গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজের মধ্যে টুং করে বেজে উঠলো ফোনে আসা ফেসবুকের নোটিফিকেশন। অ্যাপে ঢুকে দেখা গেলো, বন্ধু তালিকার কেউ একজন একটা ছবি আপলোড করেছে আর সেটারই নোটিফিকেশন। এরপর ওই নোটিফিকেশন ধরে ছবিতে গিয়ে লাইক কমেন্ট করার পর নিউজফিডে আসা আরো অজস্র ছবি, ভিডিও বা লেখা পড়তে পড়তে কখন যে ঘণ্টাখানেক সময় পেরিয়ে যায়, সে খেয়াল রাখা দায়। এমনই প্রচণ্ড রকম কিছু সত্যকে উন্মোচন করে নিয়ে এসেছে নেটফ্লিক্সের ডকুমেন্টারি,দ্য সোশ্যাল ডিলেমা।
জেফ ওরলোস্কি পরিচালিত ডকুমেন্টারিটি ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে নেটফ্লিক্সে মুক্তি পায়। ফেসবুক, গুগল, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রামের মতো কোম্পানিগুলোতে আগে কাজ করেছেন, এমনই কিছু মানুষের হাতে গড়ে তোলা আন্দোলনের নাম দ্য সোশ্যাল ডিলেমা। এই নামে একটি ওয়েবসাইটও রয়েছে যেখানে বিভিন্ন ব্লগ ও ভিডিও আপলোড করা হ্য়। ৯৪ মিনিটের এই ডকুমেন্টারিতে তাদের কথাই উঠে এসেছে, সাথে রয়েছে টেক কোম্পানিগুলোর বিজনেস মডেলের আলোচনা।
পণ্যের জন্য খরচ করা না লাগলে, ব্যবহারকারী-ই পণ্য

প্রথমবার শুনতে একটু ধাক্কা লাগলেও, এটাই বাস্তব। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর অধিকাংশ কাজই বিনামূল্যে করা যায়। আপাতদৃষ্টিতে বিনামূল্য মনে হলেও, এই ধরণের অ্যাপ ব্যবহার করতে হয় মানুষের মনোযোগের বিনিময়ে। যতো বেশি সময় ধরে নিউজফিডে স্ক্রল করা হবে, ততো বেশি বিজ্ঞাপন চলে আসবে ব্যবহারকারীর সামনে। আর ওই বিজ্ঞাপন দেখানোর মাধ্যমেই আসবে কোম্পানিগুলোর প্রবৃদ্ধি।
একজন মানুষ ইন্টারনেটে কী সার্চ করেন, কোন ধরণের ভিডিও খোঁজেন ইউটিউবে, ফোনে কথা বলার সময় বা বন্ধুদের সাথে মেসেজে কোন ধরণের পণ্য বা সেবা বিষয়ে আলোচনা করেন - এর সবকিছুই সংরক্ষণ করে টেক কোম্পানিগুলো। এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে প্রত্যেকের পছন্দ ও চাহিদা অনুযায়ী দেখানো হয় আলাদা আলাদা বিজ্ঞাপন; ফেসবুকের নিউজফিড বা ইউটিউবের সাজেশন - সবই সাজানো হয় এভাবে।
আকৃষ্ট করার ফাঁদ
ফেসবুক কিংবা অন্যান্য সাইটগুলোতে কে কোন ধরণের ভিডিও শেষ পর্যন্ত ধৈর্য ধরে দেখছে, কোনগুলো কার অপছন্দের - এসবই সংরক্ষণ করে ফেসবুকের মতো কোম্পানিগুলো। মানুষের মনস্তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এইসব তথ্যকে ব্যবহার করে মানুষের মনোযোগ আকৃষ্ট করে, এবং আরো দীর্ঘ সময় সোশ্যাল মিডিয়াতে আটকে রাখতে কাজ করে। এটির প্রভাব এতোই মারাত্মক যে, এখন মস্তিষ্কের ডোপামিন রিলিজও নিয়ন্ত্রণ করে ফেলছে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপগুলো।
