমদানি হয় বলে জানান এ কর্মকর্তা।
বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আজিম উদ্দিন গাজী জানান, গত তিন দিন অপেক্ষায় থাকার পর সোমবার সাড়ে তিনশ ট্রাক বন্দরে ঢুকেছে। রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পণ্য পরিবহন মালিকদের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে সিদ্ধান্ত আসলে ট্রাকগুলো ছেড়ে যেতে পারে।
সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরেও ট্রাকজট দীর্ঘ হচ্ছে। গত কয়েকদিনের ধর্মঘটে ৩০০ এর মতো ট্রাক আটকা পড়েছে। অন্যান্য পণ্যের স্তুপও জমেছে বন্দরের অভ্যন্তরে।
সিএন্ডএফে এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশেনের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান নাসিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, বন্দরে এখন পেঁয়াজ, পাথর, সবজি, মসলাসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি হচ্ছে। গত কয়েকদিনের ধর্মঘটে ৩০০ এর মতো ট্রাক আটকা পড়েছে।
“লোড-আনলোড না হওয়ায় প্রতিদিন আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। বন্দরের স্বাভাবিক কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভারত থেকে মাল আসছে, কিন্তু বের হচ্ছে না,” বলেন তিনি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনা মসজিদ দিয়ে আমদানি রপ্তানি কার্যক্রম কমে যাওয়ায় সেখানে পণ্যজট সৃষ্টি হয়নি বলে জানা গেছে। এ বন্দর দিয়ে মূলত নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত পাথরই বেশি আসছে বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এর প্রতিনিধি জানিয়েছেন।
দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং এজেন্ট পানামা পোর্ট লিংকের জনসংযোগ কর্মকর্তা সোহরাব হোসেন প্রতাপ বলেন, এ বন্দর দিয়ে পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, ভুট্টা, ভুষিসহ এ ধরনের পণ্য আমদানি হয়। তবে ধর্মঘটের কারণে পণ্য পরিবহনে অতটা প্রভাব পড়েনি।