বর্তমানের অধিকাংশ টেক কোম্পানির লক্ষ্যই হলো কীভাবে ব্যবহারকারীকে আরো বেশি সময় তাদের অ্যাপ বা সাইটে আটকে রাখা যায়। উদাহরণস্বরূপ ফিল্মটিতে দেখানো হয়েছে, শুধু লাইকের পরিবর্তে লাভ, অ্যাংরি, হাহা - এধরনের রিঅ্যাক্ট যোগ করায় মানুষ আগের চেয়ে বেশি সময় দিচ্ছে ফেসবুকে। এজন্যেই বর্তমানে ওয়েবসাইটের রঙ, ডিসপ্লে লেআউট বা নোটিফিকেশনের শব্দ সবকিছুই সাজানো হয় যাতে মানুষ আকৃষ্ট হয় কনটেন্টের প্রতি, আরেকটু বেশি সময় ব্যয় করে তাদের ওয়েবসাইটে।
ক্ষয়ক্ষতি
মোটা দাগে সবার কাছেই এটা পরিষ্কার যে টেক কোম্পানিগুলো মানুষের মনোযোগ ও সময় কেড়ে নিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিয়ে আর বিজ্ঞাপন দেখিয়ে করছে প্রবৃদ্ধি। কিন্তু, প্রশ্ন উঠতেই পারে এসবের মধ্যে মানুষের ক্ষতি হচ্ছে কীভাবে?
ডকুমেন্টারির তথ্যমতে, আজ থেকে দশ বছর আগে মানুষ কোনো কাজে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারতো ১২ সেকেন্ড পর্যন্ত, ২০১৫ তে যা নেমে এসেছে ৮.২৫ সেকেন্ডে। সোশ্যাল মিডিয়াতে আধা সেকেন্ডে একটা ছবি দেখে ভালো-খারাপ বিবেচনা করে পরের ছবিতে চলে যাওয়ার মতো চর্চাগুলোই এর পেছনে অবদান রাখছে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।
আগে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করতো শুধু বাইরের দুনিয়ার শব্দ। আর এখন প্রতি মুহূর্তেই মানুষের মস্তিষ্ক সজাগ থাকছে কোনো নোটিফিকেশনের শব্দের জন্যে। দশ মিনিটের নির্দোষ ফেসবুক ব্রাউজিং করতে করতে অজান্তেই প্রতিটা দিন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে অন্তত চার-পাঁচ ঘণ্টা।
.jpg)
এছাড়া দ্যা সোশ্যাল ডিলেমার তথ্যানুসারে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রচার ও প্রসারের পর ২০১০ সাল থেকে মার্কিন কিশোর-কিশোরীদের মাঝে আত্মহত্যা ও হতাশায় ভোগার হার বেড়েছে যথাক্রমে ৭০ ও ১৫১ শতাংশ। এক মিথ্যে প্রতিযোগিতার জগত গড়ে উঠছে শুধুই নার্সিসিজম বা আত্মমগ্নতার ওপর ভিত্তি করে।
প্রযুক্তি ও আগামী
পৃথিবীতে এর আগে কখনোই এমন কোনো সিদ্ধান্ত ৫০ জন মিলে নেয়নি যেটার প্রভাব পড়বে ২০০ কোটি মানুষের ওপর। কিন্তু দ্যা সোশ্যাল ডিলেমা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, টেক কোম্পানিগুলো ঠিক সেই কাজটিই করে চলেছে। মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, মানসিকতা, চিন্তাধারা যা মানুষ নিজেও নিশ্চিত করে জানে না, সেসব আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কল্যাণে ফেসবুক, গুগলের হাতের মুঠোয়।
ডকুমেন্টারিটিতে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সবারই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণের ওপর। সময় থাকতেই প্রয়োজন প্রযুক্তির ব্যবহারে লাগাম টানা। নিতান্ত প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রযুক্তি ব্যবহার না করে ফিরে যাওয়া উচিত চারকোণা স্ক্রিনের বাইরের সেই জীবনে, যে জীবন ফড়িংয়ের, দোয়েলের।
সিরাজুল আরিফিন বর্তমানে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।
sherajularifin@iut-dhaka.edu